নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ

ট্রাম্পকে রুখে দিয়েছে তরুণদের ভোট

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস বলে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল আসন হারায়। কিন্তু এবার ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের জয় অর্ধশতকের মধ্যে যেকোনো দলের জন্য সবচেয়ে বড় বিজয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাশে ‘ভেটো’ লেখা টুপি। মধ্যবর্তী নির্বাচনে হারলে ‘মনে হয় আমি মিস্টার ভেটো হয়ে যাব’ বলেছিলেন তিনি। হোয়াইট হাউস, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
ছবি: এএফপি

জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আর পুরোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি বিরক্তি—যুক্তরাষ্ট্রের তরুণেরা এসব ক্ষোভের প্রকাশ ঘটালেন ব্যালট বাক্সে। গত মঙ্গলবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি তরুণদের সমর্থন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির ভরাডুবিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫ আসনের মধ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টি ২৫৩ আসনে জয়ী হয়েছে। রিপাবলিকান পার্টি পেয়েছে ১৬০ আসন। ৩২ আসনের ফল ঘোষণা বাকি। আর ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ সিনেটে এখন ৫৪টি আসন ডেমোক্র্যাটদের, রিপাবলিকানদের আসন ৪৪টি। সিনেটের দুটি আসনে ফল ঘোষণা বাকি। এবার সিনেটে ভোট হয়েছে ৩৫ আসনে।

নিউইয়র্ক টাইমস–এর প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় এবারের প্রতিনিধি পরিষদ নির্বাচনে ১৮-২৯ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে দুই দলের ভোটের ব্যবধান প্রায় ৪০ শতাংশ পয়েন্ট, যা ডেমোক্র্যাটদের দিকে গেছে। তরুণ পুরুষদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন ৩৯ শতাংশ পয়েন্ট, নারীদের ক্ষেত্রে ২৭ শতাংশ পয়েন্ট। সাক্ষাৎকারে তরুণেরা বলেছেন, বাড়িভাড়া ও স্বাস্থ্যসেবার খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা; চাকরি করে নিজের বাড়ি ও সংসার গড়ার ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। এর সঙ্গে ইরান যুদ্ধ ও ইসরায়েলনীতি নিয়ে অসন্তোষ তাঁদের সমর্থন পরিবর্তনে প্রভাব ফেলেছে।

পরিবর্তনের আশায় ভোট

তরুণদের ভোটের এই পালাবদল শহর ছাড়িয়ে গ্রাম ও শহরতলিতেও ছড়িয়েছে। নিউইয়র্ক টাইমস–এর ৫ নভেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ট্রাম্পের জেতা ২৩৪টি কংগ্রেশনাল ডিস্ট্রিক্টের মধ্যে ৫২টিতে এবার ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হয়েছেন। দলটি ২০০৮ সালের পর প্রতিনিধি পরিষদে নিজেদের সবচেয়ে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে।

জেমস ট্যালারিকোকে সঙ্গে পেলে হয়তো আমরা সমাজকে পিছিয়ে নেওয়ার বদলে সামনে এগিয়ে নিতে পারব।
ট্রিস্টান ওয়ামস্লি, টেক্সাসের তরুণ ভোটার

তবে তরুণদের অনেকে স্পষ্ট করেছেন, ডেমোক্র্যাটদের প্রতি তাঁদের সমর্থন নিঃশর্ত নয়। তাঁরা দলকে নয়, পরিবর্তনের আশাকে ভোট দিয়েছেন; বিজয়ীরা প্রতিশ্রুতি রাখছেন কি না, সেটিও তাঁরা দেখবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস বলে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল আসন হারায়। কিন্তু এবার ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ডেমোক্র্যাটদের জয় অর্ধশতকের মধ্যে যেকোনো দলের জন্য সবচেয়ে বড় বিজয়।

প্রার্থীর মধ্যে নিজের মিল খুঁজেছেন তরুণেরা

টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে সিনেট নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮ থেকে ৪৪ বছর বয়সী পুরুষদের ভোটের প্রবণতা ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস ট্যালারিকোর পক্ষে গেছে প্রায় ৫০ শতাংশ পয়েন্ট। এই অঙ্গরাজ্যের রিচমন্ডের ভোটার ট্রিস্টান ওয়ামস্লি (৩৫) বলেন, ‘তিনি (জেমস) আমার বয়সী। তাঁর কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছে, আমি নিজেই তাঁর সঙ্গে কথা বলতে পারতাম। তিনি আমার মতোই একজন সাধারণ মানুষ।’ ট্রিস্টান জীবনে এবারই প্রথম অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের সব পদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন।

তরুণদের অনেকে স্পষ্ট করেছেন, ডেমোক্র্যাটদের প্রতি তাঁদের সমর্থন নিঃশর্ত নয়। তাঁরা দলকে নয়, পরিবর্তনের আশাকে ভোট দিয়েছেন; বিজয়ীরা প্রতিশ্রুতি রাখছেন কি না, সেটিও তাঁরা দেখবেন।

বছরের পর বছর টেক্সাস শাসন করেছেন রিপাবলিকানরা। তাতে ট্রিস্টানের জীবনে কোনো বাস্তব পরিবর্তন আসেনি। তাঁর ভাষায়, ‘জেমসকে সঙ্গে পেলে হয়তো আমরা সমাজকে পিছিয়ে নেওয়ার বদলে সামনে এগিয়ে নিতে পারব।’

ট্রিস্টানের মতো তরুণেরা যে প্রার্থীর মধ্যে নিজেদের মিল খুঁজে পেয়েছেন, তাঁদের ভোট দিয়েছেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির এমন প্রার্থী ছিলেন মিশিগানের নবনির্বাচিত সিনেটর আবদুল আল-সাইদ, আইওয়ার নবনির্বাচিত গভর্নর রব স্যান্ড, জর্জিয়ার সিনেটর জন অসফ, লস অ্যাঞ্জেলেসের নবনির্বাচিত মেয়র নিত্যা রমন এবং মন্টানা থেকে নবনির্বাচিত প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য স্যাম ফরস্ট্যাগ। আর ১৯ বছর বয়সী ড্যানিয়েল ড্যারিস-ও’কনর ম্যাসাচুসেটসের প্রতিনিধি পরিষদে আট মেয়াদ ধরে দায়িত্বে থাকা এক রিপাবলিকানকে হারিয়েছেন।

নির্বাচনে জয়ের পর স্ত্রীর সঙ্গে মিশিগানের নবনির্বাচিত সিনেটর আবদুল আল–সাইদ। ৪ নভেম্বর ২০২৬, মিশিগান

এভাবে সেকেলে রাজনীতিকদের ভোটাররা বিদায় করেছেন। তাঁরা ফিরিয়ে দিয়েছেন রিক জ্যাকসন ও কেন প্যাক্সটনের মতো ধনী মধ্যবয়সী রিপাবলিকানদেরও। জ্যাকসন জর্জিয়ার গভর্নর পদে প্রার্থী ছিলেন। টেক্সাসে প্যাক্সটন হেরেছেন জেমস ট্যালারিকোর কাছে।

বিজয়ী ডেমোক্র্যাটরা যেন তরুণ ভোটারদের ভাষাতেই কথা বলছেন। তবে ৪৫ বছরের কম বয়সী অনেক ভোটার, বিশেষ করে মিলেনিয়াল প্রজন্মের (জন্ম: ১৯৮১-১৯৯৬) কম বয়সীরা আর জেন–জির (জন্ম: ১৯৯৭-২০১২) সদস্যরা দ্রুতই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তাঁদের মতাদর্শ বদলায়নি। তাঁরা আপাতত ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন জানিয়ে দিয়েছেন, যাতে জীবনযাত্রার ব্যয়, ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এবং ইরানের যুদ্ধের মতো বিষয়ে বাস্তব পরিবর্তনের শুরু হয়।

টেক্সাসে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে ডেমোক্র্যাটদের সব প্রার্থীকে ভোট দেওয়াটা ট্রিস্টান ওয়ামস্লির কাছে নতুন অভিজ্ঞতা হলেও নিজের সিদ্ধান্তে খুশি তিনি। তবে এটাও বলেছেন, তাঁর ভোট ছিল প্রার্থীদের জন্য। দলের জন্য তিনি ভোট দেননি। তাঁরা কথা রাখছেন কি না, সেদিকেও তিনি কড়া নজর রাখবেন। ট্রিস্টান বলেন, ‘এখন যা চলছে, তা থেকে আমি সত্যিই বেরিয়ে আসতে চাই। কারণ, এখনকার ব্যবস্থায় কাজ হচ্ছে না।’

অসন্তোষ বিশ্বজুড়ে

নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, এই অসন্তোষ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ ও ভারত থেকে সার্বিয়া ও ফ্রান্স পর্যন্ত নানা দেশে তা তরুণদের আন্দোলনের জন্ম দিচ্ছে। সরকারি সম্পদ গেছে বেবি বুম প্রজন্মের (জন্ম: ১৯৪৬-১৯৬৫) অবসরপ্রাপ্তদের বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ভর্তুকিযুক্ত অবসরসুবিধা দিতে। এদিকে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়েছে, স্বাস্থ্যবিমার খরচ আকাশছোঁয়া হয়েছে। বয়স্ক প্রজন্ম জায়গা ছাড়তে না চাওয়ায় চাকরির নিরাপত্তাও কমেছে। আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ভোট দেওয়ার বয়সে পা রাখা তরুণদের মনে গভীর আশঙ্কা তৈরি করেছে।

তবে তরুণ ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল অর্থনীতি। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তাঁদের মনে এমন ধারণা তৈরি করেছে যে নিজের বাড়ি হবে, পরিবার হবে—পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে এভাবে জীবন শুরু করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। নর্থ ক্যারোলাইনার র‍্যালিতে ২৩ বছর বয়সী চেজ সার্ডেসন ইলেকট্রিশিয়ানের শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করেন। তিনি রক্ষণশীল পরিবারে বড় হয়েছেন। তবে একটি গাড়ির বিক্রয়কেন্দ্রে কাজ করার সময় উদারপন্থী রাজনীতির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। সেখানে তিনি জানতে পারেন, তাঁর এক হিস্পানিক অভিবাসী সহকর্মী পরিবার চালাতে তিনটি চাকরি করেন।

নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি

এখন সার্ডেসন ও তাঁর বান্ধবী মাসে ১ হাজার ৮০০ ডলার বাসা ভাড়া দেন। মা-বাবার স্বাস্থ্যবিমার আওতা থেকে বেরিয়ে গেলে কত খরচ হবে, তা হিসাব করে দেখে মন দমে গিয়েছিল বলে জানালেন সার্ডেসন। তিনি বলেন, ‘বেবি বুম প্রজন্ম আর জেন এক্সের প্রজন্মের (জন্ম: ১৯৬৫-১৯৮০) বয়স্কদের দিকে তাকালে দেখি, তাঁরা এমন এক আমেরিকার সুফল পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, যে আমেরিকা ছিল সমৃদ্ধ, ছিল বিশ্বের শীর্ষে। নিজের দিকে তাকালে দেখি, আমি যেন তারই ছায়া।’

সিনেট নির্বাচনে তিনি বেবি বুম প্রজন্মেরই একজনকে ভোট দিয়েছেন। তিনি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রয় কুপার। তবে সার্ডেসনের পছন্দ ছিল এমন একজন প্রার্থী, যিনি নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির মতো অর্থনীতি নিয়ে আরও জোরালো কথা বলবেন। তিনি বলেন, ‘মামদানি আর মিশিগানের সিনেটর আল-সাইদ আমার মতো মানুষদের কথা ভাবেন, আমাদের কথা শোনেন বলে মনে হয়। এমনকি টেক্সাসের জেমস ট্যালারিকোকেও আমার তা-ই মনে হয়।’

টেক্সাসের নবনির্বাচিত সিনেটর ডেমোক্রেটিক পার্টির জেমস ট্যালারিকো

জেমস ট্যালারিকো, আল-সাইদের মতো প্রার্থীতে মুগ্ধ

নিউ হ্যাম্পশায়ারের পোর্টসমাউথে একটি কফির দোকানের সহকারী ব্যবস্থাপক ২৪ বছর বয়সী ইজি ইমস। তিনি ধর্মপরায়ণ ও রক্ষণশীল পরিবারে বড় হয়েছেন। হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি এসব প্রভাব থেকে সরে এসেছেন। উদারপন্থী রাজনীতি এখন তাঁর পরিচয়ের অংশ। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর তিনি ‘মানসিকভাবে একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন’। মঙ্গলবার তিনি সব পদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন। তিনি চান, বিজয়ীরা ‘ছোট ছোট বিষয়ে আরও মনোযোগ দিন’। তাঁর মতে, নিউইয়র্কের মেয়র ‘মামদানি এ কাজটা ভালো করেন’।

টেক্সাসে রিপাবলিকানপন্থী পরিবারে বড় হয়েও এবার ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন ২৬ বছর বয়সী ওবেদ আলভিদ্রেজ। জেমস ট্যালারিকো, আল-সাইদের মতো ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা তাঁকে মুগ্ধ করছে। আলভিদ্রেজ বলেন, এবার তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছেন সেই ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা, যাঁরা ধরে নেননি যে তাঁর ভোট এমনিতেই পাবেন। তিনি বলেন, ‘জেমস ট্যালারিকো আর আল-সাইদ স্পষ্ট করে বলেছেন, তাঁরা পদে যাচ্ছেন নিজেদের দলের প্রতিনিধিত্ব করতে নয়। তাঁরা যাচ্ছেন তাঁদের অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দাদের জন্য। এ কারণেই কোনো কোনো রিপাবলিকান আর নির্দলীয় ভোটারদের সমর্থন পেতে তাঁদের অনেক সুবিধা হয়েছে।’ আলভিদ্রেজ পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরিও করছেন। তিনি বলেন, ‘মানুষ আসলে ক্লান্ত।...আমাদের যা করার ছিল, আমরা করেছি।’