
ব্রুকলিনের ইস্ট নিউইয়র্কের ৭৫ প্রিসিংক্ট। অঞ্চলটির একটি সড়ক সংযোগস্থলের ওপর এখনো সতর্ক নজর রাখছে পুলিশের পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। গত নভেম্বরে এই স্থানে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় ১৬ বছর বয়সী এক বালক। এটি ছিল টানা হত্যাকাণ্ডের সর্বশেষটি। ৭৫ প্রিসিংক্টের ওই স্থানটি গত শতকের ৯০ দশক থেকেই হত্যাকাণ্ডের জন্য কুখ্যাত। প্রতিবছর এই স্থানের আশপাশে গড়ে শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটে। এমনকি পুরো নিউইয়র্ক শহরে অপরাধের হার কমে এলেও ওই স্থান থেকে যায় আগের মতোই ভয়াবহ। ‘মৃত্যুর চৌমাথা’ নামে কুখ্যাতি অর্জন করা স্থানটি চলতি বছর যেন ব্যতিক্রম। এ বছরের প্রথম সাড়ে তিন মাসে ৭৫ প্রিসিংক্টে কোনো খুনের ঘটনা ঘটেনি।
গত বছর ৭৫ প্রিসিংক্টের শুধু এই সড়ক সংযোগস্থলেই ১১টি হত্যাকাণ্ড ঘটে, যা ছিল নিউইয়র্ক শহরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। গত বছরের ১২ ডিসেম্বরের পর থেকে টানা ১২৯ দিন পেরিয়ে গেছে, কিন্তু কেউ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা পড়েনি। অন্তত ১৯৯৩ সালের পর থেকে এ ধরনের ঘটনা আগে কখনো দেখেনি নিউইয়র্কের পুলিশ। ওই বছর থেকেই বিভিন্ন অঞ্চলে হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান সংরক্ষণ করতে শুরু করে তারা।
এটা রীতিমতো বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। ডেভিড কোচরান ও রেজিনাল্ড অ্যাটকিনসও রয়েছেন এই দলে। জন্মের পর থেকে ইস্ট নিউইয়র্কেই বেড়ে উঠেছেন তাঁরা। নিজেদের চোখের সামনেই দেখেছেন রমরমা মাদক ব্যবসা এবং একে ঘিরে সহিংসতার বাড়বাড়ন্ত। এখন ৭৫ প্রিসিংক্টের এই পরিবর্তনকে বিস্ময় মানছেন তাঁরা।
স্ট্যানলি অ্যাভিনিউতে নিজ বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অনেকটা স্বগতোক্তির মতো করে ডেভিড কোচরান বললেন, ‘আমি বহু কিশোরকে মারা পড়তে দেখেছি। এখানে খুনোখুনি শুরু হলে থামতে চায় না।’
গত বছরের নভেম্বরে এই ৭৫ প্রিসিংক্টে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা পড়েছিল ১৬ বছর বয়সী ক্লেটন হেমিংওয়ে। ভ্যান সিক্লেন অ্যাভিনিউ ও ওর্টম্যান স্ট্রিটের সংযোগস্থলে এই ঘটনা ঘটে। চৌমাথার এক দিকে রয়েছে নগর কর্তৃপক্ষের আওতাধীন পার্কিং লট, যা খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানেই একসময় মাদক ব্যবসায়ীরা নিজস্ব আদালত বসাতেন বলে জানান কোচরান ও অ্যাটকিনস। ওই দিক থেকেই খেলা শেষে বাড়ি ফিরছিল হেমিংওয়ে। কিন্তু সে আর বাড়িতে ফিরতে পারেনি। তার আগেই গুলিতে মারা পড়তে হয় তাকে।
রেজিনাল্ড অ্যাটকিনস বলেন, ‘কারও সঙ্গে পরিচয় না থাকলে ওই পার্কিং লটের দিকে সাধারণত কেউ যায় না। প্রচুর মানুষ মারা গেছে সেখানে।’
কিন্তু এমনই ভয়াবহ তকমা লাগা অঞ্চলটিতে চলতি বছরে একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেনি। এর কারণ হিসেবে একেকজন একেক ব্যাখ্যা হাজির করছেন। পুলিশ, স্থানীয় বাসিন্দা কিংবা নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা নানাভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করছেন।
সহিংসতার জন্য কুখ্যাতি রয়েছে হারলেম কিংবা ওয়াশিংটন হাইটসের মতো শহরের অন্য অঞ্চলগুলোতেও অপরাধ কমেছে। ওই সব অঞ্চলে অপরাধ কমার পেছনে জনস্থানান্তরকে কারণ হিসেবে দেখছেন অনেকে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোর উন্নয়নকেও কারণ বলছেন কেউ কেউ। কিন্তু ইস্ট নিউইয়র্কের বাস্তবতা এখনো ওই সব এলাকা থেকে ভিন্ন। অর্থনৈতিক কিংবা অবকাঠামোর উন্নয়ন তেমন একটা হয়নি এই অঞ্চলে। লাতিনো ও কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত অঞ্চলটির অধিকাংশ অধিবাসীই দরিদ্র। ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের যুক্তি এই অঞ্চলে খাটে না।
পুলিশ বলছে, এ বছর একটাও হত্যাকাণ্ড না হওয়ার পেছনে পুলিশ বিভাগের তৎপরতার বড় অবদান রয়েছে। অঞ্চলটিতে অস্ত্র ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে এখানকার বাসিন্দারাও ব্যাপক সহায়তা করেছেন। ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৭৫ প্রিসিংক্ট এলাকা থেকে ৫৩৫টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ ও অন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। এ ছাড়া ৮৪৩ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ঘটনায় অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, যার অধিকাংশের সঙ্গেই কোনো না কোনো সন্ত্রাসী দলের সংযোগ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এরই ফলে এখন পর্যন্ত এই অঞ্চলে মাত্র পাঁচটি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা অর্ধেক। গত বছর যেখানে ডাকাতির ঘটনা বেড়েছিল, এ বছর তা কমতে শুরু করেছে। এ বছরের ২২ এপ্রিল পর্যন্ত নিউইয়র্কের ১৪৪টি ডাকাতির ঘটনার সঙ্গে এই এলাকার অপরাধীদের সংযোগ পাওয়া গেছে। গত বছরের এই সময়ের মধ্যে এ ধরনের সংশ্লিষ্টতার সংখ্যা ছিল ১৬৯।
৭৫ প্রিসিংক্টে পুলিশ দলের কমান্ডার ইন্সপেক্টর জন চেল নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘কোনো সন্ত্রাসী দলকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। এখন যতটা অপরাধ হচ্ছে, তা অবশেষ বলা যায়।’
শুধু ৭৫ প্রিসিংক্টই নয়, পুরো নিউইয়র্কেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা কমেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় শহরে খুনের সংখ্যা কমেছে ১০ শতাংশ। এই উত্তরণের পথে স্থানীয় বাসিন্দাদের বড় কৃতিত্ব রয়েছে বলে মনে করেন সহিংসতাবিরোধী মানবাধিকার সংগঠন ম্যানআপ ইনকরপোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা আন্দ্রে টি মিচেল। বিভিন্ন সন্ত্রাসী দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ ও কাজের মাধ্যমে পুনর্বাসন করে তাঁর সংগঠন।
তিনি বলেন, অস্থিরতা কমিয়ে আনতে স্থানীয় বাসিন্দাদের বড় অবদান রয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাও আর্থিক ও সামাজিকভাবে নানা ধরনের সহায়তা করছেন। এ জন্য তাঁদেরও ধন্যবাদ প্রাপ্য।
নিজেদের কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সন্ত্রাসী দলগুলোর নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ে। এটা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই ঘটে। আমরা এসব দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার কাজ করি। আর একবার এটা করা গেলে, সে আর ওই সব দলে ফিরে যায় না।’
খুনের সংখ্যায় রাতারাতি এই পরিবর্তনে কিছু অবকাঠামোর উন্নয়নেরও প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ইস্ট নিউইয়র্কের ওই পার্কিং লটে এখন একটি আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে। এই প্রকল্পের সঙ্গে রয়েছে ১৯ হাজার বর্গফুট পরিসরের একটি কমিউনিটি সেন্টার, যার নাম রাখা হয়েছে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া অঞ্চলটির সবচেয়ে ছোট বাসিন্দা প্রিন্স জশোয়া আভিতোর নামে। এটি একদিকে সবাইকে সহিংসতার ভয়াবহতার বিষয়ে সচেতন করছে। অন্যদিকে এই প্রকল্পের মাধ্যমে অঞ্চলটিতে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে। এই দুটিই অপরাধ কমে আসার কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে।
তবে এখনো নিরাপদ বোধ করেন না অনেকে। এদেরই একজন এলিজাবেথ ম্যাকফারলেন। নিউইয়র্ক টাইমসকে তিনি বলেন, ‘এই পরিবর্তন নিরাপদ বোধ করার জন্য যথেষ্ট নয়। গ্রীষ্ম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। গরম বাড়তে শুরু করলেই এখানকার লোকজন অস্থির হতে শুরু করে।’