পানামায় মার্কিন আগ্রাসন ‘অপারেশন জাস্ট কজ’-এর দ্বিতীয় দিনে একটি লন্ড্রির বাইরে পাহারায় একটি মার্কিন এম–১১৩ সাঁজোয়া যান। ডিসেম্বর, ১৯৮৯
পানামায় মার্কিন আগ্রাসন ‘অপারেশন জাস্ট কজ’-এর দ্বিতীয় দিনে একটি লন্ড্রির বাইরে পাহারায় একটি মার্কিন এম–১১৩ সাঁজোয়া যান। ডিসেম্বর, ১৯৮৯

‘নগ্ন সাম্রাজ্যবাদ’: ভেনেজুয়েলায় আগ্রাসন চালিয়ে যেভাবে পুরোনো রূপে ফিরছে যুক্তরাষ্ট্র

দুই শতক ধরে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের দীর্ঘ ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতা ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বোমাবর্ষণ এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে তুলে নেওয়া। কিন্তু সর্বশেষ ঘটনা একটি নজিরও গড়েছে। কারণ, দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দেশে এটিই প্রথম সরাসরি মার্কিন সামরিক হামলা।

মাদুরোকে তুলে নেওয়ার পর এক সংবাদ সম্মেলনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন আধিপত্য আর কখনো প্রশ্নের মুখে পড়বে না।’

কিন্তু উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র তার মহাদেশীয় প্রতিবেশীদের ওপর কেবল অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যমেই নয়, সামরিকভাবেও হস্তক্ষেপ করে আসছে। এ দীর্ঘ তালিকায় আগ্রাসন, দখলদারত্ব এবং বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সবচেয়ে সাদৃশ্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে ১৯৮৯ সালে পানামার স্বৈরশাসক ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে আটকের বিষয়টিও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের গোপন তৎপরতা ব্রাজিল, চিলি ও আর্জেন্টিনার মতো দেশগুলোতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার উৎখাতে এবং সামরিক স্বৈরশাসনের পথ প্রশস্ত করতে সহায়তা করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য সামরিক অভিযানগুলো ঐতিহাসিকভাবে মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের তুলনামূলক নিকটবর্তী প্রতিবেশীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর স্টেট ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মাউরিসিও সান্তোরো বলেন, ‘দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দেশের ওপর প্রথম সরাসরি মার্কিন সামরিক হামলা পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতিতে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কয়েক সপ্তাহ আগে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রকাশিত নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে এ অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছিল।’

ওই কৌশলপত্রে এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ‘সম্প্রসারণের’ আহ্বান জানানো হয়েছে এবং একে মনরো ডকট্রিনে ‘ট্রাম্প করোলেরি’ বা সংযোজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই মনরো ডকট্রিন হলো ১৮২৩ সালে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরোর ঘোষিত ‘আমেরিকানদের জন্য আমেরিকা’ নীতি, যা পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকায় মার্কিন-সমর্থিত সামরিক অভ্যুত্থানের বৈধতা দিতে ব্যবহৃত হয়।

একটি সি-১৩০ পরিবহন বিমানের ভেতর মার্কিন এজেন্টদের হাতে আটক পানামার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল নরিয়েগা। ৪ জানুয়ারি, ১৯৯০

টেম্পল ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক এবং ‘আ শর্ট হিস্ট্রি অব ইউএস ইন্টারভেনশনস ইন লাতিন আমেরিকা অ্যান্ড দ্য ক্যারিবিয়ান’ গ্রন্থের লেখক অ্যালান ম্যাকফারসন বলেন, শনিবারের এই পদক্ষেপ অতীতের অনেক অভিযানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হলেও তা অবাক করার মতো। কারণ, ১৯৮৯ সালের পর এ ধরনের কিছু আর ঘটেনি।

এই ইতিহাসবিদ আরও বলেন, ‘কেউ কেউ হয়তো ভেবেছিলেন, শুধু সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে লাতিন আমেরিকায় নিজেদের পছন্দমতো রাজনৈতিক ফলাফল আদায়ের এই নগ্ন সাম্রাজ্যবাদী যুগের অবসান একুশ শতকে ঘটবে, কিন্তু স্পষ্টতই তা ঘটেনি।’

গত দশকগুলোতে এই অঞ্চলের প্রায় প্রতিটি দেশই প্রকাশ্যে বা গোপনে কোনো না কোনোভাবে মার্কিন হস্তক্ষেপের শিকার হয়েছে। নিচে এর কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো:

মেক্সিকো

মেক্সিকোর ভূখণ্ড টেক্সাসকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করাকে কেন্দ্র করে সীমান্ত বিরোধ দেখা দেয়। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোতে আগ্রাসন চালায়। ১৮৪৭ সালে মার্কিন সেনারা রাজধানী মেক্সিকো সিটি দখল করে নেয়।

১৮৪৮ সালে একটি চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের অবসান ঘটে। তবে ওই চুক্তির ফলে মেক্সিকো তাদের মোট ভূখণ্ডের ৫৫ শতাংশ ছাড়তে বাধ্য হয়। এই বিশাল এলাকার মধ্যেই বর্তমান ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাদা ও ইউটা অঙ্গরাজ্যসহ অ্যারিজোনা, নিউ মেক্সিকো, কলোরাডো এবং ওয়াইমিংয়ের কিছু অংশ রয়েছে।

১৮৪৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বুয়েনা ভিস্তার যুদ্ধে কেন্টাকিয়ানদের আক্রমণ এবং মেক্সিকানদের চূড়ান্ত পরাজয়

কিউবা

১৮৯৮ সালে স্পেনের বিরুদ্ধে কিউবার স্বাধীনতাযুদ্ধে সহায়তা করে যুক্তরাষ্ট্র। এই বিজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র পুয়ের্তো রিকোর নিয়ন্ত্রণ লাভ করে এবং ১৯০২ সাল পর্যন্ত কিউবা দখল করে রাখে। সে বছর একটি চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন নৌবাহিনীকে গুয়ানতানামো বের ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে মার্কিন সেনারা ১৯০৬ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত এবং আবার ১৯১৭ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত দ্বীপটি দখলে রাখে। ফিদেল কাস্ত্রোর ১৯৫৯ সালের বিপ্লবের পর একটি অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) ১৯৬১ সালে ব্যর্থ ‘বে অব পিগস’ আগ্রাসনে সমর্থন দেয়।

১৮৯৮ সালে কিউবার সান্তিয়াগোর সান হুয়ান হিলে থিওডোর রুজভেল্টসহ (মাঝে) ‘রাফ রাইডার্স’ দলের সদস্যরা

হাইতি

অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার জেরে হাইতির নেতারা বারবার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় দেশটিকে ‘স্থিতিশীল’ করা এবং মার্কিন ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র ১৯১৫ সালে হাইতিতে আগ্রাসন চালায়। ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত তারা দেশটির শুল্ক ও অর্থ দপ্তর এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখে।

১৯৫৯ সালে একটি অভ্যুত্থানের চেষ্টা স্বৈরশাসক ফ্রাঁসোয়া ‘পাপা ডক’ দুভালিয়েরকে হুমকির মুখে ফেলে। তখন সিআইএ তাঁকে ফিদেল কাস্ত্রোর কিউবা বিপ্লবের প্রভাব মোকাবিলার ক্ষেত্রে একজন মিত্র হিসেবে বিবেচনা করে এবং তাঁর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে পর্দার আড়ালে কাজ করে।

ব্রাজিল

১৯৬৪ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বামপন্থী প্রেসিডেন্ট জোয়াও গোলার্টকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এ অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধ দেখা দিলে হস্তক্ষেপের জন্য ব্রাজিলের উপকূলে একটি মার্কিন নৌ টাস্কফোর্স অবস্থান নিয়েছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করা হয়নি।

সত্তরের দশকে ‘অপারেশন কন্ডর’ নামে পরিচিতি পাওয়া এক কর্মসূচির অধীন সিআইএ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (এফবিআই) ব্রাজিল, চিলি ও আর্জেন্টিনার মতো দেশের স্বৈরশাসনের নিপীড়ক সংস্থাগুলোকে ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্যাতন ও গুপ্তহত্যায় সরাসরি পরামর্শ দিত।

পানামা

যুক্তরাষ্ট্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে সামরিকভাবে সমর্থন দিলে ১৯০৩ সালে কলাম্বিয়া থেকে আলাদা হয়ে যায় পানামা। স্বাধীনতার পর ওয়াশিংটন মধ্য আমেরিকার এ দেশটির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব বজায় রাখে।

১৯৮৯ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ প্রায় ২৭ হাজার সেনা নিয়ে পানামায় আগ্রাসন চালানোর নির্দেশ দেন। এর লক্ষ্য ছিল স্বৈরশাসক নরিয়েগাকে আটক করা। সিআইএর এই সাবেক মিত্রের বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে মাদক পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছিল।

এই আগ্রাসনে পানামার প্রায় ৩০০ সেনার পাশাপাশি আনুমানিক ২০০ থেকে ৫০০ বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এই হামলার কয়েক ঘণ্টা পর নির্বাচনে বিজয়ী ঘোষিত গিয়েরমো এন্দারাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় বসায় যুক্তরাষ্ট্র।

তবে ভেনেজুয়েলায়ও একই পরিণতি ঘটবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ট্রাম্প বলেছেন, ‘যথাযথ ক্ষমতা হস্তান্তর’ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ‘পরিচালনা’ করবে।

ইতিহাসবিদ ম্যাকফারসন বলেন, এই অঞ্চলে মার্কিন হস্তক্ষেপের পর ‘শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন ঘটনা ‘খুবই বিরল’। তিনি আরও বলেন, ‘মার্কিন হস্তক্ষেপগুলো প্রায় সব ক্ষেত্রেই ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা তৈরি করে।’