
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইরান যুদ্ধ নিয়ে বেশ কিছু দাবি করেছেন। এসব দাবির মধ্যে অন্যতম হলো, সামরিক সরঞ্জাম ফুরিয়ে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ। এ জন্য তিনি সাবেক বাইডেন প্রশাসনের ইউক্রেনকে অস্ত্র দেওয়ার সিদ্ধান্তকে দায়ী করেছেন। তবে তাঁর এই দাবি বিভ্রান্তিকর।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ ছয় মাসে গড়িয়েছে। এর মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম ফুরিয়ে যাওয়া, নিহত সেনার সংখ্যা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির নানা বিষয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য এসব উদ্বেগকে পাত্তা দিচ্ছেন না। যদিও তিনি যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক সমাধান খুঁজছেন। অন্যদিকে জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকানরা এই যুদ্ধ নিয়ে ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছেন। এর বদলে তিনি ইউক্রেন যুদ্ধকে মার্কিন সামরিক সম্পদের বড় অপচয় হিসেবে তুলে ধরছেন।
আগের যুদ্ধগুলোর সঙ্গে তুলনা করে ট্রাম্প বর্তমান প্রাণহানিকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে তেলের দামের এক দিনের পতন নিয়ে তিনি উল্লাস প্রকাশ করছেন।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু দাবির ফ্যাক্ট চেক করে দেখা যাক, আসলে সত্যটা কী।
ট্রাম্প যা বলেছেন
গত সোমবার দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের কাছে বিভিন্ন ধরনের প্রচুর গোলাবারুদ আছে। আপনারা জানেন, বাইডেন ইউক্রেনকে অনেক অস্ত্র দিয়েছেন। তাই আমরা এখন তা আবার গড়ে তুলছি। তবে আমাদের কাছে অনেক অস্ত্র আছে।’
ট্রাম্প দাবি করেন, ‘আমাদের কাছে মাঝারি স্তরের সামরিক সরঞ্জামও প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। আমি বলতে চাচ্ছি, আমাদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আছে। আমি সত্যি বলছি, আমি আরও বেশি অস্ত্র চাই। কিন্তু বাইডেন ইউক্রেনকে অনেক বেশি অস্ত্র দিয়ে দিয়েছেন।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই দাবি আসলে বিভ্রান্তিকর।
নিউইয়র্ক টাইমসসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যম আগে জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাস্ত্রের মজুত খালি করে দিচ্ছে।
কিন্তু ট্রাম্প এই উদ্বেগকে নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি এর পরিবর্তে বাইডেন প্রশাসনের ইউক্রেনকে দেওয়া সামরিক সাহায্যকে দায়ী করছেন। প্রেসিডেন্টের এই কথায় কিছুটা সত্যতা রয়েছে, বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনকে বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদ পাঠিয়েছিল। এর ফলে মার্কিন মজুত কমে যায়।
তবে পেন্টাগনের বর্তমান অস্ত্র–সংকটের পেছনে ওই অস্ত্র পাঠানোর ভূমিকা খুবই সামান্য। কারণ, ইরান যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করছে। মজুত থাকা ও ব্যবহৃত অস্ত্রের সঠিক হিসাব প্রকাশ করা হয় না।
পেন্টাগনের ২০২৫ সালের জানুয়ারির এক নথি অনুযায়ী ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রুশ হামলার পর থেকে বাইডেন প্রশাসন দেশটিকে ১০০টির বেশি ধরনের সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছিল।
ওয়াশিংটনভিত্তিক চিন্তক প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’–এর যুদ্ধ অর্থায়ন ও সংগ্রহবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মার্ক এফ কানসিয়ান এ বিষয়ে কথা বলেছেন। সাবেক এই মেরিন কোর কর্নেল বলেন, ইউক্রেনকে দেওয়া অধিকাংশ সরঞ্জামই ছিল স্থলযুদ্ধের উপযোগী। ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধে এই অস্ত্রগুলোর বিশেষ ভূমিকা নেই।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনকে হাজার হাজার সাঁজোয়া যান, ট্রাক ও ট্যাংক দিয়েছিল। এর সঙ্গে ছিল জ্যাভলিন ও টো ক্ষেপণাস্ত্রের মতো ট্যাংক বিধ্বংসী অস্ত্র, মর্টার ব্যবস্থা, কামান ও লাখ লাখ গুলি।
বিপরীতে ইরান যুদ্ধে লড়াই চলছে মূলত আকাশে।
ট্রাম্প প্রশাসন, কংগ্রেসের কর্মকর্তা ও বাইরের সামরিক বিশেষজ্ঞরা অন্যান্য ধরনের অস্ত্রের মজুত শেষ হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
দ্য টাইমস ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও কর্নেল কানসিয়ানের হিসাব অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক বাহিনী সম্প্রতি নিম্নোক্ত অস্ত্রগুলো ব্যবহার করেছে—
# ২ হাজার ৩৩০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের মধ্যে ১ হাজার ২০০টি।
# ৩ হাজার টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১ হাজারের বেশি।
# ৪ হাজার ৪০০টি জেএএসএসএম ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১ হাজার ১০০টির বেশি।
# ৯০টি প্রিসিশন স্ট্রাইক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ৪০ থেকে ৭০টি।
# ৪১০টি এসএম–৩ ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৩০ থেকে ২৫০টি।
# ১ হাজার ১৬০টি এসএম–৬ ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ৯০ থেকে ৩৭০টি।
# ৩৬০টি থাড ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৯০ থেকে ২৯০টি।
এ তালিকার খুব সামান্য কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে দিয়েছিল, যেমন মাত্র ৬০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র।
এ ছাড়া আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য তিন হাজারের বেশি স্টিংগার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের মতো স্বল্প পাল্লার সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে ২০২২ সালের আগস্টে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেখানে বলা হয়েছে, ইউক্রেনকে দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের মজুতে ১৫৫ মিলিমিটারের কামানের গোলার পরিমাণ ‘অস্বস্তিকর রকমের কমে’ গিয়েছিল।
পেন্টাগন ২০২৪ সালে কংগ্রেসের দেওয়া তহবিলের একটি অংশ ব্যবহার করেছে। এই অর্থ দিয়ে ইউক্রেনকে দেওয়া জ্যাভলিন ও স্টিংগার ক্ষেপণাস্ত্র, ১৫৫ মিলিমিটারের গোলাবারুদ ও সাঁজোয়া যান প্রতিস্থাপন করা হয়।
এই সরঞ্জামগুলো কিন্তু ইরান যুদ্ধে কোনো সমস্যার সৃষ্টি করেনি।
হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র ট্রাম্পের বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন। তিনি বাইডেন প্রশাসনের সময় ইউক্রেনে পাঠানো শতকোটি ডলারের অস্ত্রসহায়তার কথা উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক নির্বাহী আদেশের কথাও বলেন। ওই আদেশের ফলে অস্ত্র নির্মাতাদের জন্য চীন বা রাশিয়ার মতো প্রতিপক্ষ দেশ থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ট্রাম্প যা বলেছেন
‘আজ তেলের দাম অনেক কমেছে।’ সোমবারের বক্তব্যে এ কথা বলেন।
এই বক্তব্যের জন্য কিছু পটভূমি জানা প্রয়োজন।
ট্রাম্প যখন সোমবার কথা বলছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে লড়াই সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। এর ফলে তেলের দাম কমেছিল, এটি সত্য।
গত মে মাসের পর এটিই ছিল এক দিনে তেলের দামের সবচেয়ে বড় পতন।
কিন্তু যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় তেলের দাম এখনো বেশ চড়া এবং তা ওঠানামা করছে।
সোমবার বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৯ শতাংশ কমে প্রতি ব্যারেল ৮৮ ডলারে নেমে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজার আদর্শ ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট তেলের দাম ৭ শতাংশের বেশি কমে প্রতি ব্যারেল প্রায় ৮৩ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে তেলের দামে বড় ধরনের ওঠানামা চলছে।
এর আগের সপ্তাহে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
আবার গত বুধবার দাম আবার বেড়ে সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ৯১ ডলার পার হয়ে যায়।
পেন্টাগনের বর্তমান অস্ত্র–সংকটের পেছনে ওই অস্ত্র পাঠানোর ভূমিকা খুবই সামান্য। কারণ, ইরান যুদ্ধে মার্কিন বাহিনী সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করছে। মজুত থাকা ও ব্যবহৃত অস্ত্রের সঠিক হিসাব প্রকাশ করা হয় না।
গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭২ ডলার।
ফলে সোমবারের দাম সাম্প্রতিক সময়ের তুলনায় কম হলেও যুদ্ধ শুরুর আগের চেয়ে তা এখনো প্রায় ২০ শতাংশ বেশি ছিল।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র বলেন, এক দিনের দাম কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে ট্রাম্প সঠিক কাজই করেছেন। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিলে তেলের দাম যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় নেমে আসবে।
ট্রাম্প আগের ভিয়েতনাম, ইরাক ও কোরীয় যুদ্ধে হতাহতের সঙ্গে ইরান যুদ্ধের তুলনা করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি চার্টও সংযুক্ত করেছেন।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যেরও পটভূমি জানা প্রয়োজন। গত জুলাইয়ে ট্রাম্প যে তালিকা বা চার্ট প্রকাশ করেছিলেন, তাতে মৃত্যুর যে সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে, তা সঠিক। তবে কিছু সংখ্যায় সামান্য অমিল রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প নিজের মেয়াদের সীমিত সামরিক অভিযানগুলোর সঙ্গে পূর্ববর্তী একাধিক প্রশাসনের দীর্ঘ কয়েক দশকের বড় যুদ্ধের তুলনা করছেন। তালিকায় থাকা দুটি যুদ্ধ ছাড়া তাঁর নিজের মেয়াদে আরও বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তবে ট্রাম্পের চার্টে সেই তথ্যগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের চার্টে আফগানিস্তান যুদ্ধে দুই হাজার জন ও ইরাক যুদ্ধে ৪ হাজার ৬০০ জন মারা যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অথচ পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, আফগানিস্তান যুদ্ধের প্রথম ধাপে ২ হাজার ৩৫০ জন ও ইরাকে ৪ হাজার ৪১৮ জন নিহত হয়েছিলেন।
ট্রাম্প উল্লেখ করেন, ইরান যুদ্ধে ১৮ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে গত জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলায় এক দিনের সামরিক অভিযানে কোনো মার্কিন সেনা মারা যাননি। পেন্টাগনও এই সংখ্যার কথাই জানিয়েছে। তবে ইরান যুদ্ধে ৬০০ জনের বেশি ও ভেনেজুয়েলায় সাত সেনা আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর দুই সদস্য নিহত হন। পেন্টাগনের রেকর্ড অনুযায়ী, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ২০১৭ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আফগানিস্তান ও অন্যান্য দেশের সামরিক অভিযানে ৬০ জনের বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়েছিলেন।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ট্রাম্পের পূর্বসূরিদের আমলেও বেশ কিছু সীমিত সামরিক অভিযান চালানো হয়েছিল। সেগুলোয়ও নিহত হওয়ার সংখ্যা খুবই কম ছিল।
উদাহরণস্বরূপ, লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলা ঠেকাতে ২০২৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন নৌ অভিযান ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’ শুরু হয়। সেই অভিযানে সম্মুখযুদ্ধে কোনো সেনা মারা যাননি। তবে যুদ্ধবহির্ভূত একটি ঘটনায় অন্তত এক সেনা নিহত হন।