
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান অস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ইরানের বিরুদ্ধে বর্তমান হারে হামলা অব্যাহত থাকলে এই মজুতের ওপর চাপ আরও তীব্র হয়ে উঠবে। এমন এক সময়ে এই তথ্য সামনে এল, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি এখন ‘শেষ’।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, অস্ত্রের এই সংকট চীন বা উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ যুদ্ধ মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
চিন্তন প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এবং মার্কিন মেরিন কোরের অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মার্ক কানসিয়ান বলেন, ‘গত পাঁচ দিনের মতো একই গতিতে যদি এই যুদ্ধ চলতে থাকে, তবে তা অস্ত্রের মজুত এতটাই কমিয়ে দেবে, যা এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নতুন এবং উচ্চ মাত্রার ঝুঁকি তৈরি হবে।’
বিশ্লেষকদের তথ্যানুযায়ী, ইরান সংঘাতের প্রাথমিক ধাপে দূরপাল্লার সুনির্দিষ্ট হামলা এবং শত্রুপক্ষের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে মার্কিন সামরিক বাহিনী হাজার হাজার প্রধান ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।
চিন্তন প্রতিষ্ঠান ‘ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন’-এর পররাষ্ট্রনীতি গবেষণা বিভাগের প্রধান মাইকেল ও’হ্যানলন বলেন, ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই, অস্ত্রের মজুত আমাদের প্রত্যাশিত পরিমাণের চেয়ে অনেক নিচে নেমে গেছে।’
সিএসআইএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত এপ্রিলে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ বন্ধ হয়, ততক্ষণে পেন্টাগন তাদের থাড ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার অন্তত অর্ধেক, প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রায় অর্ধেক এবং প্রায় ৩০ শতাংশ টমাহক ল্যান্ড-অ্যাটাক (ভূমি থেকে ভূমিতে নিক্ষেপযোগ্য) ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ফেলেছিল। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের অভ্যন্তরীণ মজুত–সংক্রান্ত হিসাব সম্পর্কে জানেন, এমন তিন ব্যক্তি এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
কানসিয়ান বলেন, প্রধান প্রধান ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর উৎপাদন বা আবার মজুত করার গতি বেশ ধীর। চলতি অর্থবছর সরবরাহের সময়সূচি অনুযায়ী, পেন্টাগন প্রতি মাসে মাত্র ১৫টির মতো নতুন টমাহক এবং ২০টির মতো নতুন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র পাচ্ছে। ২০২৬ সালে কোনো থাড ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের পূর্বাভাস নেই।
সিএসআইএসের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থায় এই অস্ত্রের মজুত ফিরিয়ে নিতে তিন বছর বা তারও বেশি সময় লাগবে।
আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যুক্ত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জন ফেরারি বলেন, ‘যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি পূরণের জন্য মার্কিন কংগ্রেস একটি ডলারও বরাদ্দ করেনি।’ ফলে বিষয়টি কেবল ‘শান্তিকালীন স্বাভাবিক ও ধীরগতির বার্ষিক প্রক্রিয়ার’ ওপরই নির্ভর করছে।
সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের খরচ মেটাতে হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে আইনপ্রণেতাদের কাছে সম্পূরক তহবিলের অনুরোধ জানিয়েছে। তবে কংগ্রেসে এই প্রস্তাব পাস হওয়া বেশ কঠিন হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘প্রতিরক্ষা উৎপাদন খাতকে দ্রুত সম্প্রসারণ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’। ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে গত জুনে ট্রাম্প ‘ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট’ (প্রতিরক্ষা উৎপাদন আইন) কার্যকর করেছেন। এ ছাড়া উৎপাদন লাইন বৃদ্ধি করতে প্রতিরক্ষা দপ্তর নির্মাতাদের সঙ্গে চুক্তিও করেছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন নিশ্চিত করতে এবং সরবরাহ চেইনের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে প্রতিরক্ষা দপ্তর মার্কিন উদ্ভাবনের সেরা প্রযুক্তিগুলোকে কাজে লাগাচ্ছে।’
কানসিয়ান বলেন, প্রতিরক্ষা উৎপাদন আইন কার্যকর করা ‘সহায়ক’ হলেও এর ‘প্রভাব হবে সীমিত’। এ ছাড়া উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সময় লাগবে।
কানসিয়ান সতর্ক করে বলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী যদি উচ্চ হারে প্রধান ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর ব্যবহার চালিয়ে যায়, তবে পেন্টাগন কেবল চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রেই ঝুঁকির মুখে পড়বে না। বিশ্লেষকদের ধারণা, উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের পরিকল্পনায় শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার পাশাপাশি পিয়ংইয়ংয়ের বাহিনীর বিশাল হামলা থেকে মার্কিন সেনা ও সিউলকে রক্ষা করতে বিপুল পরিমাণ মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন হবে।