
যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী প্রয়াত জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে কংগ্রেস কমিটির সামনে জবানবন্দি দিয়েছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। বলেন, তিনি ‘কিছু দেখেননি’ এবং ‘কোনো অন্যায় করেননি’।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটির সামনে গতকাল শুক্রবার দিনব্যাপী ওই শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
রুদ্ধদ্বার ওই শুনানিতে সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনকে সম্প্রতি প্রকাশিত এপস্টিনের মামলা–সংক্রান্ত নথিপত্রে তাঁর নাম আসার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশ করা ওই নথিপত্রের মধ্যে একটি ছবিতে ক্লিনটনকে অজ্ঞাত পরিচয় এক ব্যক্তির সঙ্গে একই হট টাবে গোসল করতে দেখা যায়।
ক্লিনটনের জবানবন্দি দেওয়ার এক দিন আগে তাঁর স্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনও কংগ্রেস কমিটির সামনে জবানবন্দি দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবারের ওই জিজ্ঞাসাবাদে হিলারি বলেন, এপস্টিনের অপরাধকাণ্ড সম্পর্কে তিনি কিছুই জানতেন না। এ ব্যাপারে তাঁর কোনো ধারণা নেই।
এপস্টিন–সম্পর্কিত নথিতে কারও নাম থাকার অর্থই তিনি কোনো ধরনের অপরাধে জড়িত ছিলেন, এমনটা নয়। এ পর্যন্ত সামনে আসা এপস্টিনের ভুক্তভোগীরাও ক্লিনটনের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অভিযোগ আনেননি।
জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ক্লিনটন প্রাথমিক বিবৃতিতে বলেন, এপস্টিন কী করছিলেন সে সম্পর্কে যদি তাঁর ন্যূনতম ধারণাও থাকত, তাহলে তিনি তাঁর সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতেন এবং কখনোই তাঁর উড়োজাহাজে ভ্রমণ করতেন না।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘তাহলে আমি নিজে তাঁকে ধরিয়ে দিতাম।’
বিল ক্লিনটন ও তাঁর স্ত্রী হিলারি, দুজনেই শুরুতে কমিটির সামনে জবানবন্দি দিতে অস্বীকার করেছিলেন; কিন্তু আইনপ্রণেতারা যখন তাঁদের বিরুদ্ধে ‘কংগ্রেস অবমাননার’ অভিযোগ আনার পদক্ষেপ নেন, তখন তাঁরা রাজি হন।
ক্লিনটনের রুদ্ধদ্বার জিজ্ঞাসাবাদ নিয়ে একটি সূত্র বিবিসিকে বলে, যখন সাবেক প্রেসিডেন্টকে তাঁর হট টাবে বসে থাকার ছবিটি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিকে চিনতেন না বলে দাবি করেন। ক্লিনটনের সঙ্গে হট টাবে বসে থাকা ব্যক্তি একজন নারী বলে ধারণা করা হয়। মার্কিন বিচার বিভাগ তাঁর পরিচয় সুরক্ষিত রাখতে প্রকাশিত নথিতে ওই ব্যক্তির মুখ কালো রঙে ঢেকে দেয়।
ক্লিনটনকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি ওই নারীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন কি না। জবাবে ক্লিনটন বলেন, তিনি এমন কিছু করেননি।
বৃহস্পতিবার কংগ্রেস কমিটির সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার পর হিলারি ক্লিনটন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন; কিন্তু বিল ক্লিনটন কথা বলেননি।
তবে হাউস ওভারসাইট কমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান জেমস কোমার কয়েক ঘণ্টার এই সাক্ষ্যকে ‘খুব ফলপ্রসূ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
কোমার বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট (সাবেক) ক্লিনটন প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন বা প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।’
ক্লিনটনের সাক্ষ্যের ভিডিও ও পুরো ট্রান্সক্রিপ্ট আগামী দিনগুলোতে প্রকাশ করা হবে বলেও জানান কোমার।
জেমস কোমার বিল ক্লিনটন ও তাঁর স্ত্রী হিলারির সাক্ষ্য গ্রহণকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে বর্ণনা করেন এবং বলেন, তাঁরা এ পর্যন্ত কংগ্রেসের সামনে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি (আইনি বা কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড করা প্রশ্নোত্তরপ্রক্রিয়া) হওয়া সর্বোচ্চ পদমর্যাদার দুই কর্মকর্তা।
এর আগে কংগ্রেসের সামনে আরও ছয়জন মার্কিন প্রেসিডেন্ট সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে তাঁদের কাউকেই আইনিভাবে ডেকে পাঠিয়ে আনুষ্ঠানিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি।
যেমন সাবেক প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড ১৯৭৪ সালে স্বেচ্ছায় কংগ্রেসের একটি কমিটির সামনে হাজির হয়েছিলেন, যেন তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে তাঁর ক্ষমা ঘোষণার ব্যাখ্যা দিতে পারেন।
কোমার বলেন, ‘এটি একটি গুরুতর তদন্ত। আমরা মার্কিন জনগণের কাছে প্রকৃত সত্য পৌঁছে দেওয়ার এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখব।’
বিল ক্লিনটনের সাক্ষ্য গ্রহণের সময় উত্থাপিত বিষয়গুলোর মধ্যে একটি ছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এপস্টিনের সম্পর্ক নিয়ে।
হাউসের ডেমোক্র্যাটরা বলেছেন, তাঁর (বিল) সাক্ষ্যে ট্রাম্প সম্পর্কে ‘অতিরিক্ত তথ্য’ উঠে এসেছে, যা নতুন করে বর্তমান প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
কোমার সাংবাদিকদের বলেন, সাক্ষ্য গ্রহণের সময় ক্লিনটনকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ট্রাম্পকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য কমিটির সামনে আনা উচিত কি না।
জবাবে ক্লিনটন বলেন, ‘এটা আপনারাই ঠিক করবেন।’
কোমার বলেন, ক্লিনটনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, এপস্টিনের অপরাধ–কাণ্ডে ট্রাম্পের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তিনি কিছু জানেন কি না। তবে সাবেক প্রেসিডেন্টের দেওয়া নতুন কোনো তথ্য ট্রাম্প সম্পর্কে তাঁর বিশ্বাসে কোনো পরিবর্তন আনেনি বলেও জানান কোমার।
কোমার বলেন, তাঁর (ট্রাম্প) বিরুদ্ধে অভিযোগ অনেক আগেই খারিজ হয়ে গেছে। ট্রাম্প কোনো অসদাচরণে যুক্ত নন।
অন্যদিকে শুক্রবার ক্লিনটনকে জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে ট্রাম্প মুখ খোলেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি হতে দেখতে পছন্দ করছি না।’