
পৃথিবীতে যেসব জাতির নিজস্ব বর্ষপঞ্জি আছে, তাদেরই আছে নববর্ষের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এই দিনটিকে তারা নিজস্ব ঐতিহ্য ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করে থাকে। সেদিক থেকে বাঙালি জাতি অবশ্যই সৌভাগ্যের অধিকারী। পৃথিবী পরিক্রমায় ইতিমধ্যেই বাংলা সন তার ১৪০০ বছর অতিক্রম করেছে। ১৪ এপ্রিল বাংলা সন ১৪২৪ শেষ হবে মহাকালের গর্ভে এবং শুরু হবে ১৪২৫ সালের প্রদীপ্ত পদচারণ। বছরের প্রথম দিনটি, অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনের জন্য বিশ্বের সব বাঙালি মেতে উঠবে নানান আয়োজনে। পুরোনো বছরের ভুলভ্রান্তি শুধরে নতুন বছরটি যেন প্রত্যাশিত আশা-আকাঙ্ক্ষার সাফল্যে ভরপুর হয়ে ওঠে, সে প্রার্থনাই থাকে সবার।
বাঙালির সর্বজনীন উৎসবগুলোর মধ্যে পয়লা বৈশাখ অন্যতম। এই উৎসব ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব বাঙালির জন্য প্রযোজ্য। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পয়লা বৈশাখকে ঘিরে উৎসবের মাত্রা বেড়েছে বহুগুণ। বাংলাদেশে দিনটি উদ্যাপনের উত্তাপ সাত সাগর তেরো নদীর পারে নিউইয়র্কে এসেও লেগেছে। বাংলাদেশে এ সময় আবহাওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম—গরম ও ঝড়-বাদলও শুরু হয়ে যায়। আর আমরা যারা নিউইয়র্কে থাকি, তারা তখনো হালকা শীতের সঙ্গে বসবাস করি। দীর্ঘ শীতের পর গরম আবহাওয়ার অপেক্ষায় কাতর হয়ে দিন গুনতে থাকি। পাতাবিহীন রুক্ষ-বিবর্ণ গাছগুলোর জন্য তখনো নিউইয়র্ককে প্রায় মৃত নগরী বলে ভ্রম হয়। কাজেই এখানে পয়লা বৈশাখের আমেজও থাকে কিছুটা ভিন্নতর। তাতে কি, বাঙালি যেখানে, পয়লা বৈশাখও সেখানে। তবে পালনের কৌশল বা ঘটা হয়তো কিছুটা ভিন্ন।
নিউইয়র্কে আছি প্রায় ৩০ বছর। প্রথম দিকে বাঙালির সংখ্যা ছিল অনেক কম এবং বাঙালিদের সংগঠনের সংখ্যাও ছিল হাতে গোনা। এখনকার মতো এত ঘটা করে বৈশাখ পালন করা হতো না। তবে কিছু কিছু সংগঠন তাদের সাধ্যমতো স্কুল বা অন্য কোনো মিলনায়তন ভাড়া করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ
খাবারদাবারের ব্যবস্থা করত, যেটা এখনো হয়। এ ছাড়া অনেকের বাড়িতেই বন্ধুবান্ধবসহ পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে আনন্দ উৎসবের ব্যবস্থা করা হয়, সেখানেও গানবাজনার ব্যবস্থা রাখা হতো, যা এখনো হয়।
অনেক পরে বৈশাখী মেলা সংযোজিত হয়। প্রথম দিকে মিলনায়তনের ভেতরেই মেলার আয়োজন করা হতো। পরে একসময় উন্মুক্ত রাস্তায় বা পার্কে মেলার প্রচলন শুরু হয়। প্রথম দিকে একটিই মেলা হতো। যে মেলাটি অনেক সময় মে কিংবা জুনেও হয়েছে। যত দূর মনে পড়ে, প্রথম বাইরের মেলাটি হয়েছিল অ্যাস্টোরিয়ায়। তারপর আস্তে আস্তে জ্যাকসন হাইটস, ব্রুকলিন, জ্যামাইকা, ব্রঙ্কস ও অন্যান্য স্থানেও হতে শুরু করে। কয়েক বছর থেকে লক্ষ করছি, পয়লা বৈশাখ উপলক্ষ করে যে মেলার প্রচলন শুরু হয়েছিল নিউইয়র্কে, তা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে সংখ্যার দিক থেকে। এখন প্রতিবছর মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সংগঠনের আয়োজনে বিভিন্ন স্থানে মেলা চলতেই থাকে। শোনা যায়, নিউইয়র্কে এখন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, আঞ্চলিক ও পারিবারিক সমিতি মিলে দুই শতাধিক সংগঠন রয়েছে। আর সে কারণেই অনুষ্ঠানেরও শেষ নেই। জনসংখ্যার আধিক্য, প্রয়োজন ও নেতৃত্বের কারণে সম্ভবত এত আয়োজন হচ্ছে, এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যও কম হচ্ছে না। এক অর্থে আমাদের বাংলাদেশকে এভাবেই নিজের করে গড়ে তুলছি বিদেশের মাটিতে।
একটা পর্যায়ে এখানে প্যারেড বা শোভাযাত্রাও সংযোজিত হয়েছে এবং বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্যসমৃদ্ধ নানান রকমের মুখোশ ব্যবহৃত হচ্ছে। গত কয়েক বছর থেকে কয়েকটি সংগঠন এককভাবে শোভাযাত্রার আয়োজন করছে, যেমন বিপা, উদীচী, বাফা ইত্যাদি। আমেরিকায় জন্মগ্রহণকারী বাঙালিদের ছোট ছোট ছেলেমেয়ে যখন শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরে নানা রকম মুখোশ হাতে নিয়ে দৃপ্ত পদক্ষেপে শোভাযাত্রায় হেঁটে যাচ্ছিল, সে এক দেখার মতো দৃশ্যই হয়েছিল বটে! মতামতের ভিন্নতার কারণে অথবা একক পারদর্শিতা প্রদর্শন সাপেক্ষে যে যার মতো পারছে, এসব শোভাযাত্রা করে যাচ্ছে। কিন্তু বাঙালির সময় এসেছে যৌথভাবে বা সম্মিলিতভাবে অন্তত বছরে একটি শোভাযাত্রা আয়োজনের। অনেক এথনিক কমিউনিটি, যেমন চীনারা, এভাবেই তাদের নববর্ষ পালন করে থাকে। তাহলে বাঙালিরাই বা পারবে না কেন?
গত বছর থেকে নতুন একটা সংযোজন হয়েছে। আনন্দধ্বনি ও প্রকৃতি নামের দুটি সংগঠন বাংলাদেশের ছায়ানটের মতো সকালবেলায় প্রভাতি নববর্ষ উদ্যাপন করা শুরু করেছে। আনন্দধ্বনির ভীষণ ইচ্ছা ছিল বাইরে, অর্থাৎ কোনো পার্কে বা উন্মুক্ত মাঠে গাছের তলায় ছায়ানটের আদলে পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন করার। কিন্তু নিউইয়র্কে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সেটা করা সম্ভব নয় আবহাওয়ার কারণে। তবে আনন্দধ্বনির অনুষ্ঠানের স্টেজের ব্যাকড্রপটি বটগাছের ছবি ব্যবহার করে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যে মনে হচ্ছিল সত্যি শিল্পীরা সব বটমূলে বসে গভীর আনন্দে সংগীত পরিবেশন করছেন।