না বলা কথা

ট্র্যাকিং অ্যাপস এবং সন্দেহ

প্রযুক্তি জীবনকে যেমন করেছে সহজতর, তেমনি করে তুলছে কঠিন। যেখানে বিশ্বাস, ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা ও প্রকৃতিগত আচরণের স্বাভাবিকতা থাকার কথা, সেখানে সম্পর্কগুলোর মাঝখানে ট্র্যাকিং অ্যাপস, নিজ অবস্থান কোথায় (লোকেশন শেয়ারিং), স্মার্টফোনের এসব পদ্ধতি তৈরি করে দিচ্ছে দেয়াল। এগুলো আপাত এবং ক্ষেত্রবিশেষে সুবিধাজনক হলেও আসলে তৈরি করছে সমস্যা। এ জন্য স্বামী-স্ত্রী যে একে অপরের কাছে ভিকটিমাইজ হচ্ছেন তা নয়, মাতা-পিতাও সন্তানদের ওপর নজরদারি করেন—যেমন করেন একজন সিবিআই অফিসার বা সিক্রেট ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের কর্মী, একজন অপরাধীর। সুতরাং যার ওপর এমন নজরদারি করা হচ্ছে, খুব স্বভাবতই তার কাছে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ভালোবাসার মানুষ থাকবে মুক্ত বিহঙ্গের মতো কিন্তু না, নিজের অজান্তেই তাকে দাঁড় করানো হচ্ছে একজন আসামির অবস্থানে।
আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার কারণে বিশ্বস্ততার সম্পর্কগুলো দিন দিন দেয়ালের আড়ালে চলে যাচ্ছে। ট্যাক্স, কললিস্ট থেকে শুরু করে মেসেঞ্জার ফলো করার জন্য ঘরেই একজন আরেকজনের মোবাইলে চোখ রাখছেন সর্বক্ষণ। তাদের সম্পর্কের মাঝে তৃতীয় পক্ষ আছে কি না এমন সন্দেহ এবং তৃতীয় পক্ষ থাকলে তা নিয়ে বড় ধরনের বিরোধের জের ধরে নানা দুর্ঘটনা ঘটছে। কখনো-বা এহেন গোয়েন্দাগিরিতে সম্পর্কের ভিত আরও নড়বড়ে হয়ে ওঠে, সন্দেহ করার মতো কিছু হয়তো নেই, তবে সম্পর্কের গায়ে ঠিক কাচের মতো ফাটা দাগ পড়ে যায়। এসব পদ্ধতি দিয়ে প্রিয়জনকে নজরদারি করার আগে একটু ভাবুন, যেন হিতে বিপরীত না হয়ে যায়। শুধু নিজ পরিবার নয়, কাছাকাছি আছেন এমন বন্ধু-সহকর্মী যে কারও ব্যাপারে তা হতে পারে মারাত্মক পীড়াদায়ক। সমাজে প্রত্যেকেরই একটা নিজস্ব সত্তা আছে, প্রাইভেসি বলে একটা ব্যাপার আছে, সুতরাং তার প্রতি সে শ্রদ্ধাটুকু রাখতে হবে। যেখানে মন থেকে বিশ্বস্ততা নেই, সেখানে কি নজরদারি করে কাউকে ফেরানো যায়? মানুষের মন হচ্ছে অদ্ভুত গভীর এক পৃথিবী, সেখানে কে থাকে, থাকবে তা কেউ বলতে পারে না। কাছের মানুষকে জয় করতে হলে প্রথমে করতে হবে ভরসা আর দিতে হবে ভালোবাসা। তার মনে যদি কেউ থেকে থাকে, একসময় সে নিজেই হার মানবে কিন্তু সার্বক্ষণিক এই নজরদারি কাছাকাছি এক বিছানায় থাকার পরও তৈরি করে এক কঠিন দেয়াল।
খুব ছোট্ট উদাহরণ দিই। আমার দুই সহকর্মী সান্ড্রা ও আদেলার খুব বন্ধুত্ব। শনিবারে কোনো অবসরে দুজন একটু দূরে ছিল, সান্ড্রা স্ন্যাপচ্যাটের মানচিত্রে একটু পরপর আদেলার অবস্থান দেখছিল। এ ব্যাপারটা হুয়ানা আদেলাকে বলে দেয়। প্রচণ্ড অপমানে সে সান্ড্রাকে লিস্ট থেকে মুছে দেয়, যা সান্ড্রার কাছেও খুব অপমানজনক মনে হয়েছে এবং পরিণামে একসঙ্গে কাজ করলেও কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাতা-পিতা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করছেন তাঁদের কিশোর বয়সী বাচ্চাদের দিকে লক্ষ রাখার জন্য। কিন্তু পরিণামে পিতা-মাতা ও সন্তানদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে দূরত্ব। একবার এক মা-বাবা তাঁদের সন্তানকে বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে যাবে বলে নিজের ফোনটি তাকে দিয়ে দেন। দেখলেন ছেলে মিথ্যে বলে সিনেমা হলে গিয়েছে। অতপর তাঁরা তাকে একটা স্থায়ী ফোন দেন এবং অনুসরণ করতে থাকেন। কিন্তু ছেলে যখন বুঝতে পারে সে বিষণ্নতায় ভুগতে শুরু করে এবং মিথ্যে বলার পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলেছেন, কিশোর বয়সে বাচ্চারা একটু-আধটু মিথ্যে স্বভাবতই বলে থাকে। তাই বলে তাদের সার্বক্ষণিক অনুসরণ করা এক রকম অন্যায়। এতে তাদের শিশুসুলভ স্বাধীনতা হরণ করা হয়। একসময় তারা ড্রাগে আসক্ত হয় এবং অভিমান থেকে মা-বাবার সঙ্গে বড় ধরনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এসব ব্যাপার নিয়ে নানা রকম সমস্যা প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রায়ই দেখা যায়। গত বছরের শেষের দিকে নিউইয়র্ক ডেইলি নিউজে একটা রিপোর্ট এসেছিল, আই ফোনের ‘ফাইন্ড ফ্রেন্ডের’ মাধ্যমে এক লোক তাঁর স্ত্রীকে অনুসরণ শুরু করেন, একসময় স্ত্রীকে তাঁর বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে ধরতে সক্ষম হন। লোকটি তৎক্ষণাৎ বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটান, যা মৃত্যু পর্যন্ত যেতে পারত এবং পরবর্তী সময়ে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। সম্পর্ক যদি বিশ্বস্ততার না হয়, সম্পর্কচ্ছেদ স্বাভাবিকভাবেই হতে পারে। কিন্তু অনুসরণ করতে গিয়ে মৃত্যু হওয়ার মতো ঘটনা না ঘটানোই ভালো।
সাধারণত ট্র্যাকিং, জিপিআরএস চোর বা গাড়ির অবস্থান জানার জন্য ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পর্কের মাঝে এখন এসবের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে, ফলে ভাঙনও বাড়ছে। নিরাপত্তার খাতিরে দুজনের সন্ধির মাধ্যমে ব্যবহার করাটা অন্যায় নয়। আমাকেও আমার মেয়ে স্ন্যাপচ্যাটে ব্যাপারটা দেখিয়ে ছিল যে আমি চাইলে মানচিত্রে দেখতে পারব সে স্কুলে গিয়ে পৌঁছেছে কি না। আমি একদিন দেখি শুধু স্কুলের প্লে গ্রাউন্ডে তার অবস্থান দেখায়। আমি তাকে একটা বার্তা পাঠালাম যে তাকে বাইরে দেখাচ্ছে। সে ক্লাসের ল্যাপটপসহ ছবি দিল যে ক্লাসে ঠিক ওই মুহূর্তে। বাসায় এলে বললাম যে তুমি মাকে ভুল বোঝো না, তুমি বলেছ বলে আমি দেখছি। তোমাকে আমি ২০০ ভাগ বিশ্বাস করি। সে তখন বলল, একেবারে যে সঠিক অবস্থান দেখাবে তা কিন্তু নয়, উনিশ-বিশ হবেই। নিজের প্রিয় মানুষটার ওপর মনের, হৃদয়ের ট্র্যাকিংটা বেশি রাখুন অ্যাপসের নয়, সে হোক সন্তান, স্বামী-স্ত্রী বা প্রেমিক-প্রেমিকা বা বন্ধু।