
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী পণ্যবাহী জাহাজ থেকে তাঁর দেশ ২০ শতাংশ ফি বা টোল আদায় করবে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের নিজস্ব কর্মকর্তাদের মতেই এ ধরনের ফি আদায় করা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ সামুদ্রিক জলপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই গত সোমবার ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন।
এ জলপথকে কেন্দ্র করে গত এক সপ্তাহে দুই দেশ একে অপরের ওপর কয়েকবার হামলা, পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এ কারণে তাদের মধ্যকার মাসখানেক ধরে চলা যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়েছে।
টোল আদায়ের এ পরিকল্পনা ঘোষণার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, এই জলপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে মার্কিন সামরিক বাহিনী যে নিরাপত্তা দিচ্ছে, তার খরচ উশুল করতেই এ ফি নেওয়া হবে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে এ মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সূত্রপাত। এর পর থেকে ইরান এ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর মাঝেমধ্যেই হামলা চালিয়ে আসছে। বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিজেদের উপকূলের কাছাকাছি পথ ব্যবহারে বাধ্য করতেই ইরান এ কৌশল নিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে নিজেদের পক্ষ থেকে টোল আদায়ের পথ তৈরি করতেই এমনটা করছে তারা।
ট্রাম্প ঠিক কী বলেছেন
টোল আদায়ের এ পরিকল্পনা ঘোষণার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, এই জলপথে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে মার্কিন সামরিক বাহিনী যে নিরাপত্তা দিচ্ছে, তার খরচ উশুল করতেই এ ফি নেওয়া হবে।
হরমুজ প্রণালিতে কোনো টোল আরোপ করা যাবে না। কোনো আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো দেশেরই টোল বা ফি আদায়ের অনুমতি নেই। এটাই বর্তমান আন্তর্জাতিক আইন।মার্কো রুবিও, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘হরমুজ প্রণালি মুক্ত আছে এবং ইরানের সহযোগিতা ছাড়াই এটি মুক্ত থাকবে।’
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘যেকোনো এবং সব ধরনের প্রয়োজনীয় খরচ’ মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র এ ২০ শতাংশ ফি আদায় করবে। এটিকে ন্যায়সংগত হিসেবেও আখ্যায়িত করেন তিনি। সেই সঙ্গে জানান, যুক্তরাষ্ট্র আবার ইরানের বন্দরগুলো অবরোধ করা শুরু করবে।
টোল আদায়ের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবারই প্রথম এমন হুমকি দিলেন না। গত মাসে ইরানের সঙ্গে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি সইয়ের পরও তিনি এমন সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন। যদিও ওই চুক্তির একটি ধারার এমন ব্যাখ্যা তেহরান দিয়েছিল যে হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের কর্তৃত্ব রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাহাজের মালামালের মূল্যের ওপর ২০ শতাংশ ফি আরোপ করা হলে এ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের খরচ দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যেতে পারে।
স্মারকে আরও বলা হয়েছিল, চুক্তি–পরবর্তী ৬০ দিন কোনো দেশই কোনো ধরনের টোল আদায় করতে পারবে না। তবে এর পরের সময়ের জন্য এই ফি আরোপের পথ খোলা রাখা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এ টোল কীভাবে কাজ করবে
এ বিষয় এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এ ২০ শতাংশ ফি কীভাবে হিসাব করা হবে বা কীভাবে আদায় করা হবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প বিস্তারিত কিছু জানাননি। তা ছাড়া তাঁর এ অবস্থান কেন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, সে ব্যাখ্যাও ট্রাম্প বা তাঁর উপদেষ্টারা দেননি।
ট্রাম্প ‘একেবারে ঠিক’ বলেছেন যে যারা এ প্রণালিতে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করবে, তাদের ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিত। তবে ইরানই আসলে এ জলপথের নিরাপত্তা দিচ্ছে।আব্বাস আরাগচি, ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালিতে কোনো টোল আরোপ করা যাবে না। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ‘কোনো আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো দেশেরই টোল বা ফি আদায়ের অনুমতি নেই। এটাই বর্তমান আন্তর্জাতিক আইন।’
একদিকে টোল আদায়ের ঘোষণা এবং অন্যদিকে ইরানের বন্দরগুলো আবার অবরোধের নির্দেশ—সব মিলিয়ে এ যুদ্ধ থামানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সামনে বিকল্প যে ক্রমেই কমে আসছে, তাঁর এ পদক্ষেপগুলোয় সেটিই ফুটে উঠেছে।
জাহাজ চলাচল ও বাজারে এ টোলের সম্ভাব্য প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাহাজের মালামালের মূল্যের ওপর ২০ শতাংশ ফি আরোপ করা হলে এ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের খরচ দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে যেতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহনকারী একটি বড় ট্যাংকারের ক্ষেত্রে এ ফি বাবদ ৩ কোটি ডলারের বেশি বাড়তি খরচ যোগ হতে পারে। ফলে সাধারণ ভোক্তাদের স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি দামের মুখে পড়তে হবে।
অতিরিক্ত খরচের কারণে অবশ্য কিছু বিশ্লেষক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে এ ফি আদৌ কার্যকর হবে কি না।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, ওই অঞ্চলে চলাচলকারী জাহাজ পরিচালনাকারীদের কাছে এ মুহূর্তে ফির আশঙ্কার চেয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আরও বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিই বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্য কোথাও কি এমন টোল চালু আছে
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালাক্কা প্রণালিকে এ ক্ষেত্রে একটি সম্ভাব্য উদাহরণ হিসেবে ধরা যেতে পারে, যা আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়। সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া যৌথভাবে এ জলপথ পরিচালনা করে।
এ জলপথে চলাচলকারী জাহাজগুলো শুধু তখনই ফি দেয়, যখন তাদের নির্দিষ্ট কোনো সেবার প্রয়োজন হয়। যেমন কোনো জাহাজ টেনে নেওয়ার জন্য সাহায্য বা প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশগুলো পার হওয়ার জন্য দিকনির্দেশনার প্রয়োজন হলে তারা ফি দেয়। কিন্তু শুধু এ জলপথ দিয়ে যাতায়াত বা পারাপারে জাহাজগুলোকে কোনো অর্থ দিতে হয় না।
তা ছাড়া মালাক্কা প্রণালির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিও সম্পূর্ণ ভিন্ন। জলপথটি পরিচালনাকারী তিনটি দেশের মধ্যে বড় ধরনের কোনো দ্বন্দ্ব নেই এবং তারা প্রায় ছয় দশক ধরে নিজেদের মধ্যে যেকোনো যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে পেরেছে।
ইরানের প্রতিক্রিয়া কী
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ট্রাম্পের এ ঘোষণার পর একহাত নিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সিদ্ধান্তের তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন যখন নিজেই ইরানের টোল আদায়ের ধারণাকে নাকচ করে দিয়েছিল, তখন ট্রাম্পের নিজের মুখে টোলের ঘোষণা দেওয়াটা বেশ হাস্যকর।
আব্বাস আরাগচি অবশ্য ট্রাম্পের একটি কথার সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, ট্রাম্প ‘একেবারে ঠিক’ বলেছেন যে যারা এই প্রণালিতে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করবে, তাদের ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিত। তবে এ কথা বলার পর আরাগচি দাবি করেন, ইরানই আসলে এ জলপথের নিরাপত্তা দিচ্ছে।
এরপর আরাগচি স্পষ্ট উপহাসের সুরে বলেন, ‘অবশ্য ২০ শতাংশ ফি অনেক বেশি। আমরা ন্যায্য ফি রাখব।’
চলতি যুদ্ধের শুরুর দিকে তেহরান যখন এ জলপথ কার্যকরভাবে বন্ধ করে ফেলেছিল, তখন থেকেই ইরানি কর্মকর্তারা বারবার এ প্রণালি থেকে অর্থ উপার্জনের ইচ্ছা প্রকাশ করে আসছেন।
জানা গেছে, ইরান এবং এ প্রণালির দক্ষিণে অবস্থিত দেশ ওমান যৌথভাবে এ জলপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো থেকে ফি আদায়ের উপায় খুঁজছে। ওমানের এ প্রস্তাব মূলত মালাক্কা প্রণালির আদলে তৈরি করা হয়েছে। তবে এ ফি দেওয়াটা বাধ্যতামূলক নাকি স্বেচ্ছামূলক হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।