যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন

এপস্টিনের সঙ্গে পরিচয়–সম্পর্ক নিয়ে কংগ্রেস কমিটিকে কী বললেন হিলারি

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন গতকাল বৃহস্পতিবার কংগ্রেস কমিটিকে বলেন, প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর কখনো দেখা হয়েছে বলে তিনি মনে করতে পারছেন না। এপস্টিনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে দেওয়ার মতো কোনো তথ্য তাঁর কাছে নেই।

নিউইয়র্কের চ্যাপাকুয়ায় কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটির কাছে রুদ্ধদ্বার জবানবন্দি দেওয়ার পর হিলারি ক্লিনটন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এপস্টিনের সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়েছে বলে মনে পড়ে না। আমি কখনো তাঁর উড়োজাহাজে চড়িনি বা তাঁর দ্বীপ, বাড়ি অথবা অফিসে যাইনি।’

কমিটির সামনে সাত ঘণ্টা উপস্থিত থাকার পর হিলারি ক্লিনটন সাংবাদিকদের বলেন, সারা দিন তাঁকে বারবার একই প্রশ্ন করা হয়েছে। তবে তিনি তদন্ত পরিচালনার বিষয়ে কিছু পরামর্শও দিয়েছেন। অবশ্য সেগুলোর বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।

কাকতালীয়ভাবে জবানবন্দির শেষের দিকের প্রক্রিয়া সম্পর্কে হিলারি ক্লিনটন বলেন, ‘এটি বেশ অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল। কারণ, আমাকে ইউএফও ও ‘পিৎজাগেট’–সংক্রান্ত একগুচ্ছ প্রশ্ন করা শুরু হয়, যা অন্যতম জঘন্য ও বানোয়াট এক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব।’

হিলারি ক্লিনটন ২০১৬ সালে ছড়িয়ে পড়া সেই মিথ্যা প্রচারের কথা উল্লেখ করেন, যাতে দাবি করা হয়েছিল, ওয়াশিংটন ডিসির একটি পিৎজা রেস্তোরাঁ, যা তাঁর (হিলারি) মাধ্যমে পরিচালিত একটি শিশু যৌন চক্রের আস্তানা ছিল। নিউইয়র্ক পুলিশ ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যুক্ত একটি পেডোফিলিয়া (শিশু যৌন নির্যাতন) চক্রের সন্ধান পেয়েছে।

২০১৬ সালের ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ক্লিনটন তাঁর লিখিত বক্তব্যে রিপাবলিকান নেতৃত্বাধীন কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন, তারা ট্রাম্পের সঙ্গে এপস্টিনের সম্পর্ক থেকে মানুষের নজর সরানোর চেষ্টা করছে।

যৌন পাচার মামলায় বিচারের অপেক্ষায় থাকাকালে ২০১৯ সালে জেফরি এপস্টিন কারাগারে আত্মহত্যা করেন। হিলারি আরও উল্লেখ করেন, ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক যৌন পাচার রোধে কাজ করা পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি বিভাগকে ‘দুর্বল’ করে দিয়েছে।

হিলারি ক্লিনটনের জবানবন্দির পর কমিটির চেয়ারম্যান জেমস কোমার ট্রাম্পকে কমিটির সামনে হাজির করার ধারণাটি নাকচ করে দেন। কেন্টাকির এই রিপাবলিকান নেতা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আপনাদের (সাংবাদিকদের) কাছে এপস্টিন সম্পর্কে শত শত না হলেও হাজার হাজার প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। আমার মনে হয়, তিনি নথিপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত স্বচ্ছ ছিলেন।’

হিলারি ক্লিনটন ও তাঁর স্বামী সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন শুরুতে কমিটির সামনে জবানবন্দি দিতে অস্বীকার করেছিলেন। কিন্তু আইনপ্রণেতারা যখন তাঁদের বিরুদ্ধে ‘কংগ্রেস অবমাননার’ অভিযোগ আনার পদক্ষেপ নেন, তখন তাঁরা রাজি হন।

আজ শুক্রবার কমিটির কাছে বিল ক্লিনটনের জবানবন্দি দেওয়ার কথা রয়েছে। হিলারি সাংবাদিকদের বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট (বিল ক্লিনটন) কমিটিকে জানাবেন, ২০০৮ সালে অপরাধ স্বীকার করার আগে এপস্টিনের সংস্পর্শে আসা ‘বিপুলসংখ্যক’ মানুষ তাঁর এই যৌন পাচার সম্পর্কে ‘জানতেন না’। হিলারি বলেন, ‘আমার স্বামী আগামীকাল ঠিক এই সাক্ষ্যই দেবেন।’

শুনানির আগে কোমার এই তদন্তকে কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট উদ্যোগ নয় বলে দাবি করে বলেন, বেশ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট সদস্যও ক্লিনটন দম্পতির সাক্ষ্য নিতে চাপ দিয়েছিলেন। কোমার বলেন, ‘ক্লিনটন দম্পতি অন্যায় করছেন, এই মুহূর্তে কেউ এমন অভিযোগ করছেন না। তবে আমাদের কাছে অনেক প্রশ্ন রয়েছে।’

কোমার বলেন, এপস্টিনের সঙ্গে হিলারির কোনো যোগাযোগ ছিল কি না, ক্লিনটন দম্পতির দাতব্য কাজে এপস্টিনের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না এবং বর্তমানে কারাবন্দী এপস্টিনের সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না—কমিটি এসব জানার চেষ্টা করবে।

রিপাবলিকান এই নেতা আরও বলেন, ক্লিনটন দম্পতির সাক্ষাৎকারের প্রতিলিপি ও ভিডিও জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।

কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়া সাংবাদিকদের বলেন, ট্রাম্প ও বাণিজ্যসচিব হাওয়ার্ড লুটনিকেরও সাক্ষ্য দেওয়া উচিত। লুটনিক স্বীকার করেছেন, এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কয়েক বছর পরেও তিনি তাঁর ব্যক্তিগত দ্বীপে গিয়েছিলেন।

কোমার বলেন, কমিটি লুটনিককে তলব করার ‘সম্ভাবনা’ রয়েছে।

নিখোঁজ ফাইল

গার্সিয়া ও অন্যান্য ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি অভিযোগ করছেন, ট্রাম্পের বিচার বিভাগ এপস্টিন–সংক্রান্ত ৩০ লাখ নথিপত্রের মধ্য থেকে কিছু তথ্য বেছে বেছে লুকিয়ে রাখছে, যাতে ট্রাম্পকে সমালোচনা থেকে রক্ষা করা যায়।

গার্সিয়া অভিযোগ করেন, এর মধ্যে এমন এক নারীর রেকর্ড রয়েছে, যিনি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে নাবালিকা থাকাকালে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এনেছিলেন।

গার্সিয়া প্রশ্ন করেন, ‘এসব ফাইল কোথায়? কে এগুলো সরিয়ে ফেলেছে? এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।’

বিচার বিভাগ জানিয়েছে, কোনো নথি অনুচিতভাবে আটকে রাখা হয়েছে কি না, তা তারা খতিয়ে দেখছে। উপযুক্ত মনে হলে সেগুলো প্রকাশ করা হবে। এর আগে তারা সতর্ক করেছিল, প্রকাশিত নথিপত্রের মধ্যে ট্রাম্প সম্পর্কে ভিত্তিহীন অভিযোগ ও চাঞ্চল্যকর দাবি রয়েছে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এপস্টিনের সঙ্গে ট্রাম্পের অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতার কোনো অভিযোগ আনেনি। ২০০৮ সালে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের যৌনতায় প্ররোচিত করার দায়ে দণ্ডিত হওয়ার আগে ১৯৯০ ও ২০০০–এর দশকে ট্রাম্পের সঙ্গে এপস্টিনের ব্যাপক মেলামেশা ছিল।

কোমার বলেন, কমিটির সংগ্রহ করা নথিপত্রে ট্রাম্পের কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।

বিল ক্লিনটন অফিস ছাড়ার পর ২০০০–এর দশকের শুরুতে কয়েকবার এপস্টিনের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে ভ্রমণ করেছিলেন। তিনি কোনো অন্যায় করেননি বলে দাবি করেছেন। এপস্টিনের সঙ্গে মেলামেশার জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন।

কোমারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্লিনটন যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন এপস্টিন ১৭ বার হোয়াইট হাউসে গিয়েছিলেন।

বিচার বিভাগ বিল ক্লিনটনের কিছু ছবি প্রকাশ করে নজর কাড়লেও এতে লুটনিক ও টেসলার সিইও ইলন মাস্কসহ আরও অনেক ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে এপস্টিনের সম্পর্কের বিষয়টিও প্রকাশ পেয়েছে।