হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র। ১০ জুন, ২০২৫
হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র। ১০ জুন, ২০২৫

ট্রাম্পের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন মার্কিন তরুণেরা

প্রত্যাশার চেয়ে বেশি তরুণ ভোটার ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন জানানোয় রিপাবলিকানরা উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন। ট্রাম্পের ‘বিশ্বের ইতিহাসের সেরা অর্থনীতি গড়ার’ মতো চটকদার প্রতিশ্রুতিতে এই তরুণদের অনেকেই ওই সময় প্রভাবিত হয়েছিলেন।

তবে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা যেভাবে কমছে, তাতে রিপাবলিকানদের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। ইউগভ–দ্য ইকোনমিস্টের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই বয়সীদের মধ্যে ট্রাম্পের জনসমর্থন যেখানে ৪৮ শতাংশ ছিল, গত কয়েক মাসে তা কমে ২৫ থেকে ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

লাখ লাখ মার্কিন তরুণ ট্রাম্পের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়াটা অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। কারণ, তিনি তাঁর দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতিই পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

এসব প্রতিশ্রুতির মধ্যে প্রথম দিন থেকেই জিনিসপত্রের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি অন্যতম। তরুণদের কাছে মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সমস্যা, যা অন্য সব ইস্যুকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। তাঁরা খুব করে চেয়েছিলেন, ট্রাম্প সাশ্রয়ী জীবনযাত্রার ওপর মনোযোগ দেবেন। কিন্তু ট্রাম্প সাশ্রয়ী জীবনযাত্রার বিষয়টি বাদ দিয়ে অন্য সব বিষয়ে বাড়তি মনেযোগ দিয়েছেন।

ট্রাম্প এ কাজ না করে ব্যস্ত রয়েছেন হোয়াইট হাউসে তাঁর ৪০ কোটি ডলারের বিলাসবহুল বলরুম নির্মাণ, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (যার কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে) ও শুল্কযুদ্ধ (যা সার্বিক মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে) নিয়ে। রিপাবলিকানদের জন্য দুঃসংবাদ হলো, ৩০ বছরের কম বয়সী ৭৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্পের ভূমিকায় অসন্তোষ জানিয়েছেন।

জো বাইডেনের আমলে অর্থনৈতিক স্থবিরতায় বিরক্ত হয়ে অনেক তরুণ ট্রাম্পের কাছ থেকে বড় কিছু প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের ১৫ মাস পার হওয়ার পর তাঁরা হতাশা বোধ করছেন, বিশেষ করে অর্থনীতির অবনতি তাঁদের ভাবিয়ে তুলছে। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, কর্মসংস্থানের গতি কমেছে এবং আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও উচ্চশিক্ষা—সব ক্ষেত্রেই আগের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে। উপরন্তু তরুণেরা অভিযোগ করছেন, তাঁদের বয়সীদের জন্য শ্রমবাজার এখন অত্যন্ত নাজুক।

তৎকালীন রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক সমর্থক দুই হাত তুলে সমর্থন জানাচ্ছেন। উইসকনসিন, যুক্তরাষ্ট্র। ২ এপ্রিল ২০২৪

তরুণ ভোটার লিজাবেল ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলেন। ভোটারদের মনোভাব নিয়ে কাজ করা মার্কিন প্ল্যাটফর্ম বুলওয়ার্কের ফোকাস গ্রুপে তিনি বলেন, সব কিছু বেশ বিশৃঙ্খল। অনেক মানুষ চাকরি খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন। যা কিছু ঘটছে, সেসব নিয়ে অনেক মানুষই এখন আশাহত।

কেবল অর্থনৈতিক সমস্যাই নয়, ট্রাম্পের স্বৈরাচারী আচরণ এবং অন্তহীন বিশৃঙ্খলাও অনেক মার্কিন তরুণকে ক্ষুব্ধ করেছে। ইরানের বিরুদ্ধে অজনপ্রিয় যুদ্ধ, বড় শহরগুলোয় মুখোশধারী আইসিই (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) সদস্য পাঠানো, নিজেকে যিশুর মতো উপস্থাপন করে ছবি পোস্ট করা, হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইং ভেঙে ফেলা এবং পোপ লিও থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও বিভিন্ন দেশের নেতাদের অপমান করার বিষয়টি তাঁরা ভালোভাবে নিচ্ছেন না।

গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত হার্ভার্ড ইয়ুথ পোল অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র সঠিক পথে এগোচ্ছে। অন্যদিকে ৫৭ শতাংশের মতে, দেশ ভুল পথে চলছে। মাত্র ৩০ শতাংশ তরুণ বিশ্বাস করেন, তাঁরা তাঁদের বাবা-মায়ের চেয়ে আর্থিকভাবে ভালো অবস্থানে থাকতে পারবেন, যা গভীর হতাশার প্রতিফলন।

বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ৩ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বাইডেন ক্ষমতা ছাড়ার সময়কার চেয়েও বেশি। এ জন্য অনেক মার্কিন তরুণ যে হতাশ, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ, ট্রাম্প প্রথম দিন থেকেই মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা এবং জিনিসপত্রের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। গত এক বছরে কফির দাম ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ, গরুর মাংসের দাম ১২ দশমিক ১ শতাংশ ও সবজির দাম ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। হাসপাতালের খরচ ৬ দশমিক ৪ শতাংশ ও বিদ্যুতের দাম ৪ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। আর ইরানে ট্রাম্প বোমা হামলা শুরুর পর থেকে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে ৪৫ শতাংশের বেশি।

তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ডোনাল্ড ট্রাম্প কলেজে পড়াশোনার খরচ সাশ্রয়ী করতে কাজ করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকে টিউশন ফি বেড়েই চলেছে, বিশেষ করে বেসরকারি কলেজগুলোতে। একই সময়ে ট্রাম্প শিক্ষার্থীদের জন্য আর্থিক সহায়তা ব্যাপক কাটছাঁটের চেষ্টা চালাচ্ছেন। এটা কার্যকর হলে মূলত নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

ট্রাম্প স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু সেই ব্যয়ও ক্রমাগত আকাশচুম্বী হচ্ছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাতে যাচ্ছে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘বিগ বিউটিফুল বিল’ এবং ওবামাকেয়ারের নতুন ভর্তুকি বন্ধের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে। এখানে তিনি সফল হলে প্রায় এক কোটি মার্কিন নাগরিক স্বাস্থ্যবিমা হারাবেন। আরও দুই কোটি মানুষের বিমার প্রিমিয়াম গড়ে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাবে, যাঁদের একটি বড় অংশই ৩০ বছরের কম বয়সী তরুণ।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া ক্যাম্পাসে আগাম ভোট দেওয়ার লাইনে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীরা। ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র। ৩০ অক্টোবর, ২০১৮

ডোনাল্ড ট্রাম্প লাখ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিশেষ করে কারখানার সাধারণ শ্রমিকদের জন্য। কিন্তু তরুণ মার্কিনদের একটি অংশ এখন চাকরি পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। অনেকের ক্ষেত্রে তা আতঙ্কের পর্যায়ে চলে গেছে।

আমি এমন অনেক তরুণের বিষয়ে জানতে পেরেছি, যাঁরা ২০০ চাকরির আবেদন করেছেন, কিন্তু ডাক পেয়েছেন মাত্র দু–তিনটি জায়গা থেকে। কখনো কখনো কারও কাছ থেকেই ডাক আসেনি।

ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি মাসে গড়ে ২৬ হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। কর্মসংস্থান তৈরির এই হার জো বাইডেনের মেয়াদের শেষ বছরের তুলনায় চার ভাগের এক ভাগ।

ট্রাম্প যে শুধু লাখ লাখ চাকরি সৃষ্টিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন সেটাই নয়, সাধারণ মার্কিন শ্রমিকদের জন্য আরও খারাপ খবর হলো, তিনি ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে কারখানার ৮২ হাজার চাকরি চলে গেছে।

নিউইয়র্ক টাইমস সম্প্রতি লিখেছে, ডিগ্রিধারী তরুণদের জন্য (চাকরি পাওয়া নিয়ে) মহামারির চরম পর্যায়ের পর থেকে এটাই সবচেয়ে কঠিন সময় যাচ্ছে।

মার্কিন তরুণদের জন্য চাকরির বাজার বাড়াতে ট্রাম্প যে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন, বিষয়টা এমনও নয়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরিস্থিতি তৈরি, অজনপ্রিয় শুল্ক আরোপ এবং লাগাতার বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে তিনি অর্থনীতির বারোটা বাজিয়েছেন।

ব্যবসায় শিক্ষার যেকোনো শিক্ষার্থীই জানেন, যেসব বড় কোম্পানি ব্যবসা বাড়াতে এবং (নতুন কর্মী) নিয়োগ দিতে চায়—তারা নিত্য বিশৃঙ্খলা নয়; বরং একটি স্থিতিশীল পরিবেশ খোঁজে।

মার্কিন তরুণদের অনেকেরই ভয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) লাখ লাখ মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে এবং (নতুন) যাঁরা চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন, তাঁদের জীবনকে কঠিন করে ফেলবে।

অনেক তরুণ যে মনে করেন, দেশ ভুল পথে এগোচ্ছে—এটি তার একটি বড় কারণ তাতে সন্দেহ নেই।

কিন্তু তরুণদের এসব উদ্বেগের বিষয়ে ট্রাম্প উদাসীন।
এআইয়ের কারণে যাঁরা চাকরি হারাতে পারেন, সেসব কর্মীকে রক্ষায় তিনি কোনো চেষ্টা করেননি। উল্টো এআই কোম্পানিগুলোর সম্প্রসারণ এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাহায্য করতে তিনি নিজে যা পারেন, তার সবকিছুই করেছেন।

তরুণ ভোটারদের চিন্তাভাবনা নিয়ে গবেষণা করেন র‌্যাচেল জানফাজা। তিনি দ্য হিল পত্রিকাকে বলেন, ‘মোদ্দাকথা হলো...প্রেসিডেন্ট কি এই দেশের তরুণদের জীবনমান উন্নত করছেন, নাকি করছেন না? অনেক তরুণই মনে করেন, তিনি (ট্রাম্প) তা করছেন না।’

গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইউগভের মতে, ট্রাম্প যখন ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন তরুণদের মধ্যে তাঁর সমর্থন সূচক ছিল প্লাস ফাইভ (+৫)। কিন্তু সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় তা তলানিতে গিয়ে মাইনাস টুয়েন্টি সেভেন (-২৭) থেকে মাইনাস ফোরটি সেভেনে (-৪৭) এসে ঠেকেছে।

ট্রাম্প আরও অনেক প্রতিশ্রুতি ভেঙেছেন। তিনি বলেছিলেন, দেশকে অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবেন না, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম কমিয়ে অর্ধেকে আনবেন এবং ১০ লাখের বেশি শিক্ষানবিশ কাজের (অ্যাপ্রেন্টিসশিপ) সুযোগ বাড়াবেন।

এখন নিঃসন্দেহে অনেক তরুণই হতাশ। কারণ, ট্রাম্প জীবাশ্ম জ্বালানিশিল্পকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে চাঙা করছেন। ফলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।

বিপুলসংখ্যক তরুণের ট্রাম্পের ওপর এভাবে বিতৃষ্ণ হওয়াটা ডেমোক্র্যাটদের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক একটি অগ্রগতি। ফলে ২০২৪ সালে (যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন) কমলা হ্যারিসের পক্ষে তরুণদের যে ভোট পড়েছিল, তার তুলনায় আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে তরুণদের সমর্থন বেশি হবে বলে ধারণা করা যায়।

অনেকেই এখন বুঝতে পারছেন, প্রার্থী হিসেবে ট্রাম্প তরুণদের সাহায্য করার অনেক চটকদার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু সেগুলো পূরণে তিনি বলতে গেলে কিছুই করেননি।

যখন মার্কিন তরুণেরা ট্রাম্পকে নিয়ে ভাবেন, তখন তাঁদের এটা মনে হতে পারে—প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, প্রতিশ্রুতি ভাঙা হয়েছে।

স্টিভেন গ্রিনহাউস একজন মার্কিন সাংবাদিক ও লেখক। তিনি শ্রম, কর্মক্ষেত্র, অর্থনীতি ও আইনি নানা বিষয় নিয়ে লেখেন।