যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের মিনিয়াপোলিসে ফেডারেল ইমিগ্রেশন (আইসিই ও আইস নামে পরিচিত) এজেন্টদের গুলিতে নিহত অ্যালেক্স প্রেটি বন্দুকধারী ছিলেন বলে দাবি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। তারা বলেছে, ৩৭ বছর বয়সী নিবন্ধিত নার্স প্রেটি ফেডারেল কর্মকর্তাদের মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনাস্থলে প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিওতে পুরোপুরি ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে।
গার্ডিয়ানের হাতে আসা একাধিক ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, আইসিই সদস্যরা যখন অ্যালেক্স প্রেটিকে মাটিতে ফেলে জাপটে ধরছিলেন, তখন তাঁর হাতে কোনো বন্দুক ছিল না বরং তিনি একটি মুঠোফোন ধরেছিলেন।
গতকাল শনিবারের এই হত্যাকাণ্ডের পর যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ একটি বন্দুকের ছবি প্রকাশ করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেটিকে ‘বন্দুকধারীর বন্দুক’ বলে উল্লেখ করেন।
হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের মন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েম এক ব্রিফিংয়ে দাবি করেন, প্রেটি ৯ মিলিমিটার আধা স্বয়ংক্রিয় বন্দুক নিয়ে আইসিইয়ের সদস্যদের দিকে গিয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্ডার পেট্রল সংস্থার কমান্ডার গ্রেগ বোভিনো দাবি করেছেন, প্রেটিকে নিরস্ত্র করতে আইসিইয়ের সদস্যরা চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু প্রেটি সহিংসভাবে তা প্রতিরোধ করেন। আত্মরক্ষার্থেই আইসিইয়ের সদস্যরা তাঁর ওপর গুলি চালিয়েছেন।
গার্ডিয়ান এ ঘটনার কয়েকটি ভিডিও পর্যালোচনা করেছে। এতে দেখা গেছে, ভিডিওর দৃশ্যের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বক্তব্য সাংঘর্ষিক।
প্রেটির কাছে বন্দুক রাখার বৈধ অনুমোদন ছিল, তবে ঘটনার সময় তাঁর সঙ্গে বন্দুক ছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার সময় ধারণ করা ভিডিওগুলোতে তাঁর হাতে একবারের জন্যও বন্দুক দেখা যায়নি।
মিনিয়াপোলিসের এক বাসিন্দা গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৫৮ মিনিটের দিকে ঘটনাস্থলে একটি ভিডিও ধারণ করেছিলেন। এ ছাড়া এক দল প্রত্যক্ষদর্শীও তাঁদের ফোনে ভিডিও ধারণ করেন। গার্ডিয়ান এ ভিডিওগুলো হাতে পেয়েছে। এগুলোতে দেখা গেছে, প্রেটি ফোন হাতে সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে ভিডিও করছিলেন। তখন এক কর্মকর্তা তাঁর দিকে এগিয়ে আসেন এবং তাঁকে ধাক্কা দিয়ে পেছনে সরিয়ে দেন। প্রেটি পেছন দিকে সরেছিলেন ঠিকই, তবে তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি অনবরত ওই কর্মকর্তার ভিডিও করে যাচ্ছিলেন।
ঠিক কোন সময় তাঁকে গুলি করা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁকে গুলি করা হয়। কারণ, ৯টা ৩ মিনিটের দিকে মিনিয়াপোলিস পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। মিনিয়াপোলিস পুলিশের প্রধান ব্রায়ান ও’হারা এমন তথ্য দিয়েছেন।
অনুসন্ধানমূলক সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট ড্রপ সাইট নিউজও এক প্রত্যক্ষদর্শীর ধারণ করা ভিডিও হাতে পেয়েছে। ওই প্রত্যক্ষদর্শী প্রেটির পেছনেই দাঁড়ানো ছিলেন। এতে দেখা গেছে, প্রেটি একনাগাড়ে অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ডগুলো ভিডিও করছিলেন। ওই সময় অন্য প্রত্যক্ষদর্শীরা তাঁদের হুইসেল ও হর্ন বাজাচ্ছিলেন, যেন গাড়িগুলো নিরাপদে রাস্তা পার হতে পারে।
একই ভিডিওর উচ্চ রেজোল্যুশনের একটি কপিও যাচাই করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ফেডারেল কর্মকর্তার ধাক্কায় মাটিতে পড়ে যাওয়া একজনকে বাঁচাতে এগিয়ে গিয়েছিলেন প্রেটি। এরপর সেই কর্মকর্তা বারবার প্রেটির দিকে রাসায়নিক স্প্রে ছুড়তে থাকেন। তারপর তিনি এবং আরও দুজন এজেন্ট মিলে প্রেটিকে চেপে ধরে রাস্তার ওপর ফেলে দেন।
অন্য দুই প্রত্যক্ষদর্শীর ধারণ করা আরও দুটি ভিডিও পর্যালোচনা করা হয়েছে। ওই দুই ভিডিওতে একই দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে। একজন ভিডিও ধারণ করেছেন রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে। তাঁর ভিডিওটি হাতে পেয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। আর অন্য ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে রাস্তার ওপারে অবস্থিত গ্ল্যাম ডল ডোনাটসের ভেতর থেকে। এ ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা হয়েছে। দুটি ভিডিওতেই দেখা গেছে, সাতজন এজেন্ট দ্রুত প্রেটিকে ঘিরে ফেলেন। তাঁরা তাঁকে ধরে মাটিতে ফেলে দেন এবং মারতে থাকেন। তখন জিনস আর ধূসররঙা জ্যাকেট পরা এক কর্মকর্তা নিচু হয়ে প্রেটির পেছন দিক থেকে বন্দুকের মতো কিছু একটা বের করে নিয়ে চলে যান। ঠিক সেই সময় একজন এজেন্ট চিৎকার করে বলে ওঠেন, ‘বন্দুক! বন্দুক।’
ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, অ্যালেক্স প্রেটিকে মিনিয়াপোলিসে নিযুক্ত ফেডারেল এজেন্টরা গুলি করে হত্যা করেছেন। প্রথমে একজন এজেন্ট বন্দুক বের করে কাছ থেকে প্রেটির দিকে গুলি চালান। এরপর এজেন্টরা পেছন দিকে সরে যান এবং আরেকজন কর্মকর্তা প্রেটির দিকে বন্দুক তাক করে প্রায় ১০টি গুলি চালান।
সাংবাদিক ইয়োইন হিগিনস বলেন, রাস্তার ওপারের ডোনাটের দোকান থেকে যে ভিডিওটি ধারণা করা হয়েছে, সেটিতে দেখা গেছে, এজেন্টরা প্রেটির কাছ থেকে ‘বন্দুক’ নেওয়ার কয়েক মুহূর্ত পরই তাঁর ওপর গুলি চালিয়েছেন। আইনগতভাবে প্রেটির বন্দুক বহনের অনুমতি থাকলেও পুরো ঘটনার সময় তিনি সেটি হাতে ধরেননি বা তাক করেননি।
এসব ভিডিও প্রমাণে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে ফেডারেল এজেন্টরা এমন একজনকে হত্যা করেছেন, যিনি কেবল তাদের কার্যক্রম ফোনে রেকর্ড করছিলেন। তবুও ব্রিফিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের মন্ত্রী নোয়েমের কণ্ঠে ট্রাম্প প্রশাসনের বয়ানই প্রতিধ্বনিত হলো।
তিনি প্রেটিকে ‘সশস্ত্র সন্দেহভাজন’ বলে উল্লেখ করেছেন। নোয়েম দাবি করেছেন,প্রেটি ফেডারেল এজেন্টদের দিকে এগোনোর সময় অস্ত্র তাক করেছিলেন। অথচ ভিডিও প্রমাণে দেখা গেছে, নোয়ামের দাবিটি মিথ্যা।
গতকাল শনিবার ঘটনার দুই প্রত্যক্ষদর্শী ফেডারেল আদালতে জমা দেওয়া লিখিত জবানবন্দিতে বলেছেন যে তাঁরা প্রেটির কাছে বন্দুক দেখেননি। ওই দুই প্রত্যক্ষদর্শীর একজন চিকিৎসক। তিনি কাছের একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে ঘটনাটি দেখেছিলেন। অপর প্রত্যক্ষদর্শী হলেন এক নারী, যিনি প্রেটির ঠিক পেছন থেকে ভিডিও ধারণ করেছেন। ফেডারেল এজেন্টদের কার্যক্রম নিয়ে মানবাধিকার সংস্থা এসিএলইউ-এর করা মামলায় তাঁরা জবানবন্দি দিয়েছেন।
চিকিৎসক বলেন, ‘আমি তাঁকে এজেন্টদের ওপর হামলা করতে বা কোনো ধরনের অস্ত্র তাক করতে দেখিনি।’ আর ওই নারী প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, প্রেটি এজেন্টদের দিকে বন্দুক নিয়ে এগোননি। তিনি ক্যামেরা নিয়ে এগিয়েছিলেন।