যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হামলা চালিয়ে ইরানে সভ্যতা ধ্বংসের যে হুমকি দিয়েছেন, সেটা কার্যকর করলে তিনি যুদ্ধাপরাধ করবেন বলে শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে। জাতিসংঘের পাশাপাশি এ বিষয়ে আইনবিশেষজ্ঞরাও সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় বেপরোয়া হামলা চালানো হলে সেটা জেনেভা কনভেনশনের লঙ্ঘন হবে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট ও সিএনএন গতকাল মঙ্গলবার এ বিষয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এক সম্পাদকীয়তে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে স্বনামধন্য ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান। প্রতিটি লেখাতেই ট্রাম্পের সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
বেঁধে দেওয়া সময় মঙ্গলবার রাত আটটার (ওয়াশিংটনের সময়) মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে না দিলে সেখানে ‘পুরো সভ্যতা’ ধ্বংস করা হবে বলে হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। এ ধরনের হামলা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে, সে বিষয়ে সাংবাদিকেরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সোমবার ট্রাম্প বলেন, তিনি সেসব নিয়ে ‘চিন্তিত’ নন। তাঁর এমন বেপরোয়া হুমকির প্রতিবাদ জানিয়েছেন মার্কিন রাজনীতিকেরা। তাঁকে ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’ বলেছেন কয়েকজন ডেমোক্র্যাট। সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের নেতা চাক শুমার তাঁকে ‘গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তি’ বলেছেন। ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরাতে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির আইনপ্রণেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাট নেতারা। রিপাবলিকান পার্টির নেতারাও ট্রাম্পের এই হুমকির সমালোচনা করেছেন। ট্রাম্পের মিত্র হিসেবে পরিচিত সিনেটর রন জনসন গতকাল বলেছেন, ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলা তিনি সমর্থন করেন না। এটা অনেক বড় ভুল হবে।
ট্রাম্পের হুমকির সমালোচনা করে দ্য গার্ডিয়ান গতকাল এক সম্পাদকীয়তে লিখেছে, জেনেভা কনভেনশনের প্রথম অতিরিক্ত প্রটোকলের ৫২ নম্বর অনুচ্ছেদে বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ প্রটোকলের ভিত্তিতেই ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার জন্য দায়ী রুশ সামরিক কর্মকর্তা ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। ইউক্রেনের শহর ও জনপদে আতঙ্ক ছড়াতে এবং মনোবল ভেঙে দিতে যে ধরনের হামলা ও একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, তা যুদ্ধাপরাধের শামিল। একইভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে এ সপ্তাহে বোমা মেরে ‘প্রস্তর যুগে’ পাঠিয়ে দেওয়ার যে হুমকি দিয়েছেন, তা যদি কার্যকর করেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ঠিক একই আইন প্রযোজ্য হবে।
বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসামরিক অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলার এমন লাগামহীন হুমকি আইনবিশেষজ্ঞ ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের শঙ্কিত করে তুলেছে। ২০০৪-০৫ সালে ইরাকে মার্কিন সেনাবাহিনীর যুদ্ধবিষয়ক শীর্ষ আইনবিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জিওফ্রে কর্ন। তিনি ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ‘আমি উদ্বিগ্ন যে প্রেসিডেন্টের এই আস্ফালন অপারেশনাল কমান্ডারদের খুব কঠিন পরিস্থিতির মুখে ফেলছে। তাঁরা জানেন যে আপনি চাইলেই একটি দেশের ওপর একটি বৃত্ত এঁকে বলতে পারেন না যে বিদ্যুৎ গ্রিডের প্রতিটি অংশ এখন বৈধ লক্ষ্যবস্তু।’
আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে বেসামরিক নাগরিকদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য বস্তুগুলোকে হামলা থেকে সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। সে কারণে ট্রাম্প যে ধরনের হামলার হুমকি দিচ্ছেন, তা বাস্তবায়িত হলে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে বলে মত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসনের আইন উপদেষ্টা হ্যারল্ড হংজু কোহ।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানো যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, বিশুদ্ধ পানি শোধনাগারসহ জনগণের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য বস্তুগুলোকে সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহার করা নিষিদ্ধ।
মার্কিন সেনাবাহিনীর আইন শাখার সাবেক আইনজীবী মার্গারিট ডোনোভান বলেন, ‘আমরা এমন একটি সরাসরি হুমকি দেখছি, যা বেসামরিক নাগরিকদের জন্য বিপর্যয়কর হতে যাচ্ছে।’
ইরানের বেসামরিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার মধ্যে গত বৃহস্পতিবার এক খোলাচিঠিতে শতাধিক মার্কিন বিশেষজ্ঞ বলেন, এমন হামলা যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারে। ওই বিশেষজ্ঞদের মধ্যে হার্ভার্ড, ইয়েল, স্টানফোর্ড ও ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাও রয়েছেন। ইরানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলার ঘটনা উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীগুলো যেটা করছে এবং দেশটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন, সেগুলো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধে ‘উসকানিমূলক বাগাড়ম্বরের’ নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ফলকার টুর্ক। গতকাল এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা ইরান—কারও নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হামলা যুদ্ধাপরাধ। আন্তর্জাতিক অপরাধের জন্য দায়ী যে কাউকেই উপযুক্ত আদালতে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’