মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল
মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল

নিখোঁজ ক্রুকে উদ্ধারে ইরানে কেন নিজেদের দুই উড়োজাহাজ ধ্বংস করল যুক্তরাষ্ট্র, অভিযানে কী ঘটেছিল

ইরানে ভূপাতিত মার্কিন যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ এক ক্রুকে উদ্ধার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল শনিবার রাতে ঝুঁকিপূর্ণ এই উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। এই অভিযানে মার্কিন বাহিনীকে নিজেদের দুটি উড়োজাহাজ ধ্বংস করতে হয়েছে।

অভিযানকালে মার্কিন কমান্ডোরা ‘শত্রুদেশের’ বেশ ভেতরে ঢুকেছিলেন। অভিযানটি চালায় যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্পেশাল অপারেশনস ফোর্সেস’। এই অভিযানের বিষয়ে জানাশোনা আছে—এমন কয়েকজন বর্তমান–সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আহত এই ক্রুকে খুঁজে বের করতে, তাঁর কাছে পৌঁছাতে মার্কিন ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে টানা দুই দিনের প্রতিযোগিতা চলে। শেষ পর্যন্ত কয়েক শ মার্কিন বিশেষ বাহিনীর সদস্যের অংশগ্রহণে বড় পরিসরের এক অভিযানে তাঁকে উদ্ধার করা হয়।

ইরানে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয় গত শুক্রবার। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে।

যুদ্ধবিমানটিতে দুজন ক্রু ছিলেন। একজন পাইলট, অন্যজন অস্ত্রব্যবস্থা–সংক্রান্ত কর্মকর্তা। যুদ্ধবিমানটিতে ইরানি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আঘাত হানলে দুজনই ককপিট থেকে বেরিয়ে (ইজেক্ট) যান।

পাইলটকে দ্রুত উদ্ধার করে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু অস্ত্রব্যবস্থা–সংক্রান্ত কর্মকর্তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তাঁকে খুঁজে পেতে জরুরি ভিত্তিতে অভিযান শুরু করে মার্কিন বাহিনী। অন্যদিকে ইরানও এই মার্কিন ক্রুকে হন্যে হয়ে খুঁজতে নামে।

এই তল্লাশি–উদ্ধার অভিযানের ফলাফল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

নিখোঁজ ক্রুকে খুঁজে বের করা, তাঁকে উদ্ধার করার বিষয়টিতে মার্কিন সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়।

অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর কয়েক শ সদস্য অংশ নেন। এ ছাড়া অভিযানে অংশ নেয় কয়েক ডজন যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার। যুক্তরাষ্ট্রের সাইবার, মহাকাশ ও গোয়েন্দা সক্ষমতা এই অভিযানে ব্যবহার করা হয়।

ক্রু যেখানে লুকিয়ে ছিলেন, সেই এলাকা থেকে ইরানি বাহিনীকে দূরে রাখতে মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে বোমা ও গুলিবর্ষণ করা হয়। অভিযান সম্পর্কে জানেন—এমন দুজন সাবেক মার্কিন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা বলেন, অভিযানকালে নিখোঁজ ক্রুর দিকে মার্কিন বাহিনী এগিয়ে গেলে সেখানে গোলাগুলি শুরু হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

একপর্যায়ে ক্রুকে উদ্ধার করা হয়। তাঁর কাছে আত্মরক্ষার জন্য একটি পিস্তল ছিল। ক্রুসহ কমান্ডোদের নিরাপদে নিয়ে যেতে যে দুটি পরিবহন উড়োজাহাজ পাঠানো হয়েছিল, সেগুলো ইরানের এক প্রত্যন্ত ঘাঁটিতে আটকে পড়ে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত আরও তিনটি উড়োজাহাজ পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে আটকে পড়া উড়োজাহাজ দুটি যাতে ইরানের হাতে না পড়ে, সে জন্য বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সেগুলো ধ্বংস করা হয় বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবার মার্কিন যুদ্ধবিমানটি যে এলাকায় ভূপাতিত করা হয়, সেই এলাকায় সরকারবিরোধীদের অবস্থান বেশ জোরালো। তাই নিখোঁজ থাকা ক্রু চাইলে আশ্রয় ও সহায়তার জন্য স্থানীয় লোকজনের ওপর নির্ভর করতে পারতেন।

বিষয়টি ইরানের সামরিক বাহিনীর নজরে আসে। তারাও নিখোঁজ ক্রুকে ধরতে জোর তল্লাশি শুরু করে। সেই সঙ্গে তাঁকে খুঁজে পেতে ইরান সরকার স্থানীয় মানুষের সহায়তা চায়। পুরস্কার ঘোষণা করে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যালে এই অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইতিহাসের অন্যতম জটিল ও দুঃসাহসিক উদ্ধার অভিযান হিসেবে উল্লেখ করেন।