
তিন-তিনবার ড্রাইভিংয়ে ফেল করে ঘরে ফিরে এলে এমন হতাশ বাক্যগুলোই মনে শুধু ঘুরপাক করত। স্বামী-ছেলেমেয়েদের উত্ত্যক্ত করা বাক্য, ‘কবে আর পাস করবে?’ আম্মা তো নাম দিয়েই দিয়েছিলেন ‘আদু ভাই’। আমার মনে শুধু হতাশা।
ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন ড্রাইভিং শিখব। মন খারাপের রাতে লং ড্রাইভে বের হয়ে যাব। লেগে গেলাম ড্রাইভিং শিখতে। বিধি বাম, তিন-তিনবার পরীক্ষা দিয়েও পাস করতে পারিনি। হতাশ হয়ে ভাবলাম আমাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। যাঁরা ড্রাইভিং জানেন, তাঁদের সঙ্গে গল্প জুড়ে দিতাম কীভাবে পেলেন, কার কাছ থেকে শিখেছিলেন, কবারে পাস করলেন? এভাবেই একদিন গল্প হচ্ছিল এক বউদির সঙ্গে। গল্পচ্ছলে বলছিলেন, কীভাবে কয়েকবার পরীক্ষা দেওয়ার পর পাস করে গেলেন তিনি। বউদির গল্প শুনে বললাম, ‘বউদি, এ জীবনে আর ড্রাইভিং পরীক্ষায় পাস করতে পারব না।’ বউদি বললেন, ‘কেন পারবে না? তুমি আমার ইন্সট্রাক্টরের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখো।’ ব্যস যেই বলা সেই কাজ। ইন্সট্রাক্টরকে বললেন, আমার বোন কয়েকবার ফেল করেছে, একটু যত্ন করে শেখাবেন।
শুরু হলো নতুন করে স্বপ্ন দেখা; পাস করতেই হবে। মনে তবুও হতাশা আর ভয়। এবার পাস না করলে আর ঘরে-বাইরে মুখ দেখাতে পারব না! লজ্জায়-ভয়ে এবার পরীক্ষার দিন-তারিখ কাউকে বলতে পারি না। লেসন নিতে গিয়ে দেখি দাদা পুরোপুরি নতুন নিয়মে আবার নতুন করে শেখাচ্ছেন। সুন্দর নিয়মে পজিটিভলি তিনি শেখাতে লাগলেন। এভাবে সাতটা লেসন নেওয়ার পর পরীক্ষার দিন সকাল থেকে শুরু হলো অ্যাজমার সমস্যা। বিকেল চারটায় পরীক্ষা আর এখন অ্যাজমা। ধ্যুর সকালটাই শুরু হলো মন খারাপ দিয়ে। ডাক্তারের কাছে ছুটে গেলাম। বললেন কিছুই না, তুমি টেনশন করছ কিছু নিয়ে। তিনটা পাফ নাও একবার। টেনশন ফ্রি থাকো, সব ঠিক হয়ে যাবে। ডাক্তারের ওখান থেকে ফিরে এসেই চলে গেলাম ড্রাইভিং টেস্টে। দাদাকে অনেকবার বোঝালাম যে আমি অসুস্থ, টেন্সড আজ আর পরীক্ষা না দিই। এমন সাতপাঁচ করে করে পরীক্ষা দিয়ে এবার ড্রাইভিং টেস্টে পাস করেই ফেললাম।
জীবনে এত আনন্দ আমেরিকান সিটিজেন হয়েও পাইনি। এ যেন সোনার হরিণ হাতে পাওয়া। সবাইকে কল করে জানাচ্ছি। আম্মাকে জানাতেই বললেন, ‘যাক আদু ভাই নামটার থেকে পরিত্রাণ পেল মেয়েটা! খুশিতে আম্মাকে আর কিছু বলতে পারি না। এক বন্ধুর ডাকে ছুটে যাই ছোট এক আড্ডায়। আমি যাওয়ার পরই আড্ডার টপিকস হলো ড্রাইভিং। কে কীভাবে লাইসেন্স পেলেন, কে একবারে পাস করেছেন, কে বারবার ফেল করে। আড্ডার একফাঁকে বলে বসলাম আমি তিনবারে পাস করতে পারিনি অথচ আমার স্বামী বেচারা এত নার্ভাস একজন মানুষ হয়েও প্রথমবারেই লাইসেন্স পেয়ে যান! একজন বলে বসলেন, যারা বোকা তারাই প্রথমবারে লাইসেন্স পায় আর যারা পাকা তারা কয়েকবার ফেল করেই পায়। যাক কেউ একজন তো ফেল করার পক্ষে কথা বলে সান্ত্বনার বাণী শোনালেন।
আমেরিকায় এসে বাঙালিরা সবচেয়ে প্রথম ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়ার কাজটা সারে। যে ড্রাইভিং জানে না, সে নাকি কিছুই জানে না। আমেরিকায় মানুষ আর যানের সংখ্যা সমান। সে জন্য অন্য দেশ থেকে এ দেশে এসে প্রথম যে কাজটি সারে তা হলো, ড্রাইভিং লাইসেন্স নেওয়া। আবার আউট অফ স্টেটে যাঁরা থাকেন, তাঁদের ড্রাইভিং ছাড়া গতি নেই। গাড়ি চালাতে না জানলে বেশ ঝামেলায় পড়তে হয়। আর তাই ড্রাইভিং লাইসেন্স হাতে পাওয়া জরুরি হয়ে যায়। আমিও পেয়েছি টেম্পোরারি ড্রাইভিং লাইসেন্স। লাইসেন্সটা হাতে পেলে প্রিয় কাউকে পাশে বসিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ড্রাইভ করব, চলে যাব প্রিয় কোনো দূরের স্টেটে দুজনে পাশাপাশি হাত ধরে। সুখে গান গাইব, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়...!’