রেনি নিকোল গুডের স্মরণে গুলির ঘটনাস্থলে ফুল দেওয়া হয়। সেখানে এক ব্যক্তি গাড়িতে আরোহী একজনকে বাঁচাতে হুইসেল দিচ্ছেন। ২২ জানুয়ারি ২০২৬, মিনিয়াপোলিস
রেনি নিকোল গুডের স্মরণে গুলির ঘটনাস্থলে ফুল দেওয়া হয়। সেখানে এক ব্যক্তি গাড়িতে আরোহী একজনকে বাঁচাতে হুইসেল দিচ্ছেন। ২২ জানুয়ারি ২০২৬, মিনিয়াপোলিস

আইসিই সদস্যদের কী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে তাঁরা এতটা বেপরোয়া হন

যুক্তরাষ্ট্রে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) অভিবাসনবিরোধী অভিযান নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলছে। এসব নিয়ে আল–জাজিরায় লিখেছেন লিলা হাসান। ২৩ জানুয়ারি লেখাটি আল–জাজিরার অনলাইন সংস্করণে প্রকাশ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিসে মার্কিন ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই যা আইস নামে পরিচিত) এজেন্ট জোনাথন রসের গুলিতে রেনি নিকোল গুড নিহত হন। এ ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আরেক আইসিই সদস্য এক লাতিনো ব্যক্তির পায়ে গুলি করেন।

রেনি গুডের হত্যাকাণ্ড এবং পরে এই গুলির ঘটনায় আইসিই কর্মকর্তাদের বিচার করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু মিনেসোটার এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো উদাহরণ নয়। আইসিইর গুলিবর্ষণের ইতিহাস বলে, কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রায় অসম্ভব।

আমি এটি জানি, কারণ আমি এই সংস্থার কার্যপদ্ধতি নিয়ে অনুসন্ধান করেছি এবং এমন কিছু নথি পেয়েছি যা থেকে বোঝা যায়, তারা কীভাবে কাজ করে। কীভাবে কর্মকর্তাদের তদন্ত ও মামলা থেকে বাঁচতে তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে একটি মামলায় সংস্থাটির কাছ থেকে পাওয়া নথির ভিত্তিতে ছয় বছরের গুলিবর্ষণের ঘটনা আমি অনুসন্ধান করেছি।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ট্রেস-এর মতে, আইসিইর সদস্যরা চলতি বছরের প্রথম মাস এবং গত বছর অন্তত ১২ জনকে গুলি করেছেন। ২০১৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে আইসিই এজেন্টরা অন্তত ৫৯ বার আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেছেন, যাতে ২৪ জন আহত ও ২৩ জন নিহত হয়েছেন।

ফেডারেল বা অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের সংস্থাগুলোর মাধ্যমে একজন আইসিই এজেন্টের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আসার সম্ভাবনা কতটুকু? খুবই সামান্য। আমার পরীক্ষা করা কোনো গুলিবর্ষণের ঘটনাতেই কোনো আইসিই এজেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়নি, এমনকি মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও নয়।

সংরক্ষিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বলপ্রয়োগ এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ–সংক্রান্ত নথিপত্র বা নীতিগুলো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় না। এজেন্টরা মাঠে কীভাবে কাজ করেন, তা মূলত তদন্তের বাইরেই থেকে গেছে। তবে আমি এমন কিছু নথি পেয়েছি, যাতে ২০০৭ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে কিছু আইসিই এজেন্টের প্রাপ্ত প্রশিক্ষণের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।

যদিও এসব নথি এখন পুরানো, তবু এগুলোই একমাত্র মাধ্যম। ফেডারেল ল এনফোর্সমেন্ট ট্রেনিং সেন্টারের (এফএলইটিসি) ওয়েবসাইটে দেওয়া সামান্য তথ্যের বাইরে আর তেমন কিছু পাওয়া যায় না। এর মাধ্যমে আইসিই এজেন্টদের বলপ্রয়োগ–সংক্রান্ত প্রশিক্ষণের স্বরূপ কিছুটা বোঝা যায়।

এজেন্টদের শেখানো হয়, নিজেদের ‘অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকিতে’ না ফেলতে। ২০১৬ সালের এক প্রশিক্ষণের তথ্য অনুযায়ী, আইসিই কর্মকর্তাদের কেবল সহিংসতার ক্ষেত্রেই নয়, বরং সহিংসতার আশঙ্কার ক্ষেত্রেও বলপ্রয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

মিনেসোটায় রেনি গুডকে আইসিই সদস্যের গুলি করে হত্যা প্রতিবাদ করায় এক ব্যক্তিকে আটক করছেন ফেডারেল এজেন্টরা। ২১ জানুয়ারি ২০২৬, মিনিয়াপোলিস

আইসিই কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে শেখানো হয়, ‘প্রাণঘাতী শক্তি’ বা সরাসরি গুলি চালানো কেবল শেষ উপায় নয়। তাদের মতে, আইন অনুযায়ী কর্মকর্তারা পরিস্থিতি বুঝে সরাসরি কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারেন, সব সময় ‘ন্যূনতম’ শক্তি ব্যবহার করা জরুরি নয়।

এমনকি গুলি চালানোর আগে সতর্ক করা বা কম শক্তি ব্যবহার করাকে কর্মকর্তাদের জন্য একটি ‘অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি’ হিসেবে দেখা হয়। প্রশিক্ষণের এক প্রশ্নোত্তরে দেখা গেছে, প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের আগে অন্য কোনো ধাপ অনুসরণ করার দরকার নেই; প্রয়োজনে তা তাৎক্ষণিকভাবেই শুরু করা যেতে পারে।

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ ২০২৩ সালে জো বাইডেন প্রশাসনের আদেশে এই বলপ্রয়োগ–সংক্রান্ত নীতি সংশোধন করে। নতুন নীতিতে পরিস্থিতির উত্তেজনা কমানোর জন্য বার্ষিক প্রশিক্ষণের কথা বলা হলেও কর্মকর্তারা আসলে এই প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।

২০১৬ সালে এক এজেন্টের গুলিতে মেক্সিকান বংশোদ্ভূত এক ব্যক্তি পঙ্গু হয়ে যান। পরে এক মামলায় দেখা যায়, ওই এজেন্ট তাঁর প্রশিক্ষণ সম্পর্কে খুব সামান্যই মনে করতে পেরেছিলেন। আইসিই তাদের নিয়মগুলো গোপন রাখে, যা বিশেষজ্ঞদের মতে তদন্ত এড়ানোর একটি কৌশল। পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জনসমক্ষে না থাকায় সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব হয় না, এজেন্টরা আসলে নিয়ম মানছেন কি না।

প্রশিক্ষণের নথিপত্র থেকে আরও দেখা যায়, এজেন্টদের শেখানো হয় কীভাবে মামলা থেকে বাঁচা যায়। মার্কিন সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী (যা বিনা পরোয়ানায় তল্লাশি থেকে সুরক্ষা দেয়) সম্পর্কে কর্মকর্তাদের এমনভাবে শেখানো হয়, যাতে তাঁরা নিজেদের কর্মকাণ্ডকে আইনিভাবে জায়েজ করতে পারেন।

এ ছাড়া আইসিই এজেন্টরা বিশেষ আইনি সুরক্ষার সুযোগ ভোগ করেন, যার ফলে আদালতে তাঁদের জবাবদিহি করানো অত্যন্ত কঠিন।

গত এক বছরে আইসিইর জনবল ১০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২২ হাজার করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দ্রুত নিয়োগ দিতে গিয়ে এআই টুল ব্যবহার করা হয়েছে এবং অনেককে সঠিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই মাঠে পাঠানো হয়েছে।

বর্তমানে মিনিয়াপোলিসে অভিবাসন এজেন্টদের সঙ্গে বাসিন্দাদের বড় ধরনের সংঘর্ষ চলছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, এজেন্টরা দরজা ভেঙে বাড়িতে ঢুকছেন এবং গাড়ি থেকে মানুষকে টেনে বের করছেন। এতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি প্রধান এজেন্টদের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন দিলেও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, জনসমক্ষে কাজ করার সময় নীতিমালা গোপন রাখা গণতন্ত্রের পরিপন্থী। এমনকি অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিক্ষোভ সামাল দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও এই এজেন্টদের নেই।