হাসপাতালের প্রতীকী ছবি
হাসপাতালের প্রতীকী ছবি

ক্যানসারের নতুন ইনজেকশন রোগীদের টিউমার পুরোপুরি নির্মূল করছে, পরীক্ষার পর দাবি বিজ্ঞানীদের

ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের শরীর থেকে পুরোপুরিভাবে টিউমার দূর করতে ত্রিমুখী কার্যক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ধরনের ইনজেকশন আবিষ্কারের দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। এ ইনজেকশনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ থেকে যে ফলাফল পাওয়া গেছে, তাকে নজিরবিহীন বলেছেন চিকিৎসকেরা।

১১টি দেশে পরিচালিত একটি আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের (পরীক্ষামূলক প্রয়োগ) অংশ হিসেবে এই ইনজেকশন এমন রোগীদের দেওয়া হয়, যাঁদের ক্যানসার শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল বা আবার ফিরে এসেছিল। অন্য কোনো চিকিৎসায় যাঁদের রোগ উপশম হচ্ছিল না।

অ্যামিভান্টাম্যাব নামের এই ইনজেকশন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নেওয়া এক-তৃতীয়াংশের বেশি রোগীর টিউমারের আকার ছোট করতে সক্ষম হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেছে। এমনকি ১৫ জন রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা দেখতে পান, ওষুধটি তাঁদের টিউমার সম্পূর্ণভাবে গলিয়ে দিয়েছে বা নির্মূল করে দিয়েছে।

গবেষণায় পাওয়া ফলাফল আজ রোববার যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে আমেরিকান সোসাইটি অব ক্লিনিক্যাল অনকোলজির (এএসসিও) বার্ষিক সম্মেলনে উপস্থাপন করার কথা। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্যানসার সম্মেলন।

প্রতি তিন সপ্তাহ পর একবার এ ইনজেকশন দিতে হয়। এর পরীক্ষামূলক প্রয়োগে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার। ১০ জন রোগীর মধ্যে ১ জনের কম রোগীকে চিকিৎসা বন্ধ করতে হয়েছে।

মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত মোট ১০২ জন রোগীকে পরীক্ষামূলকভাবে এই ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। ক্যানসারের যেসব ধরনে মানুষ বেশি আক্রান্ত হয়েছে, তার মধ্যে মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারের অবস্থান ষষ্ঠ।

ফলাফলে দেখা গেছে, ৪৩ জন রোগীর ক্ষেত্রে টিউমার আকারে ছোট হয়েছে বা সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এর মধ্যে ২৮ জনের টিউমার উল্লেখজনকভাবে ছোট হয়েছে এবং ১৫ জন রোগীর ক্ষেত্রে টিউমার পুরোপুরি নির্মূল হয়ে গেছে।

গবেষকেরা বলেছেন, ফুসফুস ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।

জনসন অ্যান্ড জনসন কোম্পানি অ্যামিভান্টাম্যাব নামের ইনজেকশনটি তৈরি করেছে। এখন প্রায় ৬০টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে এ ইনজেকশনের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। মলদ্বারের ক্যানসার, মস্তিষ্কের ক্যানসার এবং পাকস্থলীর ক্যানসার আক্রান্তদের ওপরও এ পরীক্ষা চালানো হচ্ছে।

এই ইনজেকশন ক্যানসারের বিরুদ্ধে তিনভাবে কাজ করে। এটি প্রথমে ইজিএফআর (এপিডার্মাল গ্রোথ ফ্যাক্টর রিসেপ্টর) নামের একটি প্রোটিনকে আটকে দেয়। এ ইজিএফআর টিউমারকে বড় হতে সাহায্য করে। এ ইনজেকশনটি এমইটি নামের একটি পথকেও আটকে দেয়। ক্যানসার কোষগুলো অনেক সময় চিকিৎসা থেকে বাঁচতে এ পথ ব্যবহার করে। তৃতীয়ত, এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে টিউমারের বিরুদ্ধে লড়তে সহযোগিতা করে।

এই চিকিৎসা থেকে উপকার পাওয়া প্রথম দিকের রোগীদের একজন ৫৬ বছর বয়সী কার্ল ওয়ালশ। ২০২৪ সালের মে মাসে তাঁর জিবের ক্যানসার ধরা পড়ে এবং ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তিনি যুক্তরাজ্যের রয়্যাল মার্সডেন হাসপাতালে ওরিগএএমআই–ফোর ট্রায়ালে যোগ দেন।

মাথা ও ঘাড়ের ক্যানসারে আক্রান্ত মোট ১০২ জন রোগীকে পরীক্ষামূলকভাবে এই ইনজেকশন দেওয়া হয়েছিল। ফলাফলে দেখা যায়, ৪৩ জন রোগীর ক্ষেত্রে টিউমার আকারে ছোট হয়েছে বা সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এর মধ্যে ২৮ জনের টিউমার উল্লেখজনকভাবে ছোট হয়েছে এবং ১৫ জন রোগীর ক্ষেত্রে টিউমার পুরোপুরি নির্মূল হয়ে গেছে।

কার্ল বলেন, ‘প্রথমে আমাকে কেমোথেরাপি ও ইমিউনোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেগুলো কাজ করেনি। এরপর আমাকে ওরিগএএমআই–ফোর ট্রায়ালের জন্য সুপারিশ করা হয়। এখন আমি চিকিৎসার ১৭তম সাইকেলে আছি এবং এখন পর্যন্ত যা অগ্রগতি হয়েছে, তা নিয়ে আমি খুবই সন্তুষ্ট।’

অ্যামিভান্টাম্যাব ইনজেকশনটি শিরায় না দিয়ে ত্বকের নিচে ছোট ইনজেকশন হিসেবে দেওয়া হয়। ফলে চিকিৎসা দ্রুত হয় এবং রোগীদের জন্য সুবিধাজনক হয়।

প্রতি তিন সপ্তাহ পর একবার এ ইনজেকশন দিতে হয়। এর পরীক্ষামূলক প্রয়োগে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার। প্রতি ১০ জন রোগীর মধ্যে ১ জনেরও কম রোগীকে চিকিৎসা বন্ধ করতে হয়েছে।

জিবের ক্যানসারে আক্রান্ত কার্ল ওয়ালশ বলেন, ‘এখন আমি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছি। ট্রায়ালে যোগ দেওয়ার আগে ফোলা ও ব্যথার কারণে আমার কথা বলা কঠিন ছিল এবং খেতেও খুব সমস্যা হতো।’

কার্ল ওয়ালশ আরও বলেছেন, চিকিৎসা শুরুর পর তাঁর ফোলা অনেকটা কমে গেছে এবং ব্যথাও অনেক কমে এসেছে। কেমোথেরাপির সময় যে ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল, এখন আর সেগুলো নেই। মাত্র দুই সাইকেল চিকিৎসার পরই তাঁর খাবারের অভ্যাস স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল। ছয় মাস পর থেকে তিনি আবার পুরোপুরি স্বাভাবিক খাবার খেতে পারছেন।