
আবদুল্লাহ আল-ফয়সাল, বয়স ৫৯ বছর। ধর্মীয় বিষয়ে উগ্র বক্তব্য দেওয়ার জন্য পরিচিত তিনি। নিজের ওয়েবসাইটে তাঁর সেসব বক্তব্য প্রচার-প্রকাশ করা হয়। অংশ নেন দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে গ্রেপ্তার হয়ে ৯ বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল ফয়সালের। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ঘৃণা ছড়িয়েছেন, হত্যার আহ্বান জানিয়েছেন। পরে সাজাভোগ স্থগিত রেখে তাঁকে নিজ দেশ জ্যামাইকায় ফেরত পাঠায় যুক্তরাজ্য সরকার।
তবে অবাক করা বিষয় হলো, মার্কিন গোয়েন্দাদের নজরে পড়েছেন ফয়সাল। জিহাদ উসকে দেওয়া এবং ইহুদি, হিন্দু ও মার্কিনদের হত্যা করতে আহ্বান জানানোর ‘অপরাধে’ ফাঁদ পেতে তাঁর বিরুদ্ধে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। এর ভিত্তিতে জ্যামাইকায় আবারও গ্রেপ্তার হন তিনি। পরবর্তী সময় তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয় দেশটির সরকার।
এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের আদালতে বিচার চলছে ফয়সালের। তাঁর বিরুদ্ধে ইসলামিক স্টেটের মতবাদ ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রাখা ও আইএসে অংশ নিতে চাওয়া একজন নারীকে (আদতে ওই নারী ছিলেন একজন গোয়েন্দা) সহায়তার করার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়েছে। গত নভেম্বরে স্টেট সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার বিচার শুরু হয়েছে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর দেশটিতে পাস হওয়া প্যাট্রিয়ট আইনের আওতায় ফয়সালের বিচার চলছে। এই আইনের আওতায় বিচার শুরু হওয়া প্রথম অভিযুক্ত ব্যক্তি তিনি। এই আইনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন ও সহায়তা দেওয়াকে অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে। এ ছাড়া সম্ভাব্য অপরাধীদের ধরতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ফোনে আড়িপাতা ও গোয়েন্দা নজরদারিকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে।
ফয়সালের ক্ষেত্রে নিউইয়র্কের তদন্তকারীরা হোয়াটসঅ্যাপ ও স্কাইপিতে ভুয়া আইডি খুলে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, চ্যাট করেছিলেন। এমনকি মধ্যপ্রাচ্যে সফর করেছিলেন। ফয়সালকে অভিযুক্ত করার সময় ম্যানহাটনের ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি ছিলেন সাইরাস আর ভ্যান্সি জুনিয়র। তিনি বলেন, সুদূরপ্রসারী এই তদন্ত তাঁদের শহরকে নিরাপদ রেখেছে। তিনি (ফয়সাল) এমন একটি জিহাদ উসকে দিচ্ছিলেন, যার প্রভাব ম্যানহাটনের সড়কে পড়ার আশঙ্কা ছিল।
তবে ফয়সালের আইনজীবী তাঁকে একজন ‘বড় বক্তা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের মতে, সহিংসতা উসকে দেওয়া মতো কাজ ফয়সাল করেন না। তাঁকে এখন জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এমনকি এটা করতে গিয়ে পরিচয় গোপন করে যোগাযোগ করেছেন গোয়েন্দারা। এটা করতে গিয়ে তাঁরা ফয়সালকে ‘ভীষণ স্মার্ট’ বলে উল্লেখ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রকে ‘যুদ্ধের ভূমি’ বলেছেন তাঁরা। এভাবে তাঁরা ফয়সালের বিশ্বাস অর্জন করার চেষ্টা করেছেন।
ফয়সালের আইনজীবী অ্যালেক্স গ্রোসটার্ন আদালতকে বলেন, আদালতে যেসব তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে ফয়সালের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ নেই।
এদিকে এই মামলার বিষয়ে কথা বলতে নিউইয়র্ক পুলিশের সঙ্গে যোগাযাগ করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
পরিচয় গোপন করে, ফাঁদ পেতে অপরাধীদের ধরার জন্য মার্কিন গোয়েন্দাদের সমালোচনা করেন অনেকেই। এমন কর্মকাণ্ড মাত্রা ছাড়িয়েছে, এই অভিযোগ অনেকের। ২০০৩ সালে সাংবিধান বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের যুদ্ধবিরোধী ব্যক্তিরা যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভে আটক হওয়া ব্যক্তিদের রাজনীতি ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন।
ওই সময় মার্কিন গোয়েন্দারা যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের কিছু ব্যক্তির ওপর গোপনে নজরদারি করেছিলেন। এসব ব্যক্তিরা ২০০৪ সালে ম্যানহাটনে রিপাবলিকান জাতীয় কনভেনশন ঘিরে ব্যাপক বিক্ষোভের পরিকল্পনা করেছিলেন। পরবর্তী সময় ২০১১ সালে নিউইয়র্ক পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির মুসলিমদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তির জন্য ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে, যা একজন ফেডারেল বিচারককে গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনার নিয়ম কঠোর করার জন্য প্ররোচিত করে।
এ বিষয়ে ব্রুকলিন কলেজের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যালেক্স এস ভিতালি বলেন, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর আদলে স্থানীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষত, যখন তারা নিজেদের শহরকে রক্ষা করার নামে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে অপরাধীদের নিয়ে কাজ করে।
মার্কিন ফেডারেল গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের সাবেক এজেন্ট আলী সৌফানের আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি বলেন, ফেডারেল প্রসিকিউটররা ফেডারেল এজেন্সি কিংবা সন্ত্রাসবাদবিরোধী যৌথ টাস্কফোর্সের সম্পৃক্ততা ছাড়া স্থানীয় পুলিশের সংগ্রহ করা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সন্ত্রাসবাদের মামলা নিতে আগ্রহী থাকে না।
আলী সৌফানের মতে, ফেডারেল প্রসিকিউটররা হয়তো বিশ্বাস করেননি যে ফয়সালের ঘটনায় তদন্তের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম মানা সম্ভব হবে। কেননা, ফয়সালের সঙ্গে একটি বিদেশি সরকারের সহায়তামূলক সম্পর্ক ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করার সময় সাবেক ও বর্তমান আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তারা মনে করেছিলেন, ফয়সালের এমন সম্পর্কের জেরে ফেডারেল প্রসিকিউটররা তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করতে দ্বিধায় ছিলেন।
এ বিষয়ে ম্যানহাটনের বর্তমান ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি আলভিন এল ব্রাগ এক বিবৃতিতে বলেন, সন্ত্রাসবাদবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য তাঁর দপ্তর যথেষ্ট প্রস্তুত রয়েছে। তিনি আরও বলেন, অসাধারণ মেধাবী আইনজীবী ও বিশ্লেষক রয়েছে তাঁদের। এসব ব্যক্তিরা সীমান্তের বাইরেও জটিল সব মামলা নিয়ে কাজ করতে দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারেন। আলভিন সতর্ক করে বলেন, নিউইয়র্কবাসী সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহতা ভালো করেই জানে। আর বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ—দুই ধরনের সন্ত্রাসীদের কাছে ম্যানহাটন সম্ভাব্য হামলার উপযুক্ত জায়গা বিবেচিত হয়ে আসছে।
২০১৬ সালের শুরুর দিকে মার্কিন গোয়েন্দা ইল্টার আয়কাক একটি ই-মেইল পাঠান ফয়সালকে। তিনি নিজেকে ২৪ বছর বয়সী আমেরিকার-তুর্কি তরুণী রোজিন আহমেদ নামে পরিচয় দেন। গত মাসে নিউইয়র্ক পুলিশের সাবেক এই সদস্য বলেন, ‘আমি তাঁর (ফয়সাল) কাছে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার জন্য সহায়তা ও পরামর্শ চাই। আমাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বার্তা আদান–প্রদান হয়েছে।’
পুলিশের ওই কর্মকর্তা বলেন, ফয়সাল আমাকে তাঁর স্ত্রীর আগের পক্ষের ছেলেকে বিয়ে করার পরামর্শ দেন। হানিবাল কোকায়ি নামের ওই ব্যক্তি ওয়াশিংটনে বসবাস করেন। তিনি আইএসে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। এ বিষয়ে ফয়সালের স্ত্রী এনজিংঘা কোয়াকি বলেন, এমন আলাপ-আলোচনা করার জন্য প্রতিদিনই কেউ না কেউ আটক হচ্ছেন।