
চলতি মাসের শুরুতে ইরানে বিধ্বস্ত হওয়া মার্কিন যুদ্ধবিমানের দুজন ক্রু নিখোঁজ হওয়ার খবর শুনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি কয়েক ঘণ্টা ধরে তাঁর সহযোগীদের সঙ্গে চিৎকার–চেঁচামেচি করেছেন। এমন অবস্থায় পরিস্থিতি শান্ত রাখতে উদ্ধারকাজ চলার সময় সহযোগীরা ট্রাম্পকে সিচুয়েশন রুম (পর্যবেক্ষণ কক্ষ) থেকে দূরে রেখেছিলেন। তবে তাঁরা সিচুয়েশন রুম থেকে প্রতি মুহূর্তের হালনাগাদ তথ্য নিচ্ছিলেন ও ট্রাম্পকে তা জানাচ্ছিলেন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
৩ এপ্রিল ইরানের আকাশসীমায় একটি এফ–১৫ মার্কিন যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করা হয়। এতে ওই যুদ্ধবিমানের দুই ক্রু নিখোঁজ হন। নিখোঁজ ক্রুদের উদ্ধারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি অভিযান পরিচালনা করে। এক ক্রু দ্রুত উদ্ধার হলেও অন্যজনের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। ওই ব্যক্তি শত্রুপক্ষের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় লুকিয়ে ছিলেন। পরে তাঁকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবরে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনে বসে ট্রাম্প যুদ্ধ কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়া এবং দুজন ক্রু নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর ট্রাম্প তাঁর সহযোগীদের সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা ধরে চিৎকার করেছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই সময় হয়তো ১৯৭৯ সালে ইরানে মার্কিন নাগরিকদের জিম্মি করার ঘটনাটি ট্রাম্পের মনে বারবার উঁকি দিচ্ছিল।
পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসসহ ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অভিযানের হালনাগাদ তথ্য নিতে ‘সিচুয়েশন রুমে’ যুক্ত হন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। তবে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তাঁকে ফোনে তথ্য দেওয়া হচ্ছিল।
এক কর্মকর্তা সংবাদপত্রটিকে বলেন, সহযোগীরা প্রেসিডেন্টকে সেই কক্ষের বাইরে রেখেছিলেন। কারণ, তাঁরা আশঙ্কা করছিলেন, ট্রাম্পের অধৈর্য আচরণের কারণে অভিযান পরিচালনায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
৩ এপ্রিল প্রথম ক্রু উদ্ধার হওয়ার পর, দ্বিতীয় ক্রুকে খুঁজে বের করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সময় ছিল খুবই কম। কারণ তাঁদের আশঙ্কা ছিল, ইরানি বাহিনী আগেই তাঁকে আটক করে ফেলতে পারে। অবশেষে প্রথম ক্রু উদ্ধার হওয়ার ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় পর ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্টকে জানানো হয়, দ্বিতীয়জনও উদ্ধার হয়েছেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) সহায়তায় এই উদ্ধার অভিযান সম্ভব হয়েছে। তারাই পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউসকে ক্রুদের অবস্থান সম্পর্কে জানিয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এটি ছিল খড়ের গাদায় সুই খোঁজার মতো কাজ। তবে এ ক্ষেত্রে সে সুই হলো এক সাহসী মার্কিন প্রাণ, যিনি পাহাড়ের খাঁজে লুকিয়ে ছিলেন। সিআইএর বিশেষ প্রযুক্তি ছাড়া তাঁকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব ছিল।’
উদ্ধার অভিযান চলার সময় ইরানি বাহিনীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টায় সিআইএ একটি প্রচারণা চালিয়েছিল। তারা ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দিয়েছিল যে নিখোঁজ ক্রুকে খুঁজে পাওয়া গেছে এবং উদ্ধার করা হয়েছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবর অনুসারে, ট্রাম্প মধ্যরাতের দিকে ট্রুথ সোশ্যালে অভিযানের সাফল্যের কথা প্রচার করেন এবং রাত দুইটায় ঘুমাতে যান। তিনি লিখেছিলেন, ‘এই সাহসী যোদ্ধা ইরানের দুর্গম পাহাড়ের শত্রুসীমানায় ছিলেন। শত্রুরা তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল ও প্রতি ঘণ্টায় তারা তাঁর আরও কাছে চলে আসছিল।’
পরদিন সকালে ট্রাম্প ইরানকে গালাগালি করে একটি পোস্ট দেন। তাঁরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দ্রুত হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে তাদের অবস্থা ভয়াবহ হবে।
এরপর ৭ এপ্রিল ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলতে রাজি না হয়, তবে ওই রাতে একটি আস্ত সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্পের মন্তব্যগুলো বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। অনেক আইনপ্রণেতা প্রেসিডেন্টের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।