
কোরিয়ার বংশোদ্ভূত মার্কিন শিল্পী ও লেখক রিনা ওহ বলেছেন, কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিন তাঁর ওপর অনেক দিন ধরেই মানসিক ও শারীরিকভাবে নিপীড়ন চালিয়েছেন। এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন তিনি।
নিউইয়র্ক নগরে বসবাসকারী রিনা ওহ বহুমুখী প্রতিভাধর এক শিল্পী। তিনি বলেন, এপস্টিনের সঙ্গে প্রথমবার দেখা হওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল ২১ বছর। তিনি বলেন, ‘শুরুর দিকে কিছু সময় তিনি আমার প্রশংসা করলেও পরে আমাকে হেয় করে কথা বলতেন। মানসিকভাবে আঘাত দিতেন। এটা অনেক মাস ধরে চলেছিল।’
রিনা বলেন, ‘তিনি প্রথমে আমাকে গালি দেওয়া শুরু করলেন। আমার শরীর নিয়ে সমালোচনা করতেন। আমার শরীর কীভাবে ঠিক করতে হবে, তাও বলে দিতেন। এরপর এক সময় তিনি বারবার বলতে শুরু করলেন, আমি নাকি বুড়িয়ে গেছি। অথচ তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর, আর তাঁর বয়স ছিল ৪৭ বছর। ভাবুন তো, ২১ বছরের একজন মেয়েকে বারবার বলা হচ্ছে, সে নাকি বুড়িয়ে গেছে।’
রিনা ওহ তাঁর এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনেক বছরের নীরবতা ভেঙেছেন। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে এপস্টিনের নিপীড়নের শিকার মানুষদের এক কষ্টকর অধ্যায় সামনে এসেছে।
এ ভুক্তভোগীর দাবি, ধারাবাহিকভাবে নিপীড়নের শিকার হওয়ার ঘটনা তাঁকে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
রিনা ওহ বলেন, এপস্টিনের নিপীড়নের শিকার হওয়ার আগে ছোটবেলায় পাঁচ–ছয় বছর বয়সে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন তিনি।
সে প্রসঙ্গের উল্লেখ করে রিনা বলেন, ‘আমি খুব চুপচাপ স্বভাবের মানুষ ছিলাম। তখন বুঝতামই না, এটি নিপীড়ন। কারণ, ছোটবেলায় আমার এমন কিছুর ধারণাই ছিল না। আর আমাকে খুব সহজেই প্রভাবিত করা যেত। আর আগে থেকেই নিপীড়নের শিকার হওয়া আমাকে দেখে এপস্টিন তাঁর সুযোগ নিয়েছিল।’
রিনা ওহ বলেন, তিনি যখন বিষয়টা বুঝতে পারলেন, ততক্ষণে পরিস্থিতি তাঁর ধারণার চেয়েও জটিল হয়ে গিয়েছিল।
ভুক্তভোগী রিনা বলেন, ‘একটা মুহূর্তে আমি বুঝতে পারলাম, পরিস্থিতি পুরোপুরি অন্ধকার। আমি তাঁর (এপস্টিন) এবং আরেকটি মেয়ের সঙ্গে ফ্লোরিডায় ভ্রমণে যাই। ওই ভ্রমণের সময় তিনি আমাকে এমন কিছু বলেছিলেন, যা সম্ভবত তার অন্ধকার জগতের গোপনীয় তথ্যগুলোর একটা অংশ ছিল।’
রিনা ওহ বলেন, ‘পরে আমি আরেক মেয়েকে কথাগুলো বলি। ওই মেয়ে ফিরে গিয়ে তাঁকে (এপস্টিন) সব বলে দেন এবং জানান যে, আমিই সব বলেছি। তখন তিনি (এপস্টিন) আমাকে হুমকি দেন। এরপর আমার বোঝা হয়ে গিয়েছিল, চাইলেও আমি চলে যেতে পারব না।’
রিনা ওহ বলেন, এপস্টিন তাঁর সম্পর্ক সব তথ্য জানতেন। এ জন্য তিনি ভয়ে থাকতেন। কারণ, তখন তাঁর যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি ছিল না। এপস্টিন বলেছিলেন, তিনি ওয়াশিংটনের সবাইকে চেনেন।
রিনা আরও বলেন, ‘আমি জানতাম, যদি আমি কোনো দিন মুখ খোলার চেষ্টা করি, তাহলে কুখ্যাত এই নিপীড়ক আমার ওপর নানাভাবে আক্রমণ করবেন। আমি কোথায় থাকি, আমার মা–বাবা কোথায় থাকেন, সেটাও তিনি জানতেন। আমি এমন আলামতও পেয়েছি, তিনি সম্ভবত আমার ওপর নজর রাখতে আমার পেছনে লোক লাগিয়েছিলেন। আমার মনে হয়, তিনি অন্য অনেক মেয়ের ক্ষেত্রেও একই কাজ করতেন।’
এপস্টিনের সঙ্গে শেষবার দেখা হওয়ার কথাও স্মরণ করেছেন রিনা ওহ। তিনি বলেন, ‘আমার মনে আছে, শেষবার যখন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়, তখন তিনি খুব সহিংস ছিলেন। আর এটাই শেষবার ছিল। এরপর আমি আর ফিরে যাইনি। ফোনও রিসিভ করিনি। তবে, এর পর থেকে আমি কখনো মুখ খুলিনি।’
এপস্টিনের নিপীড়নের শিকার হওয়া অন্য নারীদের উদ্দেশেও একটি বার্তা দিয়েছেন রিনা ওহ।
রিনা বলেন, ‘আমি চাই, তাঁরা জানুক যে বিশ্ব তাঁদের কথা ভাবে এবং তাদের শক্ত থাকতে হবে। সরকার বা বিচার বিভাগের ভয়ে ভীত হওয়া যাবে না। আমি জানি, তাদের অনেকেই এখন ভীত। কারণ, তাঁদের নাম প্রকাশ হয়ে গেছে। তারা বহু বছর পরিচয় গোপন রেখেছিলেন। তাদের ধৈর্য ধরে দৃঢ় থাকতে হবে। আমরা এটা করব। আমরা পুরোপুরি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করব।’