সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিচ্ছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ২০ জানুয়ারি ২০২৬, দাভোস
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিচ্ছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। ২০ জানুয়ারি ২০২৬, দাভোস

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা এখন ‘বিরাট ভাঙনের’ মুখে: দাভোসে কানাডার প্রধানমন্ত্রী

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা ‘বিরাট এক ভাঙনের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটি মূলত শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা এবং বিশ্বজুড়ে নিয়ম-নীতির শাসনের অবক্ষয়ের কারণে ঘটছে।

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে গতকাল মঙ্গলবার বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে রাজনৈতিক ও আর্থিক খাতের প্রভাবশালীদের উদ্দেশ্যে কার্নি এ কথা বলেন। আজ বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেখানে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।

গত বছর রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই কার্নি বারবার সতর্ক করে আসছেন যে বিশ্ব আর আগের অবস্থায় (ট্রাম্প-পূর্ববর্তী স্বাভাবিক সময়ে) ফিরে যাবে না। গতকালকের ভাষণে তিনি সরাসরি ট্রাম্পের নাম না নিলেও বিশ্বরাজনীতিতে এই প্রেসিডেন্টের প্রভাব নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।

কার্নি বলেন, ‘আমরা কোনো পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নয়, বরং বড় ধরনের এক ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’

কার্নি উল্লেখ করেন, কানাডা আগের ‘নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা’ থেকে অনেক সুবিধা পেয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থা সমুদ্রপথ উন্মুক্ত রাখা, স্থিতিশীল আর্থিক ব্যবস্থা, সম্মিলিত নিরাপত্তা ও বিরোধ নিষ্পত্তিতে যে সহায়তা দিত, তা কানাডার জন্য উপকারী ছিল।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন এক নতুন বাস্তবতা শুরু হয়েছে। সহজ কথায় বলতে গেলে, এটি এখন বড় শক্তিগুলোর চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে। এখানে ক্ষমতাধর দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য অন্য দেশকে অর্থনৈতিকভাবে চাপ দেয়।

‘টেবিলে না থাকলে মেনুতে থাকবেন’

বড় বড় শক্তির দেশকে খুশি করার চেষ্টার ব্যাপারে সতর্ক করে কার্নি বলেন, কানাডার মতো দেশগুলো এখন আর এটা আশা করতে পারে না যে সব নিয়ম মেনে চললেই তারা নিরাপদ থাকবে।

কার্নি সরাসরি বলেন, ‘তা হবে না। কানাডার মতো মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য এখন প্রশ্নটা এটা নয় যে আমরা মানিয়ে নেব কি না। আমাদের মানিয়ে নিতেই হবে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু নিজেদের চারপাশে উঁচু দেয়াল তুলে মানিয়ে নেব, নাকি আরও বড় কোনো লক্ষ্য নিয়ে কাজ করব?’

কানাডার প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘মাঝারি শক্তির দেশগুলোকে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। কারণ, আপনি আলোচনার টেবিলে না থাকলে খাবারের মেনুতে পরিণত হবেন (অর্থাৎ বড় শক্তিগুলো আপনাকে গ্রাস করবে)। বড় শক্তিগুলো এখন একা চলার ক্ষমতা রাখে। তাদের বিশাল বাজার, সামরিক শক্তি এবং শর্ত চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আছে। কিন্তু মাঝারি দেশগুলোর তা নেই।’

কানাডা-আমেরিকা উত্তেজনা

কানাডার পত্রিকা গ্লোব অ্যান্ড মেইলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর কার্নি এই ভাষণ দিলেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানাডার সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ‘আগ্রাসন’ মোকাবিলার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা তৈরি করেছে।

সূত্রমতে, কানাডার এই প্রতিরক্ষা মডেলে আফগানিস্তানের যোদ্ধাদের মতো গেরিলা বা বিদ্রোহ-আদলের কৌশলের কথা বলা হয়েছে, যা একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পরবর্তীকালে মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছিল।

২০২৪ সালের নির্বাচনের পর এবং নতুন মেয়াদের শুরুর দিকে ট্রাম্প বারবার কানাডাকে আমেরিকার ‘৫১তম অঙ্গরাজ্য’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছিলেন, দুই দেশের একীভূত হওয়া কানাডার জন্যই ভালো।

সম্প্রতি ট্রাম্পের এ ধরনের কথা কিছুটা কমলেও গতকাল রাতে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি মানচিত্র পোস্ট করেছেন। সেখানে কানাডা ও ভেনেজুয়েলাকে আমেরিকার পতাকায় ঢাকা অবস্থায় দেখা গেছে, যা দিয়ে তিনি এই দুই দেশ দখল করার ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এ ছাড়া গ্রিনল্যান্ডের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ট্রাম্পের হুমকির কারণে এবারের দাভোস সম্মেলনটি কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ডেনমার্কের এই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা থেকে আর পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।