
ইরানের যুদ্ধ নিয়ে যত খবর হচ্ছে, তা দেখে মনে হবে এখানে খেলছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। আসলে তা নয়। এখানে মূল খেলোয়াড় বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ইসরায়েলের তুলনায় অনেক বেশি হলেও এই সংঘাতে খেলছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীই।
এখন বলা যায়, নেতানিয়াহু নিজের তৈরি এক ফাঁদে নিজেই পড়েছেন, আর সেই ফাঁদে তিনি ট্রাম্প এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীকেও টেনে এনেছেন। ইসরায়েলের জন্য কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য, এই যুদ্ধের শেষ হতে হবে পূর্ণ বিজয়ের মাধ্যমে। এর কম কিছু হলে তা অর্থহীন হয়ে পড়বে।
যদি যুদ্ধ এমন অবস্থায় শেষ হয় যে বড় ক্ষতি কিংবা ব্যাপক প্রাণহানির পরও ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে, সেটাও ইসরায়েলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। তখন ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে দাঁড়াবে তাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ব্যবহার করে দ্রুত একটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি ও পরীক্ষা করা, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ তাদের ওপর হামলা করার সাহস না পায়।
এটি অসম্ভব করে তুলতে হলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর এমন পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে তারা রাষ্ট্রের প্রতিটি অংশে প্রবেশাধিকার পায়। মাটির গভীরে থাকা বাংকার এবং গত জুনের হামলার পরও টিকে থাকা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রেও। এখন আরও বিমান হামলায় তা সম্ভবপর হবে না, এমনকি যুক্তরাজ্যের ঘাঁটি থেকে উড়ে আসা বি-২ স্টিলথ বোমারু বিমান ওড়ালেও।
এদিকে একদিকে বলা হচ্ছে যুদ্ধ প্রায় জিতে গেছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী অঞ্চলটিতে তৃতীয় একটি বিমানবাহী নৌবহর মোতায়েনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এ যুদ্ধ শুরু থেকেই পরিকল্পনামাফিক এগোয়নি। পরিকল্পনা ছিল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং ধর্মীয় ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর যত বেশি সম্ভব শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা, যাতে ইরানে ক্ষমতাসীনেরা দুর্বল হয়ে পড়েন এবং তাঁদের ইসলামি শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। কিন্তু এই পরিকল্পনা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে, যেমনটি আগে থেকেই এক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছিল।
ইরানি শাসনব্যবস্থার নতুন নেতা মজুত রয়েছে এবং সম্ভবত মোজতবা খামেনি যদি নিহতও হন, সে ক্ষেত্রেও দায়িত্ব নেওয়ার জন্য এক বা একাধিক নেতা আগে থেকেই তৈরি আছে।
এখন তাই যুদ্ধের কৌশল এখন ‘প্ল্যান বি’-তে পৌঁছেছে, যার দুটি উপাদান আছে। এর মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কুর্দি বা বালুচদের মতো সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কাজ করে তাদের বিদ্রোহে উৎসাহ দেওয়া, যাতে ইরান ভেঙে পড়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এতে কিছু প্রভাব পড়তে পারে, কিন্তু উদাহরণ হিসেবে কুর্দিরা ইসরায়েলের ওপর সহজে আস্থা রাখবে না। আর ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তো আরও কম।
দ্বিতীয় উপাদানটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইসরায়েলের ঐতিহ্যগত সামরিক কৌশলের সঙ্গে সম্পর্কিত, তা হলো শত্রুর নিজ দেশে সমর্থনে চিড় ধরানো।
এটাই ‘দাহিয়া নীতি’। এই নীতি অনুযায়ী যদি কোনো বিদ্রোহ দমন করা না যায় বা কোনো রাষ্ট্রের নেতৃত্বকে বশে আনা সম্ভব না হয়, তাহলে বিজয়ের পথ হলো বেসামরিক জনগণের ওপর অবিরাম কঠোর আঘাত হানা।
এই নীতি বর্তমানে লেবাননে প্রয়োগ করা হচ্ছে। সেখানে দক্ষিণ বৈরুতের দাহিয়া উপশহরে হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি ধ্বংস করার অভিযান শুরু হয়েছে। ২০০৬ সালের হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় থেকেই এই এলাকার নাম থেকেই নীতিটির নামকরণ হয়েছিল।
সমালোচকেরা বলেন, গত ৩০ মাসে গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও এই নীতি ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে অন্তত ৭০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, আরও অনেক বেশি মানুষ আহত হয়েছে এবং গাজার বেশির ভাগ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তবু হামাস এখনো টিকে আছে এবং গাজার কিছু অংশ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এই বাস্তবতা সত্ত্বেও এখন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষাবাহিনী এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে একই নীতি প্রয়োগ করছে। অবকাঠামোর ওপর হামলার ক্রমবর্ধমান প্রমাণ এরই মধ্যে দৃশ্যমান।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সতর্ক করে বলেছেন, এটি হবে ‘ইরানের ভেতরে আমাদের সবচেয়ে তীব্র হামলার দিন’ এবং ‘অপারেশন এপিক ফিউরির দশম দিনে ইরান একা হয়ে গেছে এবং তারা মারাত্মকভাবে হারছে।’
সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলের সামরিক কৌশলের অভিজ্ঞতা এবং ট্রাম্প ও হেগসেথের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের আরও আক্রমণাত্মক অবস্থান, এই দুইয়ের সমন্বয়ে আমরা সম্ভবত ইরানজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে পাব।
এটি একটি বিশাল কাজ এবং প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ মানুষের দেশে এর বড় প্রভাব ফেলতে কয়েক মাস সময় লাগবে, যা গাজার জনসংখ্যার তুলনায় ৪০ গুণের বেশি।
তা ছাড়া এই কৌশল কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনাও খুব কম।
এর একটি অবশ্যম্ভাবী ফল হতে পারে, ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পশ্চিম উপসাগরীয় দেশগুলো যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও সৌদি আরবের তেল ও গ্যাস শিল্পে হামলা বাড়িয়ে দেওয়া।
এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে এমন ধাক্কা লাগতে পারে, যার তুলনা হতে পারে ১৯৭৩–৭৪ সালের ওপেক তেল নিষেধাজ্ঞার সময়কার ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে।
তবে এখনো সামান্য আশা আছে যে কিছুটা বুদ্ধি ও সংযম কাজ করতে পারে। ট্রাম্প যে দাবি করছেন যুদ্ধ প্রায় জিতে গেছেন। তা হয়তো কেবল তাঁর কল্পনা। তবে এমন কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে ইসরায়েলের ভেতরে কেউ কেউ দ্বিতীয়বার ভাবতে শুরু করেছেন এবং এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছেন। ওয়াশিংটনেও এমন ভিন্নমত হয়তো ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে।
এটি হয়তো খুবই সতর্ক আশাবাদ। তবু তা বর্তমান পরিস্থিতির চেয়ে ভালো, যেখানে সামনে রয়েছে এই ভয়াবহ ও ক্রমবর্ধমান যুদ্ধের আরও বহু সপ্তাহ ও মাস।
* পল রজার্স, প্রফেসর ইমিরেটাস, শান্তি অধ্যয়ন বিভাগ, ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়