
বাংলাদেশকে ভালোবাসেন রাজনীতিবিদেরা। দেশের মানুষের জন্য তাঁদের মন কাঁদে। দলের আদর্শ এবং চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তা ছড়িয়ে দিতে চান বিশ্বময়। নিউইয়র্কে রাজনীতি করা প্রত্যেক নেতৃবৃন্দই অন্যান্য কথার সঙ্গে এসব কথাগুলো বলেছেন। দেশি রাজনীতি কেন বিদেশে এমন বিষয় নিয়ে এই প্রতিবেদক কথা বলেছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, অ্যাটর্নি, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের সঙ্গে। এতে উঠে এসেছে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশের রাজনীতি প্রবাসে বৈধতা আছে কী না এ প্রসঙ্গে আমেরিকা সুপ্রিম কোর্টের অ্যাটর্নি অ্যাট ল’ মঈন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী দেশের কোনো রাজনৈতিক শাখা বিদেশে থাকতে পারবে না। যদিও আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রবাসের কমিটি গুলোর আয়োজনে প্রধান অতিথি হয়ে এখানকার কমিটি অনুমোদন দিয়েছেন। আমেরিকার আইন অনুযায়ী, অন্য কোনো দেশের রাজনৈতিক শাখা স্থাপন করতে হলে নিবন্ধন করতে হয়। যা এখানকার কোনো রাজনৈতিক দলের নাই। অলাভজনক সামাজিক সংগঠন হিসেবে তারা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে নিবন্ধন করেছেন যা অনৈতিক। তিনি আরও বলেন, এখানে প্রধানত দুই ধরনের মানুষ রাজনীতি করেন ১. আদর্শগত কারণে। ২. ব্যক্তিস্বার্থ আদায়ের জন্য। দেশে একজন মন্ত্রী-এমপির সান্নিধ্যে যাওয়া যেমন কঠিন এখানে তাদের পাওয়া ততই সহজ। এ জন্যই এখানে যে কোনো এমপি মন্ত্রী আসলে তাদের সংবর্ধনা দেওয়ার লোকের অভাব হয় না। যার অন্যতম লক্ষ্য ব্যক্তি স্বার্থ আদায় করা। আমি মনে করি যারা রাজনীতি করতে চান তাদের উচিত আমেরিকার মূল ধারার রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া।
কেন প্রবাসে রাজনীতি করছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে আমেরিকাতে ৩৮ বছর ধরে রাজনীতি করা যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ এর সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘আমি দেশের মানুষের জন্য এবং বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নত করার জন্য রাজনীতি করি।’ প্রবাসে থেকে কীভাবে দেশের মানুষের জন্য কাজ করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই কিছুদিন আগে বিশ্ব ব্যাংক যখন বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের নামে দুর্নীতির অপবাদ দিল আমরা এখানে বিশ্ব ব্যাংক ঘেরাও করেছি। যা দেশে থেকে করা সম্ভব না। আপনার যতই ধন সম্পত্তি বা যোগ্যতা থাকুক আপনি কোনো দলের সমর্থন ছাড়া কোনো কাজ করতে পারবেন না। আমি বাংলাদেশে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতাম। আমেরিকায় আমার ছেলে মারা যাওয়ার পর তার নামে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি শিক্ষা বৃত্তি দিতে চেয়েছিলাম। তখন এরশাদ সাহেব ক্ষমতায়। তিনি তা করতে দিলেন না।’ তিনি বলেন, ‘আমি বাংলাদেশে বিনা টাকায় পড়ালেখা করে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ডক্টরেট পর্যন্ত করেছি। সেখান থেকে আমি মনে করি দেশের জনগণের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা আছে। এখানেতো অনেকের অনেক টাকা পয়সা আছে। যারা দেশের টাকায় পড়ালেখা করেছে। খোঁজ নিয়ে দেখেন কারা কোনো জনতার উপকারে এসেছেন? আমরা যারা রাজনীতি করি তারা তাদের এলাকার মানুষের জন্য এবং দেশের মানুষের বিপদে প্রতিনিয়ত কাজ করি এখানে থেকে। দেশে রাজনীতি করলে কিছু একটা পাওয়ার আশা থাকে কিন্তু এখানে যারা রাজনীতি করেন তারা কিছু পাওয়ার আশায় রাজনীতি করেন না।’
যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডা. মুজিবুর রহমান মজুমদার বলেন, ‘দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের ব্যাপক অবদান রয়েছে। ঠিক তেমনি ভাবে দেশের রাজনীতিতেও আমাদের অংশগ্রহণ একান্ত প্রয়োজন। দেশের সংকটে আমরাও রাজনৈতিক ভাবে মতামত দিতে চাই। যার জন্য একটি রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন। আর এ জন্যই আমরা এখানে রাজনীতি করি। দেশে যখন ৯ / ১১ হলো প্রবাসী আমেরিকান রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই দেশের কল্যাণে বিশ্ববাসীকে দেশের অবস্থান জানিয়েছিলেন নানান কর্মসূচির মাধ্যমে। ১৯৮৯ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করার পর আমরাই প্রথম এরশাদ বিরোধী আন্দোলন শুরু করি যা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের অবস্থা জানান দিয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধেও সময়ও প্রবাসীরা দেশের গণহত্যা পাকিস্তানিদের বর্বরতার কথা জন্য রাজনৈতিক ভাবে সারা বিশ্বকে জানিয়েছিলেন। দেশের ৫ জানুয়ারির অবৈধ নির্বাচনের পর থেকে বিরোধী দলের ওপর যে অন্যায় অত্যাচার হয়েছে তা দেশে থেকে প্রতিবাদ করা সম্ভব না। এখানে আমরা জাতিসংঘ এবং বিশ্ব মিডিয়ায় তা তোলে ধরতে পাড়ছি খুব সহজে।’
শুধু দেশের মানুষের নয়। প্রবাসীদের ভালো মন্দ নিয়ে সরকারের সঙ্গে কথা বলা প্রবাসী রাজনীতির অন্যতম অনুষঙ্গ হওয়া উচিত বলে মনে করেন ড. প্রদীপ রঞ্জন কর। তিনি জেনোসাইড ফাউন্ডেশন ৭১ ইউএস-এর সভাপতি। তিনি বলেন, ‘প্রবাসে থেকে প্রবাসীদের কল্যাণে কথা বলাই এখানকার রাজনীতি হওয়া উচিত। দেশের ভালো মন্দ বিভিন্ন বিষয়ে আমরা এখান থেকে কথা বলেছি। এখানে বাংলাদেশ বিমান নাই, দেশের বিমান বন্দরে গেলে নানান সমস্যা হয়। টাকা পাঠাতে নানান ঝামেলা, প্রবাসীদের ভোটাধিকার নাই এসব বিষয় নিয়ে কথা বলাই রাজনীতির প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।’
রাজনীতিবিদদের এসব ভালো কথার বিপরীতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাংবাদিক বলেন, ‘এখানে কয়েক ধরনের মানুষ রাজনীতি করেন, ১. সময় কাটানোর জন্য। ২. পরিচয় সংকটের কারণে। এখানে জীবন ধারণের জন্য তিনি যে চাকরি করেন তার পরিচয় দিতে তিনি সংকোচবোধ করেন। রাজনীতি করলে কোনো না কোনো একটা পদবি পাওয়া যা তিনি পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ৩. মন্ত্রী-এমপি-দের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে বাংলাদেশের নানান দুর্নীতি করা। বিএনপি আমলে কয়েকজনকে দেখেছি যারা এখানে কোনো কাজ করতেন না। নিউইয়র্কে বসে বাংলাদেশের অমুককে জেলে ঢোকাতেন, তমুককে জেল থেকে বের করতেন। টাকার বিনিময়ে মানুষের চাকরির ব্যবস্থা করতেন। আওয়ামী লিগেও অনেকে এই কাজটি এখন করছেন। এই সব ধান্দবাজদের দেখে লোভে পড়ে অনেকে রাজনীতিতে যুক্ত হয়।’
কামাল সাঈদ মোহন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। পরে যুবদলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে যুক্ত ছিলেন। সর্বশেষ তিনি যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তিনি এখন আমেরিকায় থাকেন। তিনি বলেন, ‘দেশের সার্বভৌমত্বেও ওপর যখন আঘাত আসে, গণতান্ত্রিক পথ যখন অবরুদ্ধ হয়ে যায়, বাক স্বাধীনতায় যখন হস্তক্ষেপ আসে তখন আমি বসে থাকতে পারি না। কারণ আমরা যুদ্ধ করে একটি স্বাধীন দেশে দিয়ে এসেছি। সেই দেশে যখন সংকটে পড়ে তখন আমি এগিয়ে আসি। জনে জনে কথা বলি, পত্রিকায় লিখি, টক শো’তে যাই, প্রয়োজনে সভা-সমাবেশ করি। এটাই আমার রাজনীতি। সে আমি প্রবাসে বা দেশে যেখানেই থাকি এই রাজনীতি আমি করেই যাব।’
বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ যুক্তরাষ্ট্র এর আহ্বায়ক তারিক এইচ চৌধুরী বলেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনিদের বংশধর বা প্রেতাত্মা দেশে এবং বিদেশে ছড়িয়ে রয়েছে তারা সার্বক্ষণিক দেশে বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এই প্রবাসে আমরা রাজনীতি করি দেশের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার জন্য। জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে স্বনির্ভর সোনার বাংলা রূপে গড়ে তোলাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য। সারা আমেরিকায় যুব লীগের ১৫টি শাখা আছে এর মাধ্যমে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি।
তারেক রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সংগ্রাম পরিষদ, যুক্তরাষ্ট্র শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি পারভেজ সাজ্জাদ বলেন, প্রবাসে রাজনীতি করার অন্যতম লক্ষ্য হলো সারা বিশ্বেও সামনে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা। দেশে বাক্স্বাধীনতা নাই। গণতন্ত্র নাই বিচার বিবাগের স্বাধীনতা নাই। প্রধান বিচার প্রতি যেখানে সঠিক কথা বলে দেশ ত্যাগ করতে হয়, সেখানে বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের কেমন অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়। এখন থেকে আমরা তার প্রতিবাদ করে সারা বিশ্বকে জানান দিই। আমরা এখান থেকে জাতিসংঘে স্মারক লিপি দিয়েছি। স্টেট ডিপার্টমেন্টকে দেশের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে অবগত করেছি। এসব করার প্রধান লক্ষ্য দেশে যেন গণতন্ত্র ফিরে আসে। এখানে রাজনীতি করলেও আমার এলাকার মানুষের বিপদে আমি দাঁড়ানোর চেষ্টা করি।
বাংলাদেশ ছাত্রলীগ যুক্তরাষ্ট্র শাখার সভাপতি জাহিদ হাসান বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের আসল ইতিহাস তুলে ধরাই প্রবাসে আমাদের রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য। এই জন্য আমরা বিভিন্ন কলেজে আমাদের শাখা করার চেষ্টা করছি। বিভিন্ন স্কুলে আমরা শিশুদের সঙ্গে কথা বলে তাদেরও মুক্তিযুদ্ধেও ইতিহাস জানাই। যার মাধ্যমে দেশের প্রতি তাদের মমতা তৈরি হয়।’
রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের প্রধান আড্ডা বা কেন্দ্রস্থল জ্যাকসন হাইটসের কয়েকটি রেস্টুরেন্ট। প্রিমিয়াম রেস্টুরেন্ট তাদের মধ্যে অন্যতম। প্রবাসী রাজনীতি বিষয়ে রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার সাইফুর রহমান শাওন বলেন, ‘রাজনৈতিক যে কোনো কর্মসূচি থাকলে ব্যবসা ভালো হয়। বিশেষ করে আ. লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমান আসলে খুব ভালো বেচা-বিক্রি হয়। সব মিলিয়ে এখানকার রাজনীতি আমাদের ব্যবসার জন্য ভালো। কিন্তু কিছু কিছু নেতা-কর্মী নিজের সম্পর্কে নিজে এত গল্প ছাড়েন যা অনেক সময় সহ্যের বাইরে চলে যায়। তার নিজের দেশে অনেক সম্পত্তি, তাদের আত্মীয়-স্বজন মন্ত্রী-এমপি, তিনি নিজে দেশের জন্য নানান কাজ করছেন। যারা এ ধরনের গল্প করেন তারাই আবার ১ কাপ চা ৩ জনে ভাগ করে খায়। আমার প্রশ্ন হলো দেশে এত কিছু থাকলে সে এখানে পড়ে না থাইকা দেশে গিয়ে রাজনীতি করে না কোনো?’