দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ বাড়ছে বাংলাদেশিদের

বাংলাদেশিদের জন্য দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ বাড়ছে। বর্তমানে শুধু আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যের জন্য দ্বৈত নাগরিকত্বের সুযোগ রয়েছে। সেই তালিকা এখন বাড়বে। তবে সার্কভুক্ত দেশ ও মিয়ানমারের নাগরিকেরা একই সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিক থাকতে পারবেন না। এ ছাড়া, গেজেট জারি করে সরকার যেসব দেশে নাগরিকত্ব গ্রহণ নিষিদ্ধ করেছে, সেসব দেশও বর্ধিত এই তালিকার বাইরে থাকবে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আইন, ২০১৬-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। নতুন আইনে ছয়টি অধ্যায় ও ২৮টি ধারা থাকছে। নতুন আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের সব নাগরিক একই সঙ্গে অন্য দেশের নাগরিক হওয়ার সুযোগ পাবেন না। এদের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ও সাংসদেরা দ্বৈত নাগরিক হতে পারবেন না। একই সঙ্গে সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি, বাহিনী প্রধানসহ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরাও দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে পারবেন না। নাগরিক হতে মিথ্যা তথ্য দিলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
অনুমোদিত আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি বা তার বাবা-মা বিদেশি কোনো সামরিক বা আধা-সামরিক বাহিনী বা অন্য কোনো বিশেষ বাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন বা করে থাকেন বা বাংলাদেশের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন বা বাংলাদেশবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন, তাহলে বাংলাদেশে নাগরিকত্ব লাভের জন্য তাদের করা আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, নতুন আইনে দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের সুযোগ অনেক সম্প্রসারিত হচ্ছে। আগে বাংলাদেশিদের জন্য শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের দ্বৈত নাগরিক হওয়ার আইনি সুযোগ ছিল। নতুন আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো বাংলাদেশি সার্কভুক্ত দেশ বা মিয়ানমারের দ্বৈত নাগরিকত্ব নিতে পারবে না। কেউ বিয়ের সূত্রে এসব দেশের কোনোটির নাগরিক হলে তাদের এক দেশের নাগরিকত্ব ছাড়তে হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম বলেন, সরকার গেজেট জারি করে যেসব দেশকে নাগরিকত্ব গ্রহণের বিষয়টি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে, সেসব দেশের দ্বৈত নাগরিক হওয়া চলবে না। এর বাইরে এই আইনের আওতায় বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে এমন যেকোনো রাষ্ট্রের দ্বৈত নাগরিকত্ব বাংলাদেশিরা এই আইনের ফলে নিতে পারবেন। তবে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক, সাংসদ, সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি, সশস্ত্র বাহিনী বা প্রজাতন্ত্রের কোনো বেসামরিক পদে নিয়োজিতরা দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে পারবেন না।
বর্তমানে পৃথিবীর একমাত্র রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নিষিদ্ধ রয়েছে বাংলাদেশের। অনুমোদিত আইনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তি দ্বৈত নাগরিকত্ব ছাড়া বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আনুগত্য প্রকাশ করলে; বিদেশি রাষ্ট্রের কোনো বাহিনীতে যোগ দিলে বা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা ওই বাহিনীকে সহায়তা করে থাকলে তার নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যাবে। কেউ মিথ্যা তথ্য দিয়ে নাগরিক হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, কেউ ইচ্ছে করলে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতেও পারবেন। সে ক্ষেত্রে তার নাবালক সন্তানের বিষয়েও তা প্রযোজ্য হবে। বিয়ে সূত্রে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেতে হলেও বিদেশি নাগরিকদের কমপক্ষে পাঁচ বছর এ দেশে বসবাস করতে হবে। আগের আইনে এ ক্ষেত্রে চার বছরের বাধ্যবাধকতা ছিল।
বাংলাদেশ নাগরিকত্ব আইনের ধারা ১১-এ বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের কোনো নাগরিক বিদেশি নাগরিককে বিবাহ করলে, যদি ওই বিবাহ সম্পর্কে বৈধতার কোনো প্রশ্ন না থাকে, সরকার ওই বিদেশি নাগরিককে তার আবেদনের প্রেক্ষিতে, বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিতে পারবে। তবে তাকে বাংলাদেশে ন্যূনতম পাঁচ বছর বসবাস করতে হবে। সরকার চাইলে বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য কাউকে সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দিতে পারবে।’
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিরা স্থানীয় সরকার নির্বাচন, সংসদ নির্বাচন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনসহ যেকোনো পদের নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকসহ প্রজাতন্ত্রের কোনো কর্মে নিয়োগ পাবেন না। কোনো রাজনৈতিক সংগঠনও করতে পারবেন না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারের যেসব নাগরিক বাংলাদেশিকে বিয়ে করেছেন তাদের বিয়ে যেন রেজিস্ট্রি করা না হয়, ওই ব্যাপারে ইতিমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ওই দেশের বিপুলসংখ্যক নাগরিক এ দেশে অবৈধভাবে আছেন। তাদের একটি বড় অংশ এখানে বিয়েও করেছেন। এ আইন অনুমোদনের ফলে মিয়ানমারের এমন নাগরিকদের বিষয়ে সহজে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। বয়সের বিষয়ে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত আইনে বলা হয়েছে, ১৮ বছরের নিচে যাদের বয়স, তাদের নাবালক হিসেবে গণ্য করা হবে। এর বেশি বয়সীদের প্রাপ্তবয়স্ক বা সক্ষম হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
অনুমোদিত আইনের ধারা-৯ এ বলা হয়েছে, সরকারি বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে কোনো বিদেশি নাগরিককে তার সামাজিক, বিজ্ঞান, সাহিত্য, বিশ্বশান্তি, মানব উন্নয়ন, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিশেষ যোগ্যতা বা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সরকার সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দিতে পারবে। অনুমোদিত আইনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নাগরিকত্বের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে আবেদনের পর প্রদত্ত তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করা হবে। এই যাচাই-বাছাইয়ের সময় আবেদনকারী টানা ছয় মাস বিদেশে থাকতে পারবেন না। আবেদনে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ভুল বা অসম্পূর্ণ বা মিথ্যা তথ্য দিলে বা কোনো তথ্য গোপন করলে ওই ব্যক্তিকে শাস্তি ভোগ করতে হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মোট ৩৭ হাজার ৫৪৪ জন বিদেশিকে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময়ের কারণে ৩৭ হাজার ৫৩৫ জনকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। এর বিপরীতে ছিটমহল বিনিময় করে ১৪ হাজার ৮৬৪ জন ও ব্যক্তিগত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৫২৬ জন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। এ ছাড়া, ২০১৪ সালে বৈবাহিক সূত্রে নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে পাঁচজনকে। বিশেষ অবদানের জন্য নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে দুজনকে। এরা হলেন—নিউজিল্যান্ডের ফাদার আরতুরো ও ইতালিয়ান নাগরিক এড্রিক সাজিসন বেকার। সম্মানসূচক নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে ব্রিটিশ নাগরিক ভেলেরি এ টেইলর ও ইতালিয়ান নাগরিক ফাদার মারিনো রিগ্যানকে। এ সময় ৯ হাজার ১৬ জন প্রবাসী বাংলাদেশিকে দ্বৈত নাগরিকত্ব দেওয়া হয়েছে।
নাগরিকত্ব নিয়ে নতুন এই আইনের খসড়া এখন সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে আইনে পরিণত হবে।