চরম ইরানবিদ্বেষী ও ইসরায়েলের অনুগত হেগসেথ এখন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বছরের পর বছর ধরে ইরানের প্রতি তীব্র শত্রুতাপূর্ণ মনোভাব দেখিয়ে আসছেন। বিভিন্ন বই, ফক্স নিউজের অনুষ্ঠান, বিভিন্ন শিক্ষামূলক ভিডিও ও ২০১৮ সালে জেরুজালেমে একটি ইসরায়েলি গণমাধ্যম আয়োজিত সম্মেলনে দেওয়া বক্তৃতায় তাঁকে ইরানের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক কথা বলতে দেখা গেছে। দ্য গার্ডিয়ানের এক পর্যালোচনায় এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

২০২০ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ে পিট হেগসেথ লিখেছেন, ইরানের নেতারা পশ্চিমাদের একেবারে দুর্বল করে দিতে চান। এ জন্য তাঁরা সামরিক শক্তি, বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর চেষ্টা করছেন।

২০১৭ সালে কট্টর ডানপন্থী গণমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম প্রেগারইউর জন্য তৈরি করা এক ভিডিওতে হেগসেথ ইরানকে ‘যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বের শত্রু’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

২০১৮ সালে জেরুজালেমে অনুষ্ঠিত এক ইসরায়েলি গণমাধ্যম সম্মেলনে পিট হেগসেথ ইরানকে ‘অক্টোপাস’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আজ বিশ্বজুড়ে ইরান সরকারের অনেক শুঁড় ছড়িয়ে আছে, যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গোপনে ষড়যন্ত্র করছে।’

হেগসেথ আরও দাবি করেন, ইরান এমন এক ‘পারমাণবিক সক্ষমতা’ গড়ে তুলছে, যা ‘যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলতে পারে।’

মূলত ইসরায়েলের প্রতি অপরিসীম আনুগত্যের জায়গা থেকে হেগসেথ প্রায়ই ইরানের তীব্র সমালোচনা করে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্র এখন ইসরায়েলের সঙ্গে মিলিত হয়ে ইরানের ওপর ব্যাপক বিমান হামলা চালাচ্ছে। এতে শত শত মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। বিশ্বের জ্বালানির বাজারে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে।

২০২০ সালে প্রকাশিত এক বইয়ে হেগসেথ লিখেছেন, ‘আপনি ইসরায়েলকে ভালো না বেসে যুক্তরাষ্ট্রকে ভালোবাসতেই পারেন। কিন্তু এতে আমি ধরে নেব, বাইবেল ও পশ্চিমা সভ্যতা সম্পর্কে আপনার জ্ঞান খুবই অপরিপূর্ণ। আপনি যদি যুক্তরাষ্ট্রকে ভালোবাসেন, তবে আপনার ইসরায়েলকেও ভালোবাসা উচিত। আমরা ইতিহাস ভাগাভাগি করি, আমরা বিশ্বাস ভাগাভাগি করি, আমরা স্বাধীনতাও ভাগাভাগি করি।’

ওই বইয়ে হেগসেথ ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি–যুদ্ধের অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ইসলামপন্থী ও আন্তর্জাতিক বামপন্থীদের ১ নম্বর শত্রু ইসরায়েল। একমাত্র এ কারণেই দেশটিকে ভালোবাসা উচিত।’

এসব মন্তব্য ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে পিট হেগসেথের ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নতুন করে আলোকপাত করছে। তিনি ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করছেন এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে সর্বোচ্চ সংঘাতের পক্ষে ধারাবাহিকভাবে সমর্থন দিয়ে আসছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ

সাম্প্রতিক দিনগুলোয় যুদ্ধের যৌক্তিকতা ও কৌশলগত উদ্দেশ্য নিয়ে রাজনৈতিক সব স্তরেই প্রশ্ন উঠেছে। হেগসেথ ও ট্রাম্প যুদ্ধের অগ্রগতি ও সম্ভাব্য অবসান সম্পর্কে মিশ্র বার্তা দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে পেন্টাগনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করেছিল গার্ডিয়ান। তবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ত্রিতা পারসি বলেন, ইরান নিয়ে হেগসেথ আগে থেকে প্রকাশ্যে যেসব মন্তব্য করে আসছেন, তাতে বোঝা যায়, গণপ্রজাতন্ত্রী রাজনৈতিক বৃত্তে এ ধরনের ইসলামবিরোধী, মুসলিমবিরোধী মনোভাব বহু সময় ধরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে।

হেগসেথ ও ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে পারসি বলেন, ‘আমার মনে হয়, তাঁরা চার দিনের মধ্যেই এই যুদ্ধে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। তাঁদের প্ল্যান “এ” ছিল। সে পরিকল্পনা অনুযায়ী তাঁরা মনে করেছিলেন, সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার পর শাসনব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। হয় ধ্বংস হবে, নয়তো আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু যখন তা কাজ করেনি, তখন তাঁদের কাছে আর প্ল্যান “বি” ছিল না।’

‘যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি’

২০২০ সালে প্রকাশিত ‘আমেরিকান ক্রুসেড’ নামের বইয়ে হেগসেথ ইরানকে আল–কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে তুলনা করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য দেশটিকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করেন।

‘ইসলামিজম: দ্য মোস্ট ডেঞ্জারাস ইজম’ শিরোনামের একটি অধ্যায়ে হেগসেথ ইসলামের ভিন্ন ভিন্ন অনুসারী গোষ্ঠী ও দেশকে একসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, যারা প্রায়ই একে অপরের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে না, কিন্তু আমরা সব সময় ইসলামপন্থীদের সঙ্গে যুদ্ধ করছি।

হেগসেথ লিখেছেন, আল–কায়েদা, ইসলামি রাষ্ট্র, তালেবান, ইরান এবং এ ধরনের গোষ্ঠীগুলো হলো ইসলামপন্থী আন্দোলনের সর্বশেষ সংস্করণ, যাদের ‘সহাবস্থান’–এর কোনো পরিকল্পনা নেই। তারা ভূমি চাইছে, তারা ক্ষমতা চাইছে, তারা জনমিতিবিষয়ক ও রাজনৈতিক সুবিধা চাইছে এবং তারা সক্রিয়ভাবে সামরিক সক্ষমতা, বিশেষ করে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করছে, যেন পশ্চিমাদের আত্মসমর্পণ করানো যায়।

একই অংশে হেগসেথ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরবকে নিয়েও আক্রমণাত্মক কথা বলেছিলেন। চলমান সংঘাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া সৌদি আরব সম্পর্কে হেগসেথ লিখেছিলেন, দেশটির তেলের অর্থ বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোয়, ইউরোপে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও কট্টরপন্থী, পশ্চিমাবিরোধী ইসলামি স্কুল (মাদ্রাসা) ও মসজিদ স্থাপনে ব্যয় হয়।

বইয়ের অন্য একটি অংশে হেগসেথ ইরানকে ইরাক দখলকারী দুষ্ট শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি সেখানে এক ইরাকি নাগরিকের বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাঁকে ‘টেক্সাস ওমর’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে।

ওমরের বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে হেগসেথ লিখেছেন, ‘আমরা দেখেছি, কীভাবে ইরান পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চেয়েছিল এবং আমাদের তাদের প্রভাবের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়েছিল। আমরা সেই দুষ্ট শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে জীবন দেওয়ার জন্যও প্রস্তুত ছিলাম। হার না মেনে জীবনবাজি রেখেছিলাম আমরা।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ

হেগসেথ ২০২০–এর দশকে রক্ষণশীল আন্দোলনের প্রচারে বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থিত হয়ে একই ধরনের কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ২০১৭ সালের একটি ভিডিওতে দেখাতে চেয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরাক থেকে সেনা প্রত্যাহার করার পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা ইরাকের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশী ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শত্রুদেশ ইরান পূরণ করে ফেলে। আর আইএস নিরাপত্তাজনিত শূন্যস্থানকে নির্মমভাবে কাজে লাগায়।

রিপাবলিকানপন্থী ফক্স নিউজে এক দশক ধরে অতিথি, কন্ট্রিবিউটর ও উপস্থাপক হিসেবে কাজ করার সময় হেগসেথ ইরানের বিরুদ্ধে সব সময় আগ্রাসী মনোভাব প্রচার করেছেন।

২০১৪ সালের ১৪ জানুয়ারি ‘দ্য কেলি ফাইল’ অনুষ্ঠানে হেগসেথ সাবেক যোদ্ধার প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি সেদিন ইরানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফের কথা উল্লেখ করেন, যিনি হিজবুল্লাহর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা ইমাদ মুঘনিয়েহর কবরের ওপর পুষ্পস্তবক অর্পণ করেছিলেন।

মুঘনিয়েহ ২০০৮ সালে একটি গাড়ি বোমা হামলায় নিহত হয়েছিলেন। এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের যৌথ অভিযান বলে বিবেচনা করা হয়।

হেগসেথ এ ঘটনার সুযোগ নিয়ে ওবামা প্রশাসনের তৎকালীন অস্থায়ী পারমাণবিক চুক্তির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘কবরের ওপর পুষ্পস্তবক অর্পণের ঘটনায় মনে হচ্ছে, এই শাসকগোষ্ঠীর সত্যিকারের চাওয়াটা কী, তার সবকিছু আমাদের জানা দরকার।’

উগ্রবাদী মানসিকতার হেগসেথ আরও বলেন, জারিফ ও হাসান রুহানি (তৎকালীন ইরানি প্রেসিডেন্ট) কুদস বাহিনী ও হিজবুল্লাহরই লোক। তাঁরা একই মানুষ, একই নিয়ন্ত্রণ, একই মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব করেন।

২০২০ সালে প্রকাশিত এক বইয়ে হেগসেথ লিখেছেন, ‘আপনি ইসরায়েলকে ভালো না বেসে যুক্তরাষ্ট্রকে ভালোবাসতেই পারেন। কিন্তু এটাতে আমি ধরে নেব যে, বাইবেল ও পশ্চিমা সভ্যতা সম্পর্কে আপনার জ্ঞান খুবই অপরিপূর্ণ। আপনি যদি যুক্তরাষ্ট্রকে ভালোবাসেন, তবে আপনার ইসরায়েলকেও ভালোবাসা উচিত। আমরা ইতিহাস ভাগাভাগি করি, আমরা বিশ্বাস ভাগাভাগি করি, আমরা স্বাধীনতাও ভাগাভাগি করি।’

২০২০ সালে হেগসেথ ফক্স নিউজের একাধিক অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের নির্দেশে কুদস বাহিনীর কমান্ডার কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার ঘটনায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন।

ওই বছরের ৩ জানুয়ারি হেগসেথ ফক্স বিজনেসে উপস্থিত হয়ে ইরানের অন্য নেতাদের জন্য একধরনের হুমকি দেন। তিনি বলেন, ‘ইরানের এখন চিন্তিত হওয়া উচিত, হয়তো আমরা আবারও কিছু করব। যদি আপনারা মার্কিন নাগরিকদের হত্যা করার চেষ্টা চালিয়ে যান, তাহলে হয়তো আপনার দ্বিতীয় কোনো জেনারেলই হবেন পরবর্তী লক্ষ্য।’

কয়েক দিন পর ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি হেগসেথ ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে বলে ইঙ্গিত দেন। ইরাকের ঘাঁটিতে থাকা মার্কিন বাহিনীর ওপর ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পর তিনি এ মন্তব্য করেন।

ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হেগসেথ বলেন, ‘আমরা ইরাক থেকে বের হব কি হব না, তা আমাদের শর্ত সাপেক্ষে হওয়া উচিত এবং তা নির্ভর করবে আমরা ইরানকে ও তাদের পারমাণবিক বোমা অর্জনের সক্ষমতাকে কীভাবে মোকাবিলা করি, তার ওপর। এখনই হতে পারে সে সময়, যখন আমরা তাদের সেই সক্ষমতাকে ধ্বংস করতে পারি।’

তাদের সক্ষমতা ধ্বংস করা বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, তা হেগসেথ ব্যাখ্যা করেননি।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ

জেরুজালেমে বক্তৃতা

২০১৮ সালে হেগসেথ জেরুজালেমে আয়োজিত এক সম্মেলনে ভাষণ দেন। আরুৎজ শেভা নামের একটি ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওই সম্মেলনটির আয়োজন করেছিল। এটি ইসরায়েল ন্যাশনাল নিউজ নামেও পরিচিত।

সেখানে বক্তৃতায় হেগসেথ তৎকালীন ইসরায়েলি নাফতালি বেনেট, উপ–প্রতিরক্ষামন্ত্রী, জেরুজালেমের উপ–মেয়র এবং নেসেটের সদস্যদের উপস্থিত থাকার কথা উল্লেখ করেছিলেন। হেগসেথের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে মনোনয়নের পর ২০২৪ সালের ১৩ নভেম্বর ভিডিওটি নতুনভাবে প্রকাশ করে আরুৎজ শেভা।

সম্মেলনে হেগসেথের উপস্থিতি ও ইসরায়েল সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য নিয়ে আগেই কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে ইরানকে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা আগে কখনো প্রকাশ হয়নি।

বক্তৃতায় হেগসেথ সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসনের করা আলোচিত ইরান পারমাণবিক চুক্তিকে প্রতারণা হিসেবে উপস্থাপন করেন।

এরপর হেগসেথ ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে বেশ কিছু বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সমালোচনা করে বলেন, ‘আপনি যদি সরেজমিনে দেখেন, তাহলে বুঝবেন, দুই রাষ্ট্র সমাধানের কোনো বাস্তব ফলাফল নেই। এখানে একটি রাষ্ট্রই রয়েছে।’

ইরান নিয়ে হেগসেথ আগে থেকে প্রকাশ্যে যেসব মন্তব্য করে আসছেন, তাতে বোঝা যায় যে, গণপ্রজাতন্ত্রী রাজনৈতিক বৃত্তে এ ধরনের ইসলামবিরোধী, মুসলিমবিরোধী মনোভাব বহু সময় ধরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে আছে
ত্রিতা পারসি, কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল স্টেটক্রাফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক

এই মুসলিমবিদ্বেষী মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পশ্চিম তীর অধিগ্রহণের বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে শ্রোতাদের প্রতি আহ্বান জানান।

হেগসেথ বলেন, ‘টিকিট কিনুন, পদক্ষেপ নিন। ইসরায়েলে যা যা করতে হবে, তা করুন। কারণ, আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, এটি এমন একটি মুহূর্ত, যখন যুক্তরাষ্ট্র আপনাদের পাশে থাকবে।’

হেগসেথ টেম্পল মাউন্টে মন্দির পুনর্নির্মাণের পক্ষেও সমর্থন জানিয়েছেন। এটি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে অন্যতম সংবেদনশীল ও উত্তেজনাকর বিষয়। কারণ, ওই স্থানেই আল–আকসা মসজিদের অবস্থান, যা ইসলাম ধর্মের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান।

১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ ও ২০১৭ সালে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতির বিষয়গুলোকে হেগসেথ ধারাবাহিক ‘জায়নবাদী অলৌকিক ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

হেগসেথ বলেন, ‘টেম্পল মাউন্টে আবার মন্দির প্রতিষ্ঠার মতো অলৌকিক ঘটনা যে ঘটবে না, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কীভাবে তা ঘটবে, আমি জানি না। আপনারাও জানেন না কীভাবে তা ঘটবে। কিন্তু আমি জানি, এটা ঘটতে পারে।’

একই বক্তৃতায় বিতর্কিত এই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউরোপকে ‘উগ্র ইসলামপন্থীদের দিয়ে ভরপুর ‘একটি জাদুঘর’ বলে উল্লেখ করেন।

ইসরায়েলে হেগসেথের করা মন্তব্য সম্পর্কে পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক পারসি বলেন, ‘আমার মনে হয়, তখন বক্তৃতাগুলোর অনেকগুলোই দেওয়ার কারণ ছিল। এতে রাজনৈতিকভাবে কোনো ক্ষতি হতো না বা তা লাভজনক কাজ ছিল।’

পারসি বলেন, তবে ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলি দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাবিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ইসরায়েলের কথা শুনে তারা সত্যিই বিশ্বাস করেছিল, ইরান কেবল একটি কাগজের বাঘ। ইসরায়েল বলেছিল, তাদের সঙ্গে কোনো চুক্তি করবে না। তাদের বাদ দিন। আপনি হবেন নায়ক। আপনি হবেন সেই প্রেসিডেন্ট, যিনি ৪৭ বছর ধরে চলতে থাকা ধর্মনির্ভর শাসনব্যবস্থার বিলোপ ঘটাবেন।’

‘ঈশ্বরও ইসরায়েলি জনগণের পাশে আছেন’

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্ক নিয়ে হেগসেথ তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে প্রায়ই ধর্মীয় ভাষায় প্রকাশ করেন। মার্কিন কূটনৈতিক নীতি ও বাইবেলীয় বিধিনিষেধগুলো তখন মিলেমিশে যায়।

উগ্রপন্থী এই নেতা ‘আমেরিকান ক্রুসেড’ বইয়ে লিখেছেন, ‘ঈশ্বরও ইসরায়েলের শত্রুদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি জনগণের পাশে দাঁড়ান এবং যাঁরা ইসরায়েলকে আশীর্বাদ করেন, তাঁদের আশীর্বাদ করেন। যুক্তরাষ্ট্রকে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়াতে হবে। কারণ, আমরা ঈশ্বরকে সম্মান করি এবং স্বাধীনতাকে ভালোবাসি।’

২০১৮ সালে দেওয়া বক্তৃতায় হেগসেথ ইসরায়েলের সীমানা বৃদ্ধি করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি শ্রোতাদের উদ্দেশে বলেন, ‘দেশপ্রেমিক মার্কিন, ইভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিষ্টান ও বিশ্বাসীদের মধ্যে আপনাদের প্রতি সমর্থন আছে, এটা মনে রাখবেন।’

এর আগে গার্ডিয়ানের অন্য আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, হেগসেথের প্রকাশিত লেখায় মুসলিমবিদ্বেষ ফুটে উঠেছে। যেমন ইউরোপে মুসলিম অভিবাসন নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং ইসলামের ইতিহাস নিয়ে ভুল দাবি করেছিলেন তিনি।

‘আমেরিকান ক্রুসেড’ বইয়ে মধ্যযুগীয় ধর্মযুদ্ধকে সমকালীন সংঘাতের একটি মডেল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এবং এতে একটি স্লোগানও ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে দেয়ুস ভুল্ট স্লোগান উল্লেখ করা আছে। যার অর্থ, ‘এটাই ঈশ্বরের চাওয়া’। স্লোগানটি হেগসেথের বাহুতেও ট্যাটু করা আছে।