যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক সমর্থকদের অন্যতম প্রধান অংশ ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের প্রায় অর্ধেকই মনে করেন, ইরান যুদ্ধ ও অভিবাসন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি খ্রিষ্টধর্ম সম্পর্কে তাঁদের বোঝাপড়া বা বিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানরা (প্রটেস্ট্যান্ট শাখার অন্তর্গত একটি প্রধান ও প্রভাবশালী ধর্মীয় ধারা) ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনী জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রায়ই নিজেদের নীতি ও লক্ষ্য ব্যাখ্যা করতে ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করেন। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনেও এই ভোটার গোষ্ঠী ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন।
৩ থেকে ৮ জুন পরিচালিত ওই জরিপে অংশ নেওয়া ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের ৫৪ শতাংশ বলেছে, ইরানে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত তাদের খ্রিষ্টধর্মের ব্যাখ্যার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। বিপরীতে ৪১ শতাংশ মনে করে, এটি খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একইভাবে ৫১ শতাংশ বলেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতি খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধের সঙ্গে যায় না। ৪৪ শতাংশ এর বিপরীত মত দিয়েছে।
তবে এসব মতপার্থক্য সত্ত্বেও ইভানজেলিক্যালদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে এখনো বেশি। সর্বশেষ জরিপে এ গোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর সমর্থন হার ৫২ শতাংশ। গত আগস্টে তা ছিল ৬১ শতাংশ। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের মধ্যে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থনের হার ৩৫ শতাংশ।
সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় কিছুটা প্রভাব পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টানদের বড় অংশ রিপাবলিকান পার্টির সমর্থক। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নির্বাচনে শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিক্যাল ভোটারদের ৮১ শতাংশ ট্রাম্পকে ভোট দেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে তাঁর একটি বড় পদক্ষেপ ছিল সুপ্রিম কোর্টে রক্ষণশীল বিচারকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা। পরে সেই আদালত গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকার স্বীকৃত একটি ঐতিহাসিক রায় বাতিল করে দেন, যা বহু ইভানজেলিক্যালের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প নিয়মিত ধর্মীয় নেতাদের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের কর্মস্থলে নিজেদের ধর্মীয় মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও নীতিগত কিছু পরিবর্তন এনেছেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স দাবি করেন, ধর্মপ্রাণ মার্কিন নাগরিকদের জন্য ট্রাম্পের চেয়ে বড় কোনো প্রেসিডেন্ট কখনো ছিলেন না। তাঁর ভাষায়, ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা এবং গর্ভপাতবিরোধী আন্দোলনকারীদের ক্ষমা করার মাধ্যমে ট্রাম্প খ্রিষ্টধর্মে বিশ্বাসীদের বড় অংশের মনে জায়গা করে নিয়েছেন।
জরিপের ফলাফল রিপাবলিকান পার্টির জন্য কিছুটা উদ্বেগের কারণ হতে পারে। কারণ, মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলটিকে কংগ্রেসে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে হবে।
ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা ৬৩ বছর বয়সী ইভানজেলিক্যাল ভোটার স্যান্ডি মিলার বলেন, সুযোগ পেলে তিনি আর ট্রাম্পকে ভোট দিতেন না। স্যান্ডির ২৪ বছর বয়সী মেয়ের স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত সরকারি সহায়তা ট্রাম্প প্রশাসনের সময় কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতির চেয়েও তাঁর ভোটের সিদ্ধান্তে ধর্মীয় বিশ্বাস বেশি প্রভাব ফেলবে।
স্যান্ডির মতে, ট্রাম্প হয়তো খ্রিষ্টান। কিন্তু তাঁর আচরণে সেটি সব সময় প্রতিফলিত হয় না। তিনি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি না, সব সমস্যার সমাধান যুদ্ধ করে হয়। কখনো কখনো যুদ্ধ প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেটি অপরিহার্য ছিল কি না, আমি নিশ্চিত নই।’
স্যান্ডি বলেন, দেশের নেতারা যেন সঠিক সিদ্ধান্ত নেন, সে জন্য তিনি প্রতিদিন প্রার্থনা করেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমি চাই, আমাদের রাজনীতিকেরা কথা বলার চেয়ে বেশি প্রার্থনা করুন।’
জরিপে দেখা গেছে, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের সক্ষমতা নিয়ে অনেক ইভানজেলিক্যাল সন্তুষ্ট নন।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচে। ফলে অর্থনৈতিক বিষয়েও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে সব ইভানজেলিক্যাল ভোটার ট্রাম্পের সমালোচক নন। আইওয়া অঙ্গরাজ্যের ৭৭ বছর বয়সী ভোটার কনি রিস মনে করেন, ইরানে ট্রাম্পের সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে বাইবেলভিত্তিক যুক্তি রয়েছে। তিনি বলেন, কোনো দেশের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। আর ইসরায়েলের অস্তিত্বকে তিনি ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণী পূরণের অংশ হিসেবে দেখেন।
কনি রিসের ভাষায়, ‘ইসরায়েল রাষ্ট্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঈশ্বরের বাণীতে বর্ণিত একটি ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব রূপ। সে কারণে আমি ইসরায়েলকে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সমর্থন করি।’
রয়টার্স/ইপসোসের এই জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের ৪ হাজার ৫৩১ জন প্রাপ্তবয়স্ক অংশ নেন।