ভালোবাসার নিউইয়র্ক

ফলাফল শূন্য

তেনারা আসেন, কখনো একা, কখনো সদলবলে। যখন আসেন, তখন পকেটে ভর্তি থাকে সবুজ রঙের ডলার আর হাতে সবুজ পাসপোর্ট। আমেরিকায় আসার আগে ফেসবুকে এলান দিয়ে রাখেন যে ‘জরুরি কারণে আমেরিকায় যেতে হচ্ছে। দেশকে এখন থেকেই মিস করছি।’ পঞ্চাশোর্ধ্ব পাঠকদের নিশ্চয় মনে আছে যে আশির দশকে ঢাকার তৎকালীন জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ‘ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন’ নামে একটি বিভাগ ছিল। তখনই মধ্যপ্রাচ্যে প্রচুর বাংলাদেশি কর্মোপলক্ষে দু-তিন বছরের জন্য বিদেশে যাওয়া শুরু করেছেন। বিদেশ যাওয়ার আগে তাঁদের অনেকেই স্যুট-টাই পরে পাসপোর্ট সাইজের ছবিওয়ালা বিজ্ঞাপন দিয়ে বলে যেতেন, ‘সময়াভাবে বন্ধুবান্ধবসহ অনেক স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে পারলাম না বলে দুঃখিত।’
সেই সময়ে একটি ব্যতিক্রমী বিজ্ঞাপনের ভাষা অনেক দিন সবার মুখে মুখে চালু ছিল। যাতে বলা ছিল, ‘সময়াভাবে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন ছাড়াও নিজ স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাদের সঙ্গে দেখা করতে পারলাম না বলে দুঃখিত।’ এখন আর টাকা খরচ করে ‘ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন’ দেওয়ার দরকার পড়ে না, সেই স্থানটি পুরোটাই চলে এসেছে ফেসবুকের দখলে। বিমানবন্দরে ভিভিআইপি লাউঞ্জে বসা থেকে শুরু করে উড়োজাহাজের নানা ছবি সবার নয়ন সম্মুখে প্রতিনিয়ত আসতেই থাকে।
এদিকে নিউইয়র্কে আগত অতিথির ভক্তদের চোখে ঘুম নেই। কাজকর্ম ফেলে রেখে চলছে নেতা নয়তো বড় ভাইকে জেএফকেতে ধামাকা অভ্যর্থনা জানানোর বিশাল আয়োজন। সঙ্গে গ্রুপ পলিটিকসের নামে একে অন্যকে কনুই মারার প্রতিযোগিতা। কেউবা ব্যস্ত দামি গাড়ির খোঁজ করতে, যেটা দিয়ে নেতা কিংবা বড় ভাইকে বিমানবন্দর থেকে আনতে হবে। কেউবা খোঁজ নিচ্ছেন ভিআইপি অতিথি কার বাসায় এবার উঠলেন তা জেনে নিতে। যার বাসায়ই উঠলেন, ধরে নেওয়া হলো উনিই বোধকরি স্থানীয় শাখার একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তাহলে তিনিই হয়তোবা এবার দলের হাইকমান্ডের বিশেষ নজরে। তাহলে তো সেই গুরুত্বপূর্ণ ‘তিনি’র সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। কেননা, এবার যেভাবেই হোক বড় দলের ১৩১তম শাখার প্রধানের পদ নিতেই হবে। তা না হলে রাজনৈতিক প্রেস্টিজ তো পাংচার হওয়ার উপক্রম।
তাই বলেই হয়তো দু-চার-পাঁচজন কর্মীকে নাশতা করিয়ে সকাল সকাল জেএফকেতে হাজির। লক্ষ্য মাত্র দুটি। যুতমত জায়গা দখল করে নেতাকে এমনভাবে স্বাগত জানাতে হবে, যেন নেতা বোঝেন এই শহরে সর্বক্ষণ আদর্শ আর দলীয় পদের চিন্তা নিয়ে যাঁদের জান কোরবান তিনি তাঁদেরই একজন।
টেনশনের কি শেষ আছে? অভ্যর্থনা তো হলো। নেতাকে স্থানীয়ভাবে সবার সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধার্থে ভালো একটি মোবাইল ফোনের জোগাড় করে দিতে হবে। উপরন্তু আয়োজন করতে হবে বিশাল (?) এক সংবর্ধনার। এই পর্যায়ে মনে পড়ল আশির দশকের লন্ডনে থাকাকালীন এক ফরমায়েশি সংবর্ধনার আয়োজনের ক্রমাগত তাগিদে পাগল হয়ে যাওয়ার অবস্থার কথা। সেই সময় দেশ থেকে আসা একজন মাঝারি গোছের নেতার সঙ্গে হঠাৎ করে লন্ডন শহরের বাঙালিপাড়া ব্রিকলেনে সাক্ষাৎ। কুশলাদির পর্ব শেষে নেতা চেপে ধরলেন তাঁকে নিয়ে বসতে হবে। নেতারও কপাল ভালো, আচমকা নিজ জেলার নামে একটি আঞ্চলিক সংগঠনের নেতাকেও নগদ পেয়ে গেলাম। দ্রুত শলাপরামর্শ করে একজন আইনজীবীর অফিসে বসার ব্যবস্থা করা হলো। আইনজীবীকে এই বলে অভয় দেওয়া হলো যে সভা আয়োজনে তেনাদেরই লাভ হবে বেশি। উপস্থিত সদস্যদের অনেকেই আইনি পরামর্শের জন্য আগ্রহী। মানে তেনাদের ব্যবসা হবে, অর্থাৎ মক্কেল মিলবে। কিন্তু উপস্থিতি বেশি না হওয়ায় নেতার মন ভরল না। তাৎক্ষণিকভাবে অবস্থা সামাল দিতে গিয়ে নেতার মনভোলানো একটি ঘোষণা এল। যার সারমর্ম হলো, অল্প কিছুদিনের মধ্যে সেই মাঝারি গোছের নেতার আয়োজনে বিলাতের সব প্রান্ত থেকে জেলাবাসীদের দাওয়াত করে এনে বিরাট (?) ও বিশাল (?) একটি স্মরণকালের সেরা সংবর্ধনার আয়োজন করা হবে।
উপস্থিত এই ঘোষণা শুনে নেতার চেহারায় সন্তোষের ছায়া দেখে মনে হলো এবার বুঝি বিপদ সামলানো গেল। কিন্তু না, পরে যখন নেতা ক্রমাগত বিশাল (?) সেই সংবর্ধনার খোঁজ করতে লাগলেন, তখনই বোঝা গেল সমস্যা তো শেষ হয়নি, বরং তা বুঝি আরও জোরেশোরে শুরু হলো। কারণ নেতা ইতিমধ্যে জেনে গেছেন বিদেশের মাটিতে বিরাট সংবর্ধনা মানেই পকেটে বিরাট অঙ্কের ডলার নয়তো পাউন্ড আসা। তাই বুঝি নেতা চালালেন সর্বত্র ব্যাপক খোঁজ-খবর। উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইলেন দেশে ফেরত যাওয়ার পূর্বে বিশাল (?) সংবর্ধনার আয়োজন আদৌ করা হবে কিনা! পাঠকেদের জ্ঞাতার্থে বলছি, সেই বিশাল সংবর্ধনার আয়োজন সেই সময়ে আর করা যায়নি।
এবার শুনি আমেরিকার মাটিতেই আরেক নেতার অনুসারী জড়ো করার গল্প। উড়ালপথে লন্ডন হয়ে নামলেন রাজধানী নগরীতে। অফিশিয়াল কাজকর্ম শেষে যোগ দিলেন স্থানীয় অনুসারীদের দেওয়া সংবর্ধনায়। পুরো সময়ে বেছে বেছে বেশ কয়েকজন অনুসারীকে কাছে ডেকে এনে কানে কানে কী যেন বলে দিলেন। সবার উত্তরের ভঙ্গি একই রকম। নেতার কানমন্ত্র শুনে বিগলিত হাসির পরপরই মাথা দুলিয়ে সম্মতি প্রধান। পরদিন নেতা হাজারো বাংলাদেশি অধ্যুষিত অন্য এক বাণিজ্যিক নগরীতে এসে পদার্পণ করলেন।
সপ্তাহান্তে স্থানীয় অনুসারীদের আয়োজিত বিরাট সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন রাজধানী নগরী থেকে আসা অনেক অতিথি। হলের ভেতর প্রবেশ করে একে অপরকে দেখছেন আর মনে মনে হাসছেন নেতার অভূতপূর্ব সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার দৌড় দেখে। এটি ছিল অনুষ্ঠানে বেশি অনুসারী জড়ো করার টেকনিক। বাইরের শহর থেকে আসা সব অনুসারী একই বাক্য সবার কানে কানে বলছিলেন। ‘তোমার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ একটি সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত আমার কাছে আছে, তবে এখানে বলা ঠিক হবে না, তুমি অমুক শহরে অমুক দিন আসো। সুখবরটি ওখানেই দেব। মজার বিষয়, সুখবর শুনতে আসা অনুসারীদের কেউই সেদিন সেই বিশেষ খবরটি পাননি। সেই যে তেনাদের রাজনীতির নামে পলিটিকস শুরু হয়েছিল, আজও তা চলমান। চল্লিশ বছরে অনেক কিছুই বদল হয়েছে, শুধু বদল হয়নি আদিকালের পলিটিকসের পুরোনো সেই ধারা।
নেতা বা সমাজসেবক কিংবা প্রজাতন্ত্রের রাজকর্মচারীরা দেশ থেকে অহি নয়তো পদবি নিয়ে আসবেন। আর আমরা এখানে ধেই ধেই করে নেচে-গেয়ে সবাইকে বিশাল আর বিরাট সংবর্ধনা দিতেই থাকব, যাকে বলা যায় বিশেষ সেবা।
তারপর কী হবে? সেটিও গল্পে বলি। রাজধানীর এক স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক নিউইয়র্কে এলেন পারিবারিক কাজে। খবর পেয়ে অনেক আদর-সমাদর করে এনে ভালো খাওয়া-দাওয়া সহযোগে অনেক গানবাজনা হই-হুল্লোড় করে বৈঠকি আড্ডার ব্যবস্থা হলো। পত্রিকায় ভালো কভারেজ পাওয়ায় দলের স্থানীয় ব্যক্তিদেরও শখ জাগল নেত্রীকে দলীয় সভা-সমিতিতে নিয়ে বিপুল সংবর্ধনা দেওয়ার। তেমনি এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে বেরোতে গিয়ে আমাকে দেখলেন। সবাই হইচই করে নেত্রীর ভিজিটিং কার্ড নিচ্ছে। আমাকেও তিনি দিতে চাইলেন। সঙ্গে সঙ্গে আমি জানিয়ে দিলাম, ধন্যবাদ, আমাকে আপনি টেক্সেট করে আপনার দেশের নম্বর দিয়েছেন। সুন্দর একটি মনোরম হাসি দিয়ে বললেন, নম্বরটি কাজে লাগাবেন কিন্তু। দেশে যাওয়ামাত্র কল দিয়েন। দেশে যাওয়ামাত্র কল দিইনি। দিয়েছি অনেক পরে। কোনো উত্তর পাইনি। তাঁর দেওয়া নম্বর আমি কাজে লাগিয়েছি। দুঃখের বিষয়, তিনি তা ফেরত কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন।
তেমনি এই শহরের প্রতিটি প্রবাসীজন, যাঁরা রাতকে দিন করে, দিনকে রাত করে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে খেটে চলছেন, সেই প্রবাসী ভাইদের বলছি, তেনারা আসেন আমোদ করতে; দলের কেউকেটা হয়ে পদ বাণিজ্য করে ডলার কিংবা পাউন্ড সংগ্রহ করে দামি দামি ব্র্যান্ডের স্যুট নয়তো বেগম সাহেবাদের জন্য ডায়মন্ডের সেট কিনে নিয়ে যেতে। তাঁদের জন্য মানি ইজ নো ‘প্রবলেম’!
তবে আপনি কাজ না করলে আপনার অনেক ‘প্রবলেম’ আছে। বাড়িভাড়া বাকি পড়বে। ক্রেডিট কার্ডের বিল বড় হতে হতে দেউলিয়া হবেন। আর সব শেষে যখন দেশে যাবেন, তখন তেনাদের দেওয়া ফোন নম্বরে ফোন করলে শুনবেন বিরক্তি উদ্রেকের মতো ধারণকৃত একটি তথ্য, ‘নম্বরটি এখন ব্যস্ত আছে! কিছুক্ষণ পর আবার ডায়াল করুন’!
আর সেই সুমধুর তথ্যটি শুনে মন খারাপ করে পস্তাতে পস্তাতে দেখবেন একদিন নিউইয়র্কে ফেরত আসার দিন এসে গেছে!
শেষ কথা: আশার কথা, এরই মধ্যেও কিছুটা হলেও ব্যতিক্রম আছে। আমরা সেই আশায় ভালোবাসার স্বপ্ন বুনি!