জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে গিলেন ম্যাক্সওয়েল
জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে গিলেন ম্যাক্সওয়েল

কুখ্যাত এপস্টিনের বান্ধবী গিলেন কে এবং কেমন ছিলেন, কী বলছেন তাঁর ভাই

২০২০ সালের জুলাইয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচারের অভিযোগে কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিনের সাবেক বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল গ্রেপ্তার হন। যুক্তরাজ্যে থাকা গিলেনের ভাই ইয়ান ম্যাক্সওয়েল বিবিসি নিউজের সূত্রে প্রথম খবরটি জানতে পেরেছিলেন।

ইয়ান সেদিনের কথা মনে করে যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘তারা একটি হেলিকপ্টার ও ২০ জন সশস্ত্র এজেন্টকে পাঠিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, যেন তিনি (গিলেন) সমাজের জন্য বড় কোনো হুমকি। এটা ছিল অবিশ্বাস্য। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই আমার বোনটি জেফরি এপস্টিনের ভয়াবহ অপরাধের বলির পাঁঠা হয়ে গেল।’

৬৪ বছর বয়সী গিলেন ম্যাক্সওয়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ হ্যাম্পশায়ারের একটি বাড়ি থেকে আটক করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো এফবিআই তাঁর মুঠোফোনের তথ্য ব্যবহার করে তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে। পুলিশ কড়া নাড়লেও গিলেন দরজা খুলছিলেন না এবং লুকানোর চেষ্টা করছিলেন। একপর্যায়ে পুলিশকে জোর করে ভেতরে ঢুকতে হয়।

ভেতরে ফয়েল পেপারে মোড়ানো অবস্থায় একটি মুঠোফোন পাওয়া গিয়েছিল। জিপিএস শনাক্তকরণ এড়ানোর চেষ্টা থেকে এটিকে ফয়েল পেপারে মুড়িয়ে রাখা হয়েছিল। তবে তা সফল হয়নি। গিলেন আত্মগোপনে ছিলেন—এ কথা মানতে রাজি নন তাঁর ভাই।

ইয়ান ম্যাক্সওয়েল জোর দিয়ে বলেন, ‘আমার বোন পুলিশ থেকে পালাতে নয়, গণমাধ্যমকে এড়াতে নিজের বাড়ি ছেড়ে নিউ হ্যাম্পশায়ারে গিয়েছিলেন। এপস্টিনের মৃত্যুর পর সংবাদমাধ্যম তাঁকে ২৪ ঘণ্টা তাড়া করছিল। তাই তিনি সেখান থেকে দূরে যেতে বাধ্য হন।’

তবে ইয়ানের কথাটি যদি সত্যও হয়, তবু প্রশ্ন থেকে যায়, একজন নির্দোষ ব্যক্তি কেন দরজায় পুলিশ দেখে তড়িঘড়ি করে অন্য ঘরে পালিয়ে যাবেন।

ইয়ান ম্যাক্সওয়েল বারবারই দাবি করেছেন, তাঁর বোন গিলেন ম্যাক্সওয়েল তাঁর সাবেক প্রেমিক জেফরি এপস্টিনের যৌন নিপীড়ন–বিষয়ক জঘন্য অপরাধের সম্পর্কে কিছুই জানতেন না।

টেলিগ্রাফকে ইয়ান বলেন, ‘আমার বোন বলির পাঁঠা। এপস্টিন যা করেছে, তার জন্য কাউকে না কাউকে মূল্য দিতে হতো। আর তাই সরকার ও গণমাধ্যম তাকে বেছে নিয়েছে। আমি সত্যিই বিশ্বাস করি, এপস্টিন যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনি কারাগারে থাকতেন, আর আমার বোন মুক্ত থাকতেন।’

ইয়ান ম্যাক্সওয়েলের দাবি, তাঁর বোন ন্যায়বিচার পাননি। তিনি আরও বলেন, গিলেন কোনো ভুল করেনি, অথচ তাকে অত্যন্ত কঠোর সাজা দেওয়া হয়েছে। একই ফেডারেল আদালতে পি ডিডির (মার্কিন র‍্যাপার) মতো একজন ব্যক্তি একই অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি হয়েছিলেন এবং চরম শারীরিক নির্যাতনের জন্য দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরেও সাড়ে চার বছরের সাজা পেয়েছিলেন। আর আমার বোনকে দেওয়া হয়েছে ২০ বছরের কারাদণ্ড।’

ইয়ান ম্যাক্সওয়েল চলতি বছর ৭০ বছরে পা দিচ্ছেন। সব সময় পরিপাটি পোশাকে থাকেন তিনি। মার্লবরো কলেজ ও পরে অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করা এই ব্যক্তি তাঁর বোনের বিচারের প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত। শুধু সাক্ষীদের নামই নয়, তাঁদের আইনজীবীদের নামও অনায়াসে তিনি বলে দিতে পারেন। নথিপত্র, আইনি প্রক্রিয়া এবং ফেডারেল আইনের নানা দিক সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানেন।

গিলেন ম্যাক্সওয়েলের ভাই ইয়ান ম্যাক্সওয়েল

ইয়ান ম্যাক্সওয়েল বলেন, ‘এপস্টিন–সংক্রান্ত যেসব নথি সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে, তার মধ্যে এমন কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র আছে, যা প্রমাণ করে যে গিলেন ন্যায়বিচার পাননি। কিন্তু কারাগারে তার কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ নেই। তাই তিনি সেগুলো পড়তেও পারছে না। তাহলে আমি ক্ষুব্ধ হব না কেন?’

ইয়ান বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্ককে যৌনকর্মে প্ররোচিত করার দায়ে কারাভোগ করেছিলেন এপস্টিন। নারীদের যৌনকর্মের উদ্দেশে পাচারের অভিযোগে বিচার চলাকালে ২০১৯ সালের আগস্টে কারাগারে আত্মহত্যা করেন তিনি।

এপস্টিনের মৃত্যুর পর সব নজর ঘুরে যায় এপস্টিনের সাবেক প্রেমিকা, বন্ধু ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েলের দিকে। তিনি এপস্টিনের দৈনন্দিন কাজের তালিকাটি পরিচালনা করতেন এবং তাঁর মালিকানাধীন বাড়ির দেখভাল করতেন। কার্যত বহু বছর তিনি এপস্টিনের বেতনভুক্ত ছিলেন।

সরকারি নথি অনুযায়ী, এপস্টিন তাঁর বান্ধবী গিলেনের পেছনে ৩ কোটি ৭ লাখ ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করেছিলেন।

বর্তমানে গিলেন যৌনকর্মের উদ্দেশ্যে শিশুদের পাচারের অভিযোগে ২০ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তবে তাঁর আইনজীবী আপিলের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। গিলেনের এ লড়াইয়ে ভাই ইয়ান ম্যাক্সওয়েলের পাশাপাশি তাঁর আরও পাঁচ ভাইবোনও চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

ম্যাক্সওয়েল বলেন, ‘আমি এখন কার্যত তার মুখপাত্র হয়ে গেছি। তবে আমরা সবাই নানাভাবে তাকে সহযোগিতা করছি। আমাদের পরিবারে একে অপরের প্রতি আস্থার জায়গাটি বেশ সুদৃঢ়।’

ইয়ান ম্যাক্সওয়েল স্বীকার করেছেন, এপস্টিনের কারণে অনেক তরুণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে তিনি উল্লেখ করেন, ‘এপস্টিন এস্টেট থেকে প্রায় ১০০ কোটি ডলার’ ভুক্তভোগী ও তাঁদের আইনজীবীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।

ইয়ানের দাবি, ঘটনার সময় বেশির ভাগ নারী প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন এবং এটি একপক্ষীয় বিষয় নয় বলেও দাবি করেছেন তিনি।

গিলেনের বাবার নামেও ছিল ‘আত্মসাতের’ অভিযোগ

গিলেন ম্যাক্সওয়েলদের পরিবার সম্পর্কে কেউ কেউ বলেন, এটি কেবল একটি পরিবার নয়, বরং একধরনের সাম্রাজ্য ছিল। ম্যাক্সওয়েল পরিবারটি একসময় সংবাদপত্র ও প্রকাশনাজগতের আকাশছোঁয়া এক সাম্রাজ্য চালাত। কিন্তু এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিবারের কর্তা রবার্ট ম্যাক্সওয়েল ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের কাছে নিজের প্রমোদতরি ‘লেডি গিলেন’ থেকে পড়ে ডুবে মারা যান। আর তখন সে সাম্রাজ্য ভেঙেচুরে যায়।

সময়টা ১৯৯১ সালের নভেম্বরের। রবার্টের মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রশাসকেরা জানতে পারেন, তিনি মিরর গ্রুপের পেনশন তহবিল থেকে ৪৬ কোটি পাউন্ড আত্মসাৎ করেছিলেন। সেই অর্থ ব্যবহার করা হয়েছিল মূলত তাঁর বিস্তৃত মিডিয়া সাম্রাজ্যের অন্যান্য অংশ টিকিয়ে রাখতে। তাঁর ব্যক্তিগত নানা কর্মকাণ্ডেও এ অর্থ ব্যবহার করা হয়েছে।

‘চুরি’ শব্দটি শুনতেই ইয়ান ম্যাক্সওয়েলের মুখে অস্বস্তির ছাপ ফুটে ওঠে।

ইয়ান দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘বিশ্ব আমার বাবাকে একজন প্রতারক হিসেবে দেখে, কিন্তু আমি তা বিশ্বাস করি না। তিনি একজন লুটেরা বা চোর—এই ধারণা মেনে নিতে আমার সব সময়ই কষ্ট হয়েছে। তিনি বসে বসে বৃদ্ধ পেনশনভোগীদের টাকা লুট করার ষড়যন্ত্র করতেন—এটা একেবারেই ভুল ধারণা।’

ইয়ান বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল তাঁর ব্যবসা এবং সেখানে কর্মরত ৪০ হাজার মানুষের চাকরি বাঁচানো। তিনি ছিলেন অসাধারণ প্রতিভাবান একজন মানুষ, যিনি শেষ পর্যন্ত তাঁর নৈতিক দিশা হারিয়ে ফেলেছিলেন।’

তদন্তে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়া এবং পানিতে ডুবে যাওয়ার কারণে রবার্টের মৃত্যু হয়েছে। ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকেরা বিশ্বাস করতেন, তিনি অপমান এড়াতে আত্মহত্যা করেছেন। তবে ইয়ান ম্যাক্সওয়েলের দাবি, তাঁর বাবা নৌকার পাশে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়েছিলেন।

মার্কিন বিচার বিভাগের গত বছর প্রকাশিত ছবিতে জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর বান্ধবী গিলেন ম্যাক্সওয়েল

গিলেন ছিলেন আদরের সন্তান

গিলেন ম্যাক্সওয়েলের বাবা রবার্ট ম্যাক্সওয়েল ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক। আর মা এলিজাবেথ ছিলেন ফরাসি। গিলেনরা ৯ ভাইবোন। তিনি ছিলেন পরিবারের অতি আদরের সন্তান। অক্সফোর্ডের হেডিংটন হিল হলে ঐশ্বর্য আর প্রাচুর্যের মধ্যে তাঁরা বড় হয়েছেন।

ভাই ইয়ানের ভাষ্য অনুযায়ী, গিলেন ছিলেন তাঁর মা–বাবার চোখের মণি। কিন্তু মজার বিষয়, তার কোনো ভাইবোনই এটা নিয়ে মনখারাপ করতেন না।

গিলেনের যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়া
গিলেন তাঁর বাবার মৃত্যুর পর পুরোপুরিভাবে নিউইয়র্কে চলে যান। সেখানে তিনি ধনকুবের জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েন। প্রথম দিকে তিনি এপস্টিনের ডায়েরি পরিচালনা করতেন এবং বাড়ির দেখভাল করতেন।

তবে ২০২১ সালে নিউইয়র্কের আদালতে গিলেনের বিরুদ্ধে বিচার চলার সময় বলা হয়, কৌঁসুলিরা অভিযোগ করেন, এই নারী অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌনকর্মের জন্য প্রস্তুত করতেন এবং পাচার করতেন। ১৯৯৪ সাল থেকে এটা শুরু হয়েছিল।

আদালত মনে করেছেন, তিনি আর্থিকভাবে এপস্টিনের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। তাই তাঁর কাজের মূল উদ্দেশ্য ছিল এপস্টিনের চাহিদা মেটানো। তবে ভাই ইয়ান ম্যাক্সওয়েল বলেন, তাঁর বোন সম্ভবত জানতেন না, কী ঘটছিল।

ইয়ান বলেন, তাঁর পরিবার গিলেন ম্যাক্সওয়েলের পাশে থাকবে। তিনি আরও বলেন, ‘বাস্তবতা হলো, সে আমার আদরের ছোট বোন। তার প্রতি কেউ সহানুভূতি দেখাচ্ছে না। তার পাশে কারও থাকা জরুরি। এটাই পরিবারের কাজ। পরিবারই তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে।’