কুয়েতে নিহত ছয় মার্কিন সেনাসদস্যের মরদেহ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণের অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। ৭ মার্চ ২০২৬
কুয়েতে নিহত ছয় মার্কিন সেনাসদস্যের মরদেহ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণের অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। ৭ মার্চ ২০২৬

জেডি ভ্যান্স ও ড্যান কেইনের উদ্বেগের কারণেই ইরানে হামলা স্থগিত করলেন ট্রাম্প

হোয়াইট হাউসে গত শুক্রবার এক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানে যুদ্ধ আরও জোরদার করার সম্ভাবনাটি বিবেচনা করছিলেন, তখন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিষয়টি সম্পর্কে জানে এমন একটি সূত্র এবং এক মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে এমন তথ্য জানিয়েছেন।

টানা প্রায় ১৩ দিন প্রতি রাতে ইরানে বোমাবর্ষণের পর গত শুক্রবার রাতে মনে হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে তাদের সেই অভিযান স্থগিত করেছে। গত শনিবার প্রতিরক্ষা বিভাগ পেন্টাগনের একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, ইরানে অভিযান বর্তমানে ‘স্থগিত’ রয়েছে।

সূত্রগুলোর মতে, শুক্রবারের বৈঠকে কেইন বিশেষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক গোলাবারুদের মজুত এবং অন্যান্য সম্ভাব্য নেতিবাচক পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরেন।

ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলা হয়েছিল, এমনটা করলে অসংখ্য ইরানির মৃত্যু হতে পারে এবং আরও অনেক মানুষ বিদ্যুৎ বা খাবার ছাড়া চরম কষ্টে ভুগবে।

একটি সূত্র জানায়, কেইন ট্রাম্পকে বলেছিলেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রেসিডেন্টের দেওয়া প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন এবং সফল করতে সক্ষম। আবার তিনি এর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কেও সতর্ক করেন।

সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের সময় যেসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল, তার মধ্যে গোলাবারুদের ঘাটতির বিষয়টি ছিল অন্যতম। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার বড় ধরনের অভিযান শুরু করলে ইরানের ভেতরে সাধারণ নাগরিকদের ব্যাপক প্রাণহানি হতে পারে। বৈঠকে এ আশঙ্কার কথাও তুলে ধরা হয়।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প ইরানের রাস্তাঘাট, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দিয়েছিলেন, যা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে।

ওই সূত্রের মতে, ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলা হয়েছিল, এমনটা করলে অসংখ্য ইরানির মৃত্যু হতে পারে এবং আরও অনেক মানুষ বিদ্যুৎ বা খাবার ছাড়া চরম কষ্টে ভুগবে।

কক্ষে উপস্থিত বেশির ভাগ উপদেষ্টা বলেছিলেন, ট্রাম্প যদি বড় ধরনের কোনো হামলা চালাতে চান, তবে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত ধ্বংসাত্মকভাবে তা করতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট যেন এর সম্ভাব্য দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের পরিণতিগুলো বিবেচনা করেন।

আলোচনার সঙ্গে পরিচিত একটি সূত্রের মতে, শুক্রবারের বৈঠকে উঠে আসা অন্যান্য বিস্তৃত উদ্বেগের মধ্যে ছিল—সম্ভাব্য শরণার্থী সংকট, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলোতে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা এবং আঞ্চলিকভাবে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা।

কক্ষে উপস্থিত বেশির ভাগ উপদেষ্টা বলেছিলেন, ট্রাম্প যদি বড় ধরনের কোনো হামলা চালাতে চান, তবে যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত ধ্বংসাত্মকভাবে তা করতে পারে। তবে প্রেসিডেন্ট যেন এর সম্ভাব্য দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের পরিণতিগুলো বিবেচনা করেন।

গোলাবারুদের স্বল্পতার উদ্বেগ, নাকি যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় এই সতর্কবার্তা—কোনটি যুক্তরাষ্ট্রকে ধারাবাহিক রাতের হামলা স্থগিত করতে বাধ্য করেছে বা এই স্থগিতাদেশ সামনেও বজায় থাকবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেং এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব সময়ই বলে আসছেন, ‘তিনি কূটনৈতিক সমাধান পছন্দ করেন। তবে ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে বা আমাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যায়, তাহলে তিনি সব ধরনের পদক্ষেপের পথ খোলা রাখবেন।’

চেং বলেন, ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া সফল নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের বারবার আগ্রাসনের জবাবে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে টানা ১৩ দিনের হামলার পর ইরানের জন্য বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে সমঝোতামূলক চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া। তা না হলে কী হতে পারে, তা তাদের জানাই আছে।

জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের এক মুখপাত্র বলেন, ‘চেয়ারম্যান প্রেসিডেন্টকে যেসব গোপনীয় সামরিক পরামর্শ দেন, আমরা সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করি না।’

সিএনএন এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের কার্যালয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে।

সিএনএন আগেই জানিয়েছিল, এ ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের মূল অস্ত্রাগারের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং ইরানে হামলা অব্যাহত থাকলে তা আরও সংকটে পড়তে পারে।

গতকাল রোববার জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়ালৎস বলেছেন, ইউক্রেনকে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যে সহায়তা দিয়েছে, তাতে তাদের গোলাবারুদের একটি বড় অংশ শেষ হয়ে গেছে।

চেয়ারম্যান প্রেসিডেন্টকে যেসব গোপনীয় সামরিক পরামর্শ দেন, আমরা সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করি না। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের মুখপাত্র

ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওয়ালৎস বলেন, ‘ইউক্রেনকে অনেক অস্ত্র দেওয়ায় আমরা একটি কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। তার ওপর হুতিদের বিরুদ্ধেও অনেক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এই অভিযান পরিচালনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আরও সস্তা, দ্রুত ও উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র তৈরি করে নতুন করে আমাদের মজুত গড়ে তুলছি।’

ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে এই যুদ্ধে জড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন।

সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন গতকাল রোববার এবিসির ‘দিস উইক’ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আমাদের কখনই এই অর্থহীন যুদ্ধে জড়ানো উচিত হয়নি। এটি এখনই শেষ করা উচিত। আমরা আমাদের ইন্টারসেপ্টরগুলোর (ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী অস্ত্র) মজুত কমিয়ে ফেলেছি, যা ইরানি হামলা ঠেকানো এবং মার্কিন সেনাদের সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। বিশ্বজুড়ে আমরা অন্যান্য সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকিতে থাকা সত্ত্বেও প্রতিদিন এসব গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের অপচয় করছি।’

গত শুক্রবার মন্ত্রিসভার সদস্য ও শীর্ষ উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে আলোচনা করছেন। তবে তিনি এ–ও বলেন, সামরিক বাহিনী বোমাবর্ষণ অব্যাহত রাখতে পারে অথবা ‘হামলার মাত্রা আরও বৃদ্ধি করতে পারে’। তিনি দাবি করেন, চলমান আলোচনায় ইরানকে আগের চেয়ে ‘বেশি গম্ভীর’ বলে মনে হচ্ছে।

বিষয়টি সঙ্গে অবগত একটি সূত্র জানায়, শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন বিবেচনা করছিল, যুদ্ধের বিস্তার দেখতে কেমন হতে পারে। সূত্রটি জানায়, উপসাগরীয় দেশগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাম্প্রতিক কথোপকথনে সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছে। তবে তারা এটিও স্বীকার করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন বিশেষ সক্ষমতা রয়েছে, যা দিয়ে চাইলে তারা এই সংঘাত আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

এমনকি ট্রাম্প চলতি সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলার কথা বিবেচনা করছেন বলে জানানোর পরও তিনি গোপনে তাঁর মধ্যস্থতাকারীদের ‘আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার’ নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই উদ্যোগ স্পষ্ট করে, স্থলসেনা সরাসরি না নামিয়ে সীমিত পরিসরে সামরিক হামলা চালানো কতটা কঠিন, তা প্রেসিডেন্ট ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন।

একাধিক সূত্রের মতে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলের বা পেন্টাগনের খুব কম মানুষই বিশ্বাস করতেন, সংঘাত বাড়ানোর এসব পথ ট্রাম্পের জন্য আশানুরূপ ফলাফল এনে দেবে।

সিএনএন আরও জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই কেইন ও অন্য সামরিক নেতারা ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন, দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুতে টান ফেলতে পারে।

পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী। প্রেসিডেন্টের পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো স্থানে এবং যেকোনো সময়ে অভিযান চালানোর মতো সব সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

শন পার্নেল বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন কমব্যাট্যান্ট কমান্ডজুড়ে একাধিক সফল অভিযান চালিয়েছি। সেই সঙ্গে আমাদের মানুষ ও স্বার্থ রক্ষায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর অস্ত্রের শক্তিশালী মজুত নিশ্চিত রেখেছি।’