যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ভেঙে দিতে মার্কো রুবিও কেন উঠেপড়ে লেগেছেন

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে গতকাল সোমবার একটি প্রচারণা শুরু করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এই আদালত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করছে, যা দেশটির সার্বভৌমত্বের জন্য ঝুঁকির।

গতকাল ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে রুবিওর লেখা দীর্ঘ একটি মতামত নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত টহল বাহিনীর সদস্য ও নির্বাচিত নেতাদের আন্তর্জাতিক আদালত পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিচারকদের সামনে তাঁদের বিচারের মুখোমুখি হওয়ার চিত্র তুলে ধরেছেন।

একই দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় রুবিও সতর্ক করে বলেন, ‘আমরা যদি নিষ্ক্রিয় থাকি, তাহলে তাঁদের সবাইকে হাজার হাজার মাইল দূরের বিদেশি বিচারকদের করুণার ওপর নির্ভর করতে হবে। নিজেদের দেশ রক্ষার তথাকথিত অপরাধে তাঁদের বিরুদ্ধে যেকোনো সময় মামলা হতে পারে, এমনকি কারাদণ্ডেরও ঝুঁকি থাকবে।’

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইসিসিকে ‘ভেঙে দিতে’ পররাষ্ট্র দপ্তরের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অন্যান্য দেশকে আদালত ত্যাগ করতে চাপ দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে এক মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়েও আইসিসির কথিত কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করতে রাজি হবে না, তারা আরও কঠোর নজরদারির মুখে পড়তে পারে।’

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সম্ভাব্য শাস্তির মধ্যে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং ভিসা বাতিলের মতো পদক্ষেপও থাকতে পারে।

তবে আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক তিন বিশেষজ্ঞ রুবিওর বক্তব্যকে আইসিসির ক্ষমতা সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর উপস্থাপন বলে মন্তব্য করেছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাবেক নির্বাহী পরিচালক কেনেথ রথ বলেন, ‘আইসিসি যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সংঘটিত কর্মকাণ্ডের ওপর বিচারিক এখতিয়ার দাবি করছে না। রুবিও মূলত জাতীয় সার্বভৌমত্বের আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধে দায়মুক্তির প্রচেষ্টাকেই উপস্থাপন করছেন। অন্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব ভূখণ্ডে সংঘটিত অপরাধের বিচার চেয়ে আইসিসির শরণাপন্ন হওয়ার যে একটি সার্বভৌম অধিকার রয়েছে, তা তিনি উপেক্ষা করছেন।’

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) কেবল সেসব দেশে সংঘটিত অপরাধের তদন্ত করতে পারে, যেসব দেশ রোম চুক্তির অন্তর্ভুক্ত। ২০০২ সালে এ চুক্তির মাধ্যমেই আইসিসি প্রতিষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র এখনো এ চুক্তি অনুমোদন করেনি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সংঘটিত কোনো অপরাধ নিয়েও আইসিসি কোনো তদন্ত শুরু করেনি।

এ প্রসঙ্গে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সাবেক নির্বাহী পরিচালক কেনেথ রথ বলেন, ‘ট্রাম্প আসলে যে দেশগুলো আইসিসির বিচারিক এখতিয়ার মেনে নিয়েছে, সেসব দেশের ভূখণ্ডে যুদ্ধাপরাধ করার সুযোগ ধরে রাখতে চান। মূল বিষয়টি আসলে সেটিই।’

কিছু ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন আবার আইসিসির বিচারিক এখতিয়ারকে স্বাগতও জানিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে রোম চুক্তির অন্তর্ভুক্ত দেশ ইউক্রেনে রাশিয়ার কথিত যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করায় আইসিসির পদক্ষেপকে তারা সমর্থন জানিয়েছিল।

আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি করিম খানের নেতৃত্বাধীন দপ্তর ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করে। ফিলিস্তিন ওই ভূখণ্ডে আইসিসির তদন্ত পরিচালনার বিষয়ে সম্মতি দেওয়ায় এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

যুদ্ধাপরাধ–সংক্রান্ত এ তদন্তের অংশ হিসেবে আদালত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।

দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার ছয় সপ্তাহের মাথায় আইসিসির কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, আইসিসি ‘যুক্তরাষ্ট্র ও তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে অবৈধ ও ভিত্তিহীন পদক্ষেপ’ নিচ্ছেন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প প্রশাসন আদালতের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আইসিসির প্রধান কৌঁসুলি করিম খান, তাঁর দুই উপপ্রধান এবং ছয়জন বিচারক এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়েন। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড এবং আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাসদস্যদের কার্যকলাপ নিয়ে তদন্তের কারণেই তাঁদের বিরুদ্ধে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসন তাঁদের নিষেধাজ্ঞার পরিধি আরও বাড়ায়। সে সময় অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মানবাধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক ফ্রানচেসকা আলবানিজ এবং ইসরায়েলের সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ সংগ্রহে যুক্ত তিনটি ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।

তবে রুবিওর সর্বশেষ আইসিসিকে ‘ভেঙে দেওয়ার’ যে অঙ্গীকার, বাস্তবে আদালতের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।