
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী রিক জ্যাকসনকে হারিয়ে জর্জিয়ার গভর্নর নির্বাচিত হয়ে মার্কিন রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ইতিহাস গড়েছেন কেইশা ল্যান্স বটমস।
গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে দেশটির ইতিহাসে তিনিই প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর নির্বাচিত হলেন।
আটলান্টার সাবেক এ মেয়র ও হোয়াইট হাউসের সাবেক উপদেষ্টা একই সঙ্গে জর্জিয়ার প্রথম নারী এবং প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। এর আগে জর্জিয়ার গভর্নর পদটি শুধু শ্বেতাঙ্গ পুরুষদেরই দখলে ছিল।
ডেমোক্র্যাট পার্টির প্রার্থী বটমস বিদায়ী রিপাবলিকান গভর্নর ব্রায়ান কেম্পের স্থলাভিষিক্ত হবেন। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে কেম্প টানা তৃতীয়বারের মতো এ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি।
কেইশা ল্যান্স বটমসের এ বিজয়ের ফলে ২০০৩ সালের পর জর্জিয়ার গভর্নর পদটি আবার ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে এল।
জর্জিয়ার আটলান্টায় জন্ম নেওয়া বটমস ‘ফ্রেডরিক ডগলাস হাইস্কুল’ থেকে মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরে ফ্লোরিডা এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক এবং জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে আইনের ডিগ্রি অর্জন করেন।
কেইশা ল্যান্স বটমসের এ বিজয়ের ফলে ২০০৩ সালের পর জর্জিয়ার গভর্নর পদটি আবার ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে এল।
প্রয়াত আরঅ্যান্ডবি সংগীতশিল্পী মেজর ল্যান্স ও সিলভিয়া রবিনসন দম্পতির কন্যা বটমস। বাবার কারাবাস এবং মায়ের আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে বড় হওয়া কেইশা ল্যান্স বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন, কীভাবে এই পারিবারিক সংকট তাঁকে আইন পেশা ও জনসেবার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছিল।
রাজনীতিতে আসার আগে বটমস একজন আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছেন এবং বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০০৯ সালে আটলান্টা সিটি কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে কেইশা বটমসের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। সে সময় তিনি দক্ষিণ-পশ্চিম আটলান্টার ১১ নম্বর ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধিত্ব করেন।
২০১৩ সালে বটমস পুনর্নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৭ সালের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মেয়র নির্বাচনে মেরি নরউডকে হারিয়ে আটলান্টার ৬০তম মেয়রের দায়িত্ব নেন ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে।
বাবার কারাবাস এবং মায়ের আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে বড় হওয়া কেইশা ল্যান্স বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন, কীভাবে এই পারিবারিক সংকট তাঁকে আইন পেশা ও জনসেবার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছিল।
মেয়র থাকাকালীন কোভিড-১৯ মহামারি ও ২০২০ সালে কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের পর ছড়িয়ে পড়া বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেন বটমস। তাঁর প্রশাসন সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার সংস্কার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেশ কিছু উদ্যোগ নিলেও সে সময় সহিংস অপরাধ বৃদ্ধি ও নাগরিক অসন্তোষ দমনে ব্যর্থতার কারণে তীব্র সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে।
২০২১ সালে বটমস ঘোষণা করেন, তিনি আর মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন না এবং ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তিনি পদ ছাড়েন।
২০২২ সালে বটমস মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনে যোগ দেন। সেখানে তিনি হোয়াইট হাউস অফিস অব পাবলিক এনগেজমেন্টের পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন।
২০২৩ সালে ওই পদ ছাড়ার পর বটমস আবার মূলধারার নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরে আসেন এবং গত মে মাসে জর্জিয়ায় ডেমোক্র্যেটিক পার্টির গভর্নর পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন নিশ্চিত করেন। তাঁর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী জ্যাকসন ছিলেন একজন ধনী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবসায়ী, যিনি এবারই প্রথম কোনো সরকারি পদের জন্য নির্বাচনে লড়েন।
নির্বাচনী প্রচারে জ্যাকসন আটলান্টার মেয়র হিসেবে বটমসের ট্র্যাক রেকর্ড, বিশেষ করে অপরাধ ও বিক্ষোভ দমনে তাঁর ব্যর্থতার কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।
নির্বাচনী প্রচারে বটমসের মূল লক্ষ্য ছিল স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি ‘মেডিকেইড’ সম্প্রসারণ, জর্জিয়ার ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ১৫ ডলারে উন্নীতকরণ, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি করা এবং সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ বাড়ানো।
এসব লক্ষ্যের পাশাপাশি স্থানীয় অবকাঠামো ও পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করে ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানিয়েছিলেন বটমস।
জর্জিয়ার রাজনীতিতে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের রাজনৈতিক গুরুত্ব কতটা গভীর, তা এ নির্বাচনের মাধ্যমে আরও একবার স্পষ্ট হলো। এর আগে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী স্ট্যাসি আব্রামস ২০১৮ ও ২০২২ সালের গভর্নর নির্বাচনে লড়েও ব্যর্থ হয়েছিলেন।
বটমসের এ বিজয় জর্জিয়ার সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে বর্ণ ও লিঙ্গবৈষম্যের দেয়াল ভেঙে ফেলার পাশাপাশি মার্কিন রাজনীতিতে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা করল।