
স্বপ্নজাল শুরুর মিনিট ছয়েকের মধ্যে ঢুকে পড়তে হলো সিনেমার গল্পে। একের পর এক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। গিয়াস উদ্দিন সেলিমের পরিচালনায় সিনেমাটোগ্রাফার কামরুল হাসান খসরু যেন আমাদের ‘ভিউ কার্ড’ এর মতো একটি একটি করে ছবি দেখিয়ে যাচ্ছেন। প্রবাসে বসে এ যেন এক টুকরো বাংলাদেশের ছোঁয়া। সংলাপ আর অভিনয়ে আমরা মজে যাই স্বপ্নজালে।
ফজলুর রহমান বাবু জাত অভিনেতা এটা সবার জানা। কিন্তু স্বপ্নজালে তিনি যা অভিনয় করেছেন ভবিষ্যতে তিনি নিজেকে নিজে অতিক্রম করতে পারবেন কি না আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। গল্প আগরতলা কলকাতায় চলে যায়! আমাদের চিরচেনা মধ্যবিত্ত পরিবারের টানাপোড়েন দেখি নতুনভাবে নতুন করে সেলিমের স্যলুলয়েডে। পরীমনিকে মনে হয় আমার পাশের বাড়ির সেই মেয়েটি যার সঙ্গে আমার প্রেম ছিল। অসাধারণ অভিনয় করেছেন গল্পের নায়িকা শুভ্রা রূপী পরীমনি। এমন আদুরে আর মায়াময় কণ্ঠ তাঁর বারবার শুনতে ইচ্ছে করে তাঁর কথা। অভিনয়ে পরীর সঙ্গে তাল দিতে পেরেছেন গল্পের নায়ক অপু চরিত্রের ইয়াশ রোহান। সর্বোপরি প্রত্যেক অভিনেতা-অভিনেত্রী দারুণ অভিনয় করেছেন। ইরেশ জাকেরের অভিনয় অনেক দিন দর্শকের চোখে লেগে থাকবে আমি নিশ্চিত। সিনেমা হলে হাসির রোল যেমন পড়েছে তেমনি পিনপতন নীরবতায় চোখের কোণ ভিজে গেছে অনেকবার।
বাংলা সিনেমার ইতিহাসে মনপুরা একটি অনন্য অধ্যায়। মনপুরা সিনেমার পরিচালক গিয়াস উদ্দিন সেলিম নয় বছর পর নির্মাণ করেছেন তাঁর দ্বিতীয় সিনেমা স্বপ্নজাল। এই দীর্ঘ ৯ বছর তিনি চেষ্টা করেছেন নিজেকে অতিক্রম করার। তিল তিল করে গড়ে তুলতে চেয়েছেন একটি নির্ভুল বিনোদনের সিনেমা। তিনি কতটুকু পেরেছেন তা এই সিনেমা যারা দেখেছেন তারা ভালো বলতে পারবেন। এক কথায় যদি সিনেমার প্রশংসা করতে হয় তা হলে বলতে হবে ‘সেলিম সফল’। এই সিনেমা নিয়ে অনেকেই সমালোচনা লেখার চেষ্টা করেছেন। অনেকগুলো পড়েছিলাম সিনেমা দেখার আগে। কারওটাই ঠিক সম আলোচনা তথা সমান আলোচনা হয়নি। সবাই প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছেন। কথা সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হক যিনি নিজে বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় চিত্রনাট্যের রচয়িতা। স্বপ্নজাল নিয়ে তাঁর পর্যালোচনা ‘বাস্তবের জালে স্বপ্নের সুন্দর’ শিরোনামের লেখাটি একটি বিষয় বাদে পুরোটাই প্রশংসনীয়। তাঁর এই লেখা দেখে ভেবেছিলাম সিনেমাটি দেখে ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুই দিক নিয়েই লিখব।
সিনেমা দেখে মনে হলো এর তো কোনো নেতিবাচক দিক নেই। অনেক দর্শককেও জিজ্ঞেস করেছি সিনেমার কোন দিকটা খারাপ লেগেছে। প্রশ্ন শুনে তাঁরা প্রথম যে চাহনি দেন তার অর্থ ‘এর মধ্যেও খারাপ খোঁজেন?’ কোনো দর্শকই কোনো খারাপ দিক বলতে পারেন নাই। আমার কাছে মনে হয়েছে চিঠি আদান-প্রদান এবং পাঠের জায়গাটি কয়েক মিনিটের জন্য গল্পের গতি কমিয়ে দিয়েছে। যদিও বা চিঠিগুলো ছিল অনন্য। গল্পের শেষের দিকে ধর্মগুরুর এত ক্ষমতা কিছুটা আরোপিত মনে হয়েছে। সিনেমার শেষের দিকে ফজলুর রহমান বাবুকে পুলিশ ধরার পর অনেকের কিছুটা হলেও গল্প থেকে আগ্রহ কমে যায়। বাবুকে যখন পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তখন সে ‘ভি’ চিহ্ন দেখাচ্ছিল। যা আমার কাছে সিনেমা আর বাস্তবের মনতাজ মনে হয়েছে। আমার মনে হয়েছে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে যেন পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে।
হল থেকে বের হয়ে একজন দর্শক বলে সিনেমাটি আরও দীর্ঘ হওয়া দরকার ছিল। এ যেন হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেছে। পরে সেই দর্শককে বললাম পৌনে ৩ ঘণ্টার সিনেমা দেখলেন ভাই! তিনি উত্তরে বললেন, বুঝতেই পারিনি সময় কোন দিক দিয়ে চলে গেছে। একজন দর্শক সিনেমা দেখে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, অসাধারণ একটি সিনেমা। অনন্য গল্প এবং নির্মাণ। সবাই বলে সিনেমাটি প্রেমের। আসলে এই সিনেমায় আছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন। আছে সমাজের গোঁড়ামি এবং ধর্মীয় অন্ধতা ভেঙে মানবিক বিশ্ব গড়ার প্রত্যয়। আমি এই দর্শকের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। স্বপ্নজাল সিনেমা আমাদের স্বপ্ন দেখায় সমৃদ্ধ বাংলা চলচ্চিত্রের। স্বপ্ন দেখায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হলে আমাদের সিনেমা চলবে সপ্তাহের পর সপ্তাহ।
অন্ধকারে সুন্দর মুচকি হাসি হেসে লাভ কী। ভালো সিনেমাটি যে আমেরিকায় চলছে তা যদি দর্শক নাই জানতে পারে তাহলে কী করে হলে যাবে। নিউইয়র্কে সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল ৪ মে। এস্টোরিয়ার রিগাল ইউ এ কাফম্যান সিনেমা হলে আমরা স্বপ্নজাল দেখতে গিয়েছিলাম ৫ মে রাত সাড়ে আটটার শো’তে। টিকিট কাটতে গিয়ে পরিচিত আরও অনেকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। এই সিনেকমপ্লেক্সে ১৪টি সিনেমা হল আছে। এর মধ্যে ১০ টিতে চলছে ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ইনফিনিটি ওয়ার’। প্রথমেই একটি ধাক্কা খেলাম এই কমপ্লেক্সে কোথাও স্বপ্নজালের কোনো পোস্টার নেই। অন্য সব সিনেমার পোস্টারসহ সিনেমার নানান চরিত্রকে মেটাল এবং প্লাস্টিক অবয়বে রাখা হয়েছে। স্থানীয় কোনো পত্রিকায় নেই কোনো বিজ্ঞাপন অথবা খবর। বাঙালি এলাকায় নেই কোনো লিফলেট অথবা পোস্টার। মানুষকে জানানোর ন্যূনতম কোনো প্রচেষ্টা ছিল না স্বপ্নজাল সিনেমার বিশ্ব পরিবেশক স্বপ্ন স্কেয়ারক্রোর।
স্বপ্নজাল সিনেমাটি প্রযোজনা করেছে বেঙ্গল ক্রিয়েশনস। এপ্রিলের ৬ তারিখ বাংলাদেশে মুক্তি পেয়েছিল স্বপ্নজাল।