‘আপ আপ উইথ লিবারেশন, ডাউন ডাউন উইথ ডিপোর্টেশন’ কিংবা ‘হোয়েন ইমিগ্র্যান্টস আর আন্ডার অ্যাটাকড, হোয়াট উই ডু?—স্ট্যান্ড আপ, অ্যান্ড ফাইট ব্যাক’—এসব স্লোগান আর প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন পুলিশ—আইস-এর বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী আদালতের আয়োজন হয় ব্রুকলিনে। গত ২৭ এপ্রিল ব্রুকলিনের অ্যাভিনিউ সি প্লাজায় (চার্চ ম্যাকডোনাল্ড অ্যাভিনিউর কাছে) জুমার নামাজের পর এ প্রতীকী কর্মসূচির আয়োজন করে ড্রাম নামের একটি সংগঠন।
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের ধরপাকড় ও দেশ থেকে বিতাড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের অংশ হিসেবে এ গণ-আদালতে যোগ দিয়েছিলেন এমন অনেকেই। দেশটির ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট—আইস-এর বিরুদ্ধে এই কর্মসূচি। কর্মসূচি চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রে আইসের হাতে আটক চার অভিবাসীর নির্মম কারাবাসের বিবরণ তুলে ধরা হয়। এরপর প্রতীকী বিচারে জনগণের রায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয় আইসকে।
আইসের বিরুদ্ধে গণরায় ঘোষণার এই প্রতীকী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ড্রিমার বা ডাকা প্রকল্পের সুবিধা গ্রহণকারী তরুণ নাঈম ইসলাম বিচারকের ভূমিকা পালন করেন। নাঈম ইসলাম তাঁর বক্তৃতায় জানান, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর সাত শয়ের বেশি কারাগারে প্রায় চার লাখ মানুষকে আটক করা হয়। এটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বন্দী (ডিটেনশন) ব্যবস্থাপনা বলে অভিহিত করেন নাঈম ইসলাম।
‘এখানে সরকারের কর থেকে পাওয়া ৩০০ কোটি ডলার খরচ করা হয়। এই অর্থ মানুষকে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠাতে খরচ করে সরকার। যদিও আমাদের স্কুল, কলেজ, হাসপাতালগুলো অর্থাভাবে থাকে’—বলেন আইসের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার বিচারক নাঈম ইসলাম। নাঈম ইসলাম জানান, এই ডিটেনশন সিস্টেমের আকার প্রতিবছর বাড়ছে, যার ভুক্তভোগী প্রায় প্রতিটি অভিবাসী পরিবার। আর একবার ডিটেনশন সেন্টারে যাঁরা যান, তাঁদের অনেকেরই সব রকম মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়।
এই উন্মুক্ত ও প্রতীকী আদালতে ভারতের হরিয়ানা থেকে আসা অভিবাসী গোবিন্দ কুমার আইসের ডিটেনশন খড়্গের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তাঁর জবানবন্দি পড়ে শোনান অভিবাসন অধিকার কর্মী সোহেল মাহমুদ। সেখানে গোবিন্দ কুমার বলেন, ‘২০১১ সালে আমি ভারতের হরিয়ানা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমাই মূলত রাজনৈতিক কারণে সেখানে জীবনধারণ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায়। ৩৫ হাজার ডলার খরচ করে আমি দীর্ঘ দুই বছর জঙ্গল ও মৃত্যুকূপ পাড়ি দিয়ে ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করি। কিন্তু দুই বছরে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে এই দেশে প্রবেশ করার পরও আমি পুলিশের কাছে ধরা খাই। আমার তখন জ্ঞান ছিল না। যখন জ্ঞান ফেরে, তখন আমি নিজেকে হাসপাতালে খুঁজে পাই। হাসপাতাল থেকে পুলিশ আমাকে টেক্সাসের হিউস্টনে একটি পুলিশ সেন্টারে নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে তারা সাদা কাগজে স্বাক্ষর করতে বলে। আমি সেখানে স্বাক্ষর করিনি, কারণ তারা আমাকে চাপ দিচ্ছিল যদি আমি স্বাক্ষর না করি, তাহলে আমাকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেবে। পরে ২৫ হাজার ডলার দিয়ে একটি বন্ড স্বাক্ষর করি, যদিও আমার জীবনধারণের জন্য কোনো অর্থ ছিল না। আমি এই গল্প বলছি, এ কথা জানাতে যে একজন মৃতপ্রায় মানুষের কাছ থেকে তারা ২৫ হাজার ডলারের বন্ড নিয়েছে। আমি আইসকে দোষ দিচ্ছি না বরং দোষ দিচ্ছি পুরো ব্যবস্থাপনাকে। অভিবাসনের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে একজন জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য এমন প্রাপ্য মানবাধিকার সুরক্ষার কথা বলে না।’
এভাবে আরও তিনজনের জবানবন্দি পড়ে শোনানো হয়, যেখানে আইসের ডিটেনশন সেন্টারে তাঁদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বর্ণনা ছিল। এসব জবানবন্দি আর অন্যান্য প্রেক্ষাপট তুলে ধরে অবিলম্বে অভিবাসন পুলিশের কার্যক্রমকে আইনের আওতায় আনা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বাহিনী হিসেবে তাদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানানো হয় এই অনুষ্ঠানে।