ট্রিনিটি বিস্ফোরণের পর তৈরি হয় বিশাল এক মাশরুম ক্লাউড বা ব্যাঙের ছাতার মতো মেঘের অবয়ব
ট্রিনিটি বিস্ফোরণের পর তৈরি হয় বিশাল এক মাশরুম ক্লাউড বা ব্যাঙের ছাতার মতো মেঘের অবয়ব

ফিরে দেখা : প্রথম পারমাণবিক বোমা বানাতে কত মানুষ কাজ করছিলেন, তাঁরা কি জানতেন কী বানাচ্ছেন

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা মানবসভ্যতার গতিপথ চিরতরে বদলে দেয়। আজ থেকে ৮১ বছর আগে, ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে ভোর ৫টা ২৯ মিনিটে যখন প্রথম পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, সেটি ছিল তেমনই এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। মার্কিন সেনাবাহিনীর সেই ‘ট্রিনিটি টেস্ট’ বা ট্রিনিটি পরীক্ষা মানব ইতিহাসের প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। ‘দ্য গ্যাজেট’ নামের একটি প্লুটোনিয়াম ইমপ্লোশন ডিভাইসের সেই বিস্ফোরণ কেবল বিশ্বরাজনীতিকেই বদলে দেয়নি, বরং বিজ্ঞানীদের জন্য রেখে গেছে এমন কিছু বিস্ময়, যা আজও তাঁদের নতুন গবেষণার খোরাক জোগাচ্ছে।

এক সেকেন্ডে বদলে যাওয়া ইতিহাস

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষলগ্নে নাৎসি জার্মানি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র শুরু করেছিল অত্যন্ত গোপনীয় ‘ম্যানহাটান প্রজেক্ট’। বিজ্ঞানী জে রবার্ট ওপেনহেইমারের নেতৃত্বে লস আলামোসের গবেষণাগারে দিনরাত এক করে কাজ করেছিলেন শত শত বিজ্ঞানী।

তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান যখন পটসডাম কনফারেন্সে উইনস্টন চার্চিল ও জোসেফ স্তালিনের সঙ্গে বৈঠকে ব্যস্ত, ঠিক তখনই নিউ মেক্সিকোর অ্যালামোগোর্ডো বিমানঘাঁটির মরুভূমিতে ইতিহাসের প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালানো হয়।

বিস্ফোরণটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এর তীব্রতা ছিল প্রায় ২১ কিলোটন টিএনটির সমান। মুহূর্তের মধ্যে ৩০ মিটার (৯৮ ফুট) উঁচু পরীক্ষার টাওয়ার এবং এর চারপাশের তামা ও লোহার তৈরি সব যন্ত্রপাতি বাষ্পীভূত হয়ে যায়। আকাশে তৈরি হয় বিশাল এক মাশরুম ক্লাউড বা ব্যাঙের ছাতার মতো মেঘের অবয়ব হয়ে দেখা দিয়েছিল। এই বিস্ফোরণের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়, যার ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে মানবজাতি।

গোপন প্রকল্প থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে

মিত্রবাহিনীর পক্ষ থেকে একটি ইউরেনিয়াম বোমা তৈরির পরিকল্পনা ১৯৩৯ সালের শুরুর দিকেই গৃহীত হয়েছিল। সে সময় ইতালি থেকে অভিবাসী হওয়া পদার্থবিদ এনরিকো ফার্মি কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে মার্কিন নৌবাহিনী বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সামরিক উদ্দেশ্যে ফিশনযোগ্য (বিভাজনযোগ্য) পদার্থের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করতে বৈঠক করেন।

একই বছর, হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত পদার্থবিদ লিও সিলার্ডকে সঙ্গে নিয়ে আলবার্ট আইনস্টাইন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্টের কাছে একটি চিঠির খসড়া পাঠান। চিঠিতে একটি অনিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক শৃঙ্খল বিক্রিয়া (চেইন রিঅ্যাকশন) যে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ভিত্তি হিসেবে বিশাল সম্ভাবনাময়, সেই তত্ত্বকে সমর্থন করা হয়েছিল।

১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফেডারেল সরকার এই গবেষণার জন্য মোট ৬ হাজার কোটি ডলার অনুদান দেয়। কিন্তু ১৯৪২ সালের শুরুর দিকে যখন যুক্তরাষ্ট্র অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং জার্মানি নিজস্ব ইউরেনিয়াম বোমা তৈরির কাজ করছে বলে আশঙ্কা তীব্র হতে থাকে, তখন যুদ্ধ বিভাগ (ওয়ার ডিপার্টমেন্ট) এতে আরও সক্রিয়ভাবে আগ্রহ দেখায় এবং প্রকল্পের সম্পদের ওপর থেকে সব ধরনের সীমাবদ্ধতা তুলে নেওয়া হয়।

কিছুটা প্রকৌশলী ব্যাকগ্রাউন্ডের ব্রিগেডিয়ার-জেনারেল লেসলি আর গ্রোভসকে তখন এই প্রকল্পের সম্পূর্ণ দায়িত্বে আনা হয়। বিজ্ঞানের সেরা মেধাবীদের একত্র করা এবং যুদ্ধকে একটি চূড়ান্ত সমাপ্তির দিকে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যম হিসেবে কীভাবে পরমাণুর শক্তিকে কাজে লাগানো যায়, তা আবিষ্কার করাই ছিল এর লক্ষ্য।

তাত্ত্বিক অনুসন্ধানের প্রাথমিক পর্যায়ে ‘ম্যানহাটান প্রজেক্ট’ (গবেষণাটি যেখানে শুরু হয়েছিল সেই জায়গার নামানুসারে এই নামকরণ) বেশ কয়েকটি স্থান ঘুরে এগোতে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে এনরিকো ফার্মি সফলভাবে প্রথম ফিশন চেইন রিঅ্যাকশন বা বিভাজন শৃঙ্খলের বিক্রিয়া ঘটান।

তবে প্রকল্পটি চূড়ান্ত রূপ পায় নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে। সেখানে ১৯৪৩ সালে ওপেনহেইমার লস আলামোসের একটি গবেষণাগারে হ্যান্স বেথে, এডওয়ার্ড টেলার ও ফার্মির মতো মেধাবীদের সঙ্গে নিয়ে ‘প্রজেক্ট ওয়াই’ পরিচালনা শুরু করেন। এখানেই তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিকগুলো একসঙ্গে মিলে যায় এবং ক্রিটিক্যাল মাস বা সমালোচনামূলক ভর অর্জন এবং একটি নিক্ষেপযোগ্য বোমা তৈরির সমস্যার সমাধান করা হয়। ক্রিটিক্যাল মাস বা সমালোচনামূলক ভর অর্জন ছিল পারমাণবিক বিস্ফোরণের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয়।

প্রথম পারমাণবিক বোমা তৈরির লক্ষ্যে নেওয়া ম্যানহাটন প্রজেক্টের কর্মযজ্ঞই ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই ট্রিনিটি পরীক্ষার দিকে ধাবিত করেছিল

অবশেষে ১৬ জুলাই সকালে সান্তা ফে থেকে ১২০ মাইল দক্ষিণে নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে প্রথম পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। বিজ্ঞানী এবং কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রথম মাশরুম ক্লাউড বা ব্যাঙের ছাতার মতো মেঘ অবলোকন করার জন্য ১০ হাজার গজ দূরে অবস্থান নেন। তীব্র আলোর সেই মেঘ আকাশে ৪০ হাজার ফুট উঁচুতে ছড়িয়ে পড়ে এবং ১৫ থেকে ২০ হাজার টন টিএনটির সমপরিমাণ ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা তৈরি করে। বোমাটি যে টাওয়ারের ওপর রেখে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছিল, সেটি মুহূর্তে বাষ্পীভূত হয়ে যায়।

এখন প্রশ্ন দাঁড়াল—কার ওপর এই বোমা ফেলা হবে? মূলত জার্মানিই ছিল এর মূল লক্ষ্য। কিন্তু জার্মানরা ততক্ষণে আত্মসমর্পণ করে ফেলেছে। একমাত্র যুদ্ধরত দেশ হিসেবে তখন কেবল জাপানই অবশিষ্ট ছিল।

মরুভূমির বালিতে স্ফটিকের জন্ম

ট্রিনিটি পরীক্ষার ৮০ বছরের বেশি সময় পর সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা সেই বিস্ফোরণস্থলে এমন একধরনের স্ফটিক বা ক্রিস্টালের সন্ধান পেয়েছেন, যা স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পৃথিবীতে থাকা অসম্ভব। ইতালির ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ লুকা বিন্দির নেতৃত্বে একদল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী ট্রিনিটি পরীক্ষার ধ্বংসাবশেষে সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি স্ফটিকের খোঁজ পান। বৈজ্ঞানিক ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘ক্যালসিয়াম কপার সিলিকেট টাইপ-১ ক্ল্যাথ্রেট’।

পারমাণবিক বিস্ফোরণের সেই চরম ও ক্ষণস্থায়ী পরিস্থিতিতে তাপমাত্রা পৌঁছেছিল প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এবং চাপ ছিল ৫ থেকে ৮ গিগাপাসকাল। এই অবিশ্বাস্য উত্তাপ ও চাপে মরুভূমির বালি, অ্যাসফল্ট এবং পরীক্ষার টাওয়ারের তামা গলে একসঙ্গে মিশে একধরনের কাচজাতীয় পদার্থ তৈরি হয়েছিল, যার নাম ‘ট্রিনিটাইট’।

২০২১ সালে এই ট্রিনিটাইটের মধ্যেই ব্যতিক্রমী এক ‘কোয়াসিক্রিস্টাল’ বা ছদ্ম-স্ফটিকের সন্ধান পেয়েছিলেন বিজ্ঞানীরা। ঠিক তার পাশেই পাওয়া গেছে ‘ক্ল্যাথ্রেট’। এটি এমন একটি খাঁচার মতো আণবিক গঠন, যা নিজের ভেতরে অন্য পরমাণুকে বন্দী করে রাখতে পারে। সাধারণ ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম উপায়ে এই স্ফটিক তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।

ম্যানহাটান প্রজেক্টের বিশাল কর্মযজ্ঞ

অনেকের ধারণা, ম্যানহাটন প্রজেক্ট মানেই ছিল লস আলামোসের নির্জনতায় কয়েকজন পদার্থবিদের কাজ। কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা। এই প্রকল্পের পেছনে কাজ করেছিলেন প্রায় ৪ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ। অর্থাৎ তৎকালীন সময়ে প্রতি ২৫০ জন মার্কিন নাগরিকের মধ্যে একজন এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ওক রিজ, টেনেসি এবং ওয়াশিংটনের হ্যানফোর্ড ওয়ার্কসের মতো বিশাল সব কারখানায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও প্লুটোনিয়াম তৈরির কাজ চলেছে বছরের পর বছর। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, বিপুলসংখ্যক শ্রমিক জানতেনই না, তাঁরা আসলে কী তৈরি করছেন।

বিস্ফোরণের পর লস আলামোসের বিজ্ঞানীরা যখন এই অভাবনীয় সাফল্য ও এর ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেন, তখন তাঁদের অনুভূতি ছিল মিশ্র। প্রকল্পের অন্যতম পদার্থবিদ জোন হিন্টন পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘বিস্ফোরণের শব্দ যখন আমাদের কান পর্যন্ত পৌঁছাল, আমরা হঠাৎ উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতে শুরু করলাম এবং আমাদের মনে হলো আমরা পুরো পৃথিবীর সামনে উন্মোচিত হয়ে গেছি।’

বিজ্ঞানের জগতে ট্রিনিটির প্রভাব

ট্রিনিটি পরীক্ষার প্রভাব কেবল যুদ্ধের ময়দানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছিল বিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও সমাজজীবনে। ১৯৫৩ সালে তেজস্ক্রিয়তা কিছুটা কমে আসার পর ট্রিনিটি সাইটটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়, যা বর্তমানে একটি জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান ও পর্যটনকেন্দ্র। ১৯৫৪ সালে বাজারে আসে ‘অ্যাটমিক ফায়ারবল’ নামের একটি ক্যান্ডি, যা পপ কালচারে পারমাণবিক যুগের জনপ্রিয়তার প্রমাণ দেয়।

অন্যদিকে ম্যানহাটান প্রজেক্টের রিঅ্যাক্টরে উৎপাদিত তেজস্ক্রিয় ‘কার্বন-১৪’ ব্যবহার করে উদ্ভিদের কার্বন ডাই-অক্সাইড আত্তীকরণ নিয়ে গবেষণা করে ১৯৬১ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান মেলভিন কেলভিন। অর্থাৎ ধ্বংসের সেই সমীকরণ থেকে বিজ্ঞানের নানা শাখার নতুন দুয়ারও উন্মোচিত হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক অস্ত্রের এই ভয়াবহতা রুখতে এবং বিশ্বকে নিরাপদ করতে ১৯৯৬ সালে ‘কমপ্রিহেনসিভ টেস্ট ব্যান ট্রিটি’ (সিটিবিটি) বা পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

তথ্যসূত্র: প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস, সায়েন্সঅ্যালার্ট, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, হিস্টোরি ডটকম ও এপি