
যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক সেনা কর্মকর্তা নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড ফায়ারিং স্কোয়াডে কার্যকর করার দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। এর কঠোর সমালোচনা করে দ্য গার্ডিয়ানের অনলাইনে আজ লিখেছেন অস্ট্রেলিয়ার কলাম লেখক পল ডেইলি।
বোকা ছিলাম আমিই। ভাবছিলাম, যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন এমন আর কী করতে বা বলতে পারে, যা আমাকে এখনো চমকে দিতে পারে? তারা যতই রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে দেউলিয়া হোক, যতই স্বার্থপর বা সহিংস হোক—আমি ভেবেছিলাম, আর কিছুতেই বিস্মিত হব না।
তারপর শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠে খবরটি দেখলাম।
ট্রাম্প মন্ত্রিসভার বড়সড় গোঁয়ারদের একজন পিট হেগসেথ ঘোষণা করেছেন, হত্যাকারী নিদাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড প্রকাশ্যে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে কার্যকর করবে যুক্তরাষ্ট্র।
হেগসেথ একজন কট্টর খ্রিষ্টান জাতীয়তাবাদী। ক্রুসেডের কল্পনায় বিভোর মানুষটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘যুদ্ধমন্ত্রী’।
গত কিছুদিনে আমরা অনেক কিছুই দেখেছি। বিশ্বজুড়ে বেপরোয়া সামরিকীকরণ চলছে। জাতিসংঘে ইরানকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়কের বিরুদ্ধে যৌন অসদাচরণের একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে।
দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বব্যবস্থার ওপর যে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলেছে, তারপরও যুক্তরাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে রয়ে গেছে। এতেই উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ ছিল।
কিন্তু এসব যেন এখন আর আমাদের বিস্মিত করে না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভয়ংকর আত্মমুগ্ধতা ও অপশাসনের সঙ্গে পৃথিবী এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতাটাই যেন ভোঁতা হয়ে গেছে।
কিন্তু এবার সামনে এসেছে ‘এক্সিকিউশন টিভি’, তথা মৃত্যুদণ্ডের সরাসরি সম্প্রচার। আগামী ৩ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) লাইভস্ট্রিমে চোখ রাখুন। দেখুন, সামরিক ফায়ারিং স্কোয়াড কীভাবে নিদাল হাসানকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
হাসান ছিলেন মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ। ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সেনাঘাঁটিতে তিনি ১৩ জনকে হত্যা করেছিলেন।
কিন্তু এবার বিনোদন হিসেবে রাষ্ট্রের অনুমোদনে মানুষ হত্যা করা হবে!
হ্যাঁ, পৃথিবীর কথিত শ্রেষ্ঠ গণতন্ত্র, অথবা বলা ভালো, একসময়ের শ্রেষ্ঠ গণতন্ত্র নৈতিকতার এক ভয়াবহ নতুন তলানিতে এসে পৌঁছেছে।
দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বব্যবস্থার ওপর যে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলেছে, তারপরও যুক্তরাষ্ট্র অস্ট্রেলিয়া ও পশ্চিমা বিশ্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে রয়ে গেছে। এতেই উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ ছিল।
কিন্তু এখন এমন একটি দেশের ঘনিষ্ঠ মিত্র হয়ে থাকা আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। কারণ, দেশটি একজন মানুষের মৃত্যুদণ্ডকে (কেউ যত গুরুতর অপরাধই করুক না কেন) সরাসরি বিনোদনের অনুষ্ঠানে পরিণত করতে চাচ্ছে। এ ঘটনা যেন নৈতিক অধঃপতনের সংজ্ঞাকেই নতুন করে লিখতে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে এখনো অনেক দণ্ডিত অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাহলে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে সীমা টানবে?
মার্কিন সমাজে হেগসেথের মতো যাঁরা আছেন, এমনকি অন্য দেশেও যাঁরা একই মনোভাব পোষণ করেন, তাঁরা নিশ্চয়ই দলে দলে হাসানের মৃত্যুদণ্ডের সরাসরি সম্প্রচার দেখার দিন গুনছেন।
আর মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের এই পরিকল্পনা আজকের যুক্তরাষ্ট্রে কী ঘটছে, সে সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দেয়। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের নৈতিক শূন্যতা এবং মানবিক শালীনতার গভীর ঘাটতির জানালাটি আরও বড় করে খুলে দিচ্ছে।
এরপর দর্শকেরা কি আরও কিছু দেখতে চাইবেন? যুক্তরাষ্ট্রের মতো ‘স্বাধীনতার দেশে’ কি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রতিটি কক্ষে বসানো হবে সরাসরি সম্প্রচারের ক্যামেরা? মানুষের এমন চাহিদা মেটাতে তখন কী করবে এই জনতুষ্টিবাদী সরকার?
প্রশ্নটিকে যদি অবাস্তব বলে মনে হয়, তাহলে শুধু গত দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ও প্রেসিডেন্টের মূল্যবোধ নৈতিক অন্ধকারে কতটা নিচে নেমেছে, সেটি একবার ভাবুন।
মার্কিন সমাজের সবচেয়ে অন্ধকার প্রবৃত্তিকে উসকে দেওয়ার জন্য এর চেয়ে প্রকাশ্য ও দুঃসাহসী উদ্যোগ কল্পনা করাও কঠিন। কিন্তু আমরা সেখানে পৌঁছে গেছি।
ডন আর পিট, পপকর্নটা এগিয়ে দাও!
আজ যদি বিশ্বের রাজনৈতিক নেতারা হেগসেথ ও ট্রাম্পের এই পরিকল্পিত ‘ঘুল টিভি’ তথা মৃত্যু ও বিভীষিকাকে বিনোদনে পরিণত করার সম্প্রচারের প্রকাশ্যে নিন্দা করতেন, তাহলে কিছুটা আশ্বস্ত হওয়া যেত।
আমি চাই নিন্দার শুরুটা অস্ট্রেলিয়া থেকেই হোক। অস্ট্রেলিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারগুলো দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে আসছে। মৃত্যুদণ্ডকে প্রকাশ্য প্রদর্শনীতে পরিণত করা তো আরও দূরের কথা।
তাহলে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরা কি দাঁড়িয়ে নিঃশর্তভাবে এই ঘৃণ্য পরিকল্পনার নিন্দা করবেন? যুক্তরাষ্ট্র যে একটি মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করতে যাচ্ছে, সেটির বিরুদ্ধে কি তাঁরা স্পষ্ট অবস্থান নেবেন?
অস্ট্রেলিয়ার অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারা কী বলবেন? তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ তো অতীতে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন।
আমরা অপেক্ষায় আছি।
প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্রের আর কতটা নৈতিক অধঃপতন হলে অস্ট্রেলিয়া ওয়াশিংটনের ওপর নিজের নতজানু সামরিক নির্ভরতা নিয়ে নতুন করে ভাববে? বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা অংশীদারত্বের সাবমেরিন চুক্তি অকাসের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া তার কৌশলগত নির্ভরতাকে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেঁধে ফেলেছে, সেটি কি পুনর্বিবেচনার সময় আসেনি? এই চুক্তির ব্যয় ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি ডলার। তবে তা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মানুষ হত্যাকে বিনোদনের একটি রূপে পরিণত করার মার্কিন সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে গিয়ে হেগসেথ বলেছেন, ‘সেনাবাহিনীর পোশাক পরে, বাহিনীর ভেতরেই এটি ছিল একটি উগ্র ইসলামপন্থী হামলা। তাই তাঁকে সেনাদের ফায়ারিং স্কোয়াডের মুখোমুখি হতে হবে। তাঁর ক্ষেত্রে মূলত এটাই হওয়া উচিত। আর মানুষ যেন এটি দেখতে পারে, আমরা তা নিশ্চিত করব। এটি প্রকাশ্য হবে। কারণ, মানুষকে বুঝতে হবে, এ ধরনের কাজের গুরুতর পরিণতি ভোগ করতে হয়।’
পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর নিশ্চিত করেছে, মৃত্যুদণ্ডটি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। সভ্যতা থেকে বর্বরতার দিকে যুক্তরাষ্ট্রের এটি একটি বড় জাম্প।
পরিবার বেছে নেওয়া যায় না। কিন্তু বন্ধু ও মিত্র বেছে নেওয়া যায়। আর তারা যখন নৈতিকতার পথ থেকে ভয়ংকরভাবে ছিটকে যায়, তখন তাদের দৃঢ়ভাবে সে কথাও বলা যায়। তবে কথার চেয়ে কাজের শক্তি বেশি।
আর মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের এই পরিকল্পনা আজকের যুক্তরাষ্ট্রে কী ঘটছে, সে সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দেয়। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের নৈতিক শূন্যতা এবং মানবিক শালীনতার গভীর ঘাটতির জানালাটি আরও বড় করে খুলে দিচ্ছে।
*পল ডেইলি দ্য গার্ডিয়ান অস্ট্রেলিয়ার একজন কলামিস্ট।