
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে সবাই চেনেন। রাজ পরিবারের আদরের দূলারী। রাজরানি মানেই নাজুক কোনো নারীর চিত্র সামনে আসে, যার পেছনে থাকে শতেক দাসদাসী। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় জন্মসূত্রে পাওয়া রাজতন্ত্র, রাজত্ব—এ আর কঠিন কী? এখানে যোগ্যতা কতটুকু? তবে অবস্থানের মর্যাদা ঠিক রাখার জন্য নিজেকে যোগ্যতার চেয়েও যোগ্য করে তুলতে হয়। রূপকথার গল্পের রাজকুমার বা রাজকুমারীকে প্রয়োজনে রাক্ষস খোক্ষসের সঙ্গে লড়তে হয় তলোয়ার হাতে। ঠিক একই কথা সত্য রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের ক্ষেত্রেও, যার খোঁজ কেউ জানে না।
এলিজাবেথ আলেকজান্দ্রা মেরি উইন্ডসর, তাঁর মহিমা কুইন নামে পরিচিত। ৬৩ বছর ধরে ব্রিটিশ সিংহাসনে রয়েছেন। তিনি এখন শাসনামলের দৈর্ঘ্য বিচারে তাঁর গ্রেট-দাদি রানি ভিক্টোরিয়াকে ছাড়িয়ে গেছেন। ১৯৩৭ সালে এলিজাবেথের বাবা ষষ্ঠ জর্জ ব্রিটেনের রাজার আসনে বসেন। এলিজাবেথ ছিলেন তখন ব্রিটিশ সিংহাসনের একমাত্র উত্তরাধিকারী। ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে এলিজাবেথ নরফকে অবস্থান করেন। ১৯৪০ সালের শুরুতে স্বল্প সময়ের জন্য উইন্ডসরে অবস্থান করেন। ১৯৪০ সালের মে থেকে উইন্ডসরের প্রাসাদে থাকা শুরু করেন এলিজাবেথ। ১৯৪০ সালে এলিজাবেথ প্রথম রেডিও বিবিসিতে শিশুদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। ১৯৪৩ সালে ১৬ বছর বয়সে এলিজাবেথ প্রথম জনসম্মুখে আসেন।
১৯৪৫ সালে কয়েক মাস ধরে তাঁর বাবার উত্তরাধিকারী বাচ্চাকে রাজত্বে প্রবেশের অনুরোধ করার পর, তিনি তা গ্রহণ করেন। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। এলিজাবেথ ১৮ বছর বয়সী রাজকন্যাদের সহায়তায় ভূখণ্ডের পরিষেবাতে যোগ দেন। তিনি দ্বিতীয় এলিজাবেথ উইন্ডসর হিসেবে পরিচিতি পান। লন্ডনে একজন মেকানিক ও সামরিক ট্রাক চালক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একটি ট্রাক চালাতেন। রানি হচ্ছেন রাজ পরিবারের একমাত্র নারী সদস্য, যিনি সশস্ত্র বাহিনীতে প্রবেশ করেছেন এবং তিনিই একমাত্র জীবন্ত রাষ্ট্রপ্রধান যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তারপর তাঁকে তাঁর পুরুষ বংশধররা অনুসরণ করেন। এর মধ্যে রয়েছে প্রিন্স হ্যারি, যিনি ১০ বছর ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেন। এলিজাবেথ ছিলেন নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে খুব সচেতন। যদিও তাঁর উপস্থিতি আশপাশে এক ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করত। কিন্তু তিনি নিজের বিনয় ও কঠোর পরিশ্রম দিয়ে এসব সামাল দিয়েছিলেন।
এলিজাবেথের প্রকৃত জন্ম ২১ এপ্রিল। ১৯৩৬ সালের এই দিনে তিনি জন্ম নেন। তবে রানিও জুন মাসে একটি ‘অফিশিয়াল’ জন্মদিন পালন করেন। তাঁর আনুষ্ঠানিক জন্মদিনে হার্জেস্টি ট্রয়পিং দ্য কালার প্যারেডে রয়েল পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে তিনি যোগ দেন। এলিজাবেথ তাঁর তৃতীয় চাচাতো ভাই ফিলিপ মাউন্টব্যাটেনকে ১৯৪৭ সালের ২০ নভেম্বর বিয়ে করেছিলেন। তাঁদের বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল অপেক্ষাকৃত স্বল্প ব্যয়ের। তিনি তাঁর বিয়ের গাউনের পয়সা জমানো রেশন কুপনগুলি দিয়ে পরিশোধ করেছিলেন। তাঁর গাউনটি ডিজাইন করেন নরম্যান হার্টনেল, যেটায় ছিল দশ হাজার সাদা মুক্তো দিয়ে সজ্জিত একটি আইভরি সাটিন। তিনি তাঁর স্বামীর নাম কখনো ব্যবহার করেননি।
রানি যখন বিদেশ ভ্রমণ করেন, তখন তাঁর পাসপোর্ট ব্যবহার করার দরকার হয় না। কারণ পাসপোর্টগুলোর ভেতরে একটি বিশেষ বার্তা রয়েছে। যেখানে তাঁর মহিমা ও তাঁর অধীনস্থ সংস্থার ক্ষমতার কথা বিবৃত করা রয়েছে। ফলে যার অধীনস্থ সংস্থাই বলে দেয়, কাকে ছাড়া হবে, বা হবে না, তার পক্ষে তাঁকে ছাড়পত্র দেওয়া সম্ভব নয়।
কুইন এলিজাবেথ টুইট করেছেন, রয়্যাল ফ্যামিলির নিজস্ব ওয়েবসাইট রয়েছে। তিনি এমনকি ফেসবুকেও যোগ দিয়েছেন। কুইন এলিজাবেথ ১৯৭৬ সালে যখন সেনা পরিদর্শনে যান, তখনই তিনি প্রথম ই-মেইলটি পাঠিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বের প্রথম রাজা হয়েছিলেন, যিনি কোনো সেনা ঘাঁটিতে পরিদর্শনকালে কোনো ই-মেইল পাঠান। সেখানে কর্মরত সৈন্যরা রানিকে এই আধুনিক প্রযুক্তি দেখানোর জন্য আগ্রহী ছিল।
রানির ব্যক্তিগত কবি আছে। ব্রিটিশ সোসাইটির মাধ্যমে রাজকবির নিয়োগ দেন। এই কবির কার্যক্রম জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাঁর বার্ষিক বেতন ২০০ পাউন্ড। সঙ্গে এক পিপে ক্যানারি ওয়াইন বোনাস। টেমস নদীর সব রাজহাঁসের মালিক রানি এলিজাবেথ। এ নদীর মুক্ত পানিতে যেসব হাঁস ঘুরে বেড়াবে, তার সবই রানির। তথ্যটি উঠে এসেছে যখন এই হাঁসগুলোকে মানুষ ধরতে শুরু করেছে। রানি গোটা জলধারা এবং জলজ প্রাণীর মালিক। রানির অধীনে আছে তিমি, ডলফিন ও অন্যান্য প্রাণী। এই নিয়ম ১৩২৪ সাল থেকে কার্যকর। কিং এডওয়ার্ড দ্বিতীয়ের আমলে জলজ প্রাণী নিধন বন্ধে এই নিয়মের সূচনা হয়।