
সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরী। গত শুক্রবার এ নগরী একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হলো। এদিন এখানেই পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেছে। ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নামে এটা পরিচিত। অবাক করার বিষয়, এ নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।
নতুন এ চুক্তি নিয়ে গতকাল শনিবার পর্যন্ত ওয়াশিংটন একেবারেই নিশ্চুপ ছিল। বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, এ চুক্তির প্রভাব এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, তবে প্রভাব কয়েকটি পর্যায়ে পড়তে পারে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের ওপরও।
আবার অনেকে মনে করছেন, যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। কয়েক দশকের মধ্যে এ চুক্তি অঞ্চলটিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। চুক্তিটি এমন একসময়ে সই হলো, যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। একই সময় লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইসরায়েল আগ্রাসী সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে।
চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, জোটের কোনো একটি দেশের ওপর হামলা হলে, সেটিকে চুক্তিভুক্ত সব দেশের ওপর হামলা বলে বিবেচনা করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর চুক্তির আর্টিকেল-৫–এর সঙ্গে এ অঙ্গীকারের মিল রয়েছে।
বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, তিন দেশের এ যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদেশগুলোর বাড়তে থাকা অনাস্থার প্রতিফলন ঘটেছে। তাঁদের মতে, মার্কিন প্রশাসনের অপ্রত্যাশিত ভূমিকার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নতুন করে সাজাতে চাইছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
আবার অনেকে বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড এ প্রতিরক্ষা চুক্তির পরিবেশ তৈরি করেছে ঠিকই। তবে চুক্তিটি ওয়াশিংটনের কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে মিত্রদের আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছে। বিশ্লেষকদের অনেকে একমত হয়েছেন, অদূর ভবিষ্যতে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এ প্রতিরক্ষা চুক্তির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে। আর এটি আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য সই হওয়া ‘আব্রাহাম চুক্তি’ বাস্তবায়নের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।
চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো একটি দেশের ওপর হামলা হলে সেই হামলাকে চুক্তিভুক্ত সব দেশের ওপর হামলা বলে বিবেচনা করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটোর চুক্তির আর্টিকেল-৫–এর সঙ্গে এর মিল রয়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্য নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, ইসরায়েলের সঙ্গে এ অঞ্চলের দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো। নিজের প্রথম মেয়াদ থেকেই এ নীতিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছেন ট্রাম্প। এ নীতির অন্যতম ভিত্তি হলো আব্রাহাম চুক্তি। আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে এরই মধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েকটি আরব দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা হয়েছে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো সিনা তুসি মনে করেন, তিন দেশের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা।
আল-জাজিরাকে সিনা তুসি বলেন, মজার বিষয় হলো আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিজেদের পক্ষে নেওয়ার আশা নিয়ে (ইরানের বিরুদ্ধে) যুদ্ধ শুরু করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সেই সঙ্গে আব্রাহাম চুক্তির মতো উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যকে একীভূত করার প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়াও ছিল তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
এই বিশ্লেষক বলেন, কিন্তু যুদ্ধের মধ্যে অন্যতম বড় ঘটনাগুলোর একটি হলো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম শক্তি নিজেদের বৃহত্তর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বৃদ্ধির জন্য একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পাকাপাকি উদ্যোগ নিয়েছে।
চুক্তির মূলবার্তা
তিন দেশের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। শুক্রবার একটি যৌথ বিবৃতিতে শুধু চুক্তির শর্তগুলো তুলে ধরা হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ চুক্তির মূল অঙ্গীকার হলো সই করা দেশগুলোর মধ্যে যেকোনো একটি আক্রান্ত হলে তা বাকি দেশগুলোর ওপর হামলা বলে বিবেচনা করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত এ অঙ্গীকার বাস্তবে পরীক্ষা করা হয়নি।
নতুন এ চুক্তি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সই হওয়া একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ওই চুক্তিতেও একই ধরনের একটি অঙ্গীকার রয়েছে।
রিয়াদ, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলছেন, শুক্রবার সই হওয়া ত্রিপক্ষীয় চুক্তিটি অন্য কোনো জোটের বিকল্প নয়। বরং এটি বিদ্যমান জোটগুলোর পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, তিনটি দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার হলেও তাদের নিজস্ব স্বার্থ আলাদা। কখনো কখনো এসব স্বার্থের মধ্যে পার্থক্যও রয়েছে।
সৌদি আরব জানিয়েছে, এ চুক্তির লক্ষ্য ‘কোনো সামরিক অক্ষ কিংবা সাম্প্রদায়িক-ধর্মীয় জোট’ গঠন করা নয়। চুক্তিটি উপসাগরীয় অঞ্চল, আরব বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সৌদি আরবের কৌশলগত ও শক্তিশালী সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ব্যাপক হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এর পর থেকে তেহরানের পাল্টা হামলার অন্যতম নিশানা হয়েছে সৌদি আরব। এমনকি ইরাক থেকে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এবং ইয়েমেনের হুতিরা বিভিন্ন সময় সৌদি আরবের ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্টের দপ্তরের যোগাযোগ বিভাগ জানায়, তিনটি দেশের সই করা নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিটি ৩২ দেশের সামরিক জোট ন্যাটোতে তুরস্কের সদস্যপদের বিকল্প কিছু নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এ চুক্তির সঙ্গে ন্যাটোর কোনো প্রতিশ্রুতির সরাসরি বিরোধ এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। তবে একাধিক জায়গায় একসঙ্গে সংঘাত বাড়লে শেষ পর্যন্ত সম্পদের বণ্টনের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী রয়েছে তুরস্কের। দেশটির কাছে উন্নত সামরিক প্রযুক্তিও রয়েছে।
সৌদি আরব এ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় নিজেদের বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে চুক্তিতে সই করা তিনটি দেশের মধ্যে একমাত্র পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তিমত্তা রয়েছে।
তিন দেশের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা।সিনা তুসি, সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো
মিত্রদের দূরে ঠেলে দেওয়া
এ প্রতিরক্ষা চুক্তি আঞ্চলিক কৌশলে কোনো পরিবর্তন আনছে না, বারবার এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, নতুন এ জোটের সঙ্গে ন্যাটোর প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের মাঝেমধ্যে কঠোর মনোভাব দেখানো এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতা থেকে সরে আসার প্রবণতার একটা সম্পর্ক রয়েছে।
এমন মনোভাবে বিশ্বাসী বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে মিত্রদেশগুলোর ওপর ওয়াশিংটনের কৌশলগত প্রভাব দুর্বল হওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত। যদিও পরিবর্তনটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
এ বিষয়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কিলোওয়েন গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সাবেক নৌ কর্মকর্তা হারলান উলম্যান আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য উপসাগর, ন্যাটো ও এশিয়ার মিত্রদের সঙ্গে আমাদের জোটগত সম্পর্কের ভিত্তি একেবারে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।’
উলম্যান আরও বলেন, ‘কতটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে, তা এখনই বলা কঠিন, তবে সম্পর্ক ভেঙে পড়েনি। বিষয়টি নিয়ে আমাদের এখনই উদ্বিগ্ন হওয়া দরকার।’
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল মূলত সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বিনিময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা আশা করে। ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) প্রতিষ্ঠার পর এ কৌশল আরও জোরাল হয়।
পরে ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন হামলার সময় নিরাপত্তা নিশ্চয়তার প্রত্যাশা আরও বিস্তৃত হয়। ওয়াশিংটন তখন এ অভিযানকে তাদের তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধের’ অংশ হিসেবে দেখেছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের ১৯টি সামরিক স্থাপনা ও ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০ হাজার সেনা রয়েছেন। তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এ ছাড়া সৌদি আরব, ওমান, জর্ডান, ইরাক ও ইসরায়েলের বিভিন্ন ঘাঁটিতে মার্কিনদের উপস্থিতি রয়েছে।
এ অঞ্চলের কাতার, বাহরাইন, জর্ডান, সৌদি আরব, কুয়েত ও মিসরকে ‘ন্যাটো–বহির্ভূত অন্যতম মিত্র’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ওয়াশিংটন। এর মধ্য দিয়ে দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝা যায়। পাকিস্তানও যুক্তরাষ্ট্রের এমন প্রধান মিত্রদের একটি। তবে সমালোচকেরা বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ এসব সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছে।
কিংস কলেজ লন্ডনের যুদ্ধ অধ্যয়নবিষয়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ ফেলো নওয়াফ ওবাইদ বলেন, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের এ চুক্তি ‘যুক্তরাষ্ট্রের নকশায় গড়ে ওঠা আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা’ থেকে সরে আসার সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত।
আল-জাজিরায় লেখা এক কলামে নওয়াফ ওবাইদ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে চলমান এ পরিবর্তন আরও দ্রুত হয়েছে।’
এ চুক্তির মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদেশগুলোর বাড়তে থাকা অনাস্থার প্রতিফলন ঘটেছে। তাদের মতে, মার্কিন প্রশাসনের অপ্রত্যাশিত ভূমিকার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা নতুন করে সাজাতে চাইছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
নওয়াফ আরও বলেন, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি থাকায় ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে এসব দেশ হামলার নিশানা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সেনা অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকেও সম্পর্ক শিথিল হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও জো বাইডেনের আমলে ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্য থেকে মনোযোগ সরানোর চেষ্টা করেছে। পরিবর্তে চীন ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে প্রকাশিত ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্রেও মধ্যপ্রাচ্যকে খুব সামান্যই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নওয়াফ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহযোগিতা, সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি আর অর্থনৈতিক প্রভাব এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী, তবে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি ধীরে ধীরে কমবে।
নওয়াফ লেখেন, শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কারণ, এসব ঘাঁটি কৌশলগত গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফেলো আসলি আইদিনতাশবাসের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনেরও মধ্যপ্রাচ্য থেকে মনোযোগ সরানোর ইচ্ছা আছে। তবে এর অর্থ এ নয় যে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হবে। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে পাঁচ মাস ধরে চেষ্টা চলছে, তা বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। এ কারণে নিকট ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।
এ বিশ্লেষক আরও বলেন, ‘এখন মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি যুদ্ধ চলছে। এটা যুক্তরাষ্ট্রের সেনা বা সামরিক প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করার সময় নয়। অন্যদিকে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধসক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও আমরা দেখেছি। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ওপর হামলা চালিয়েছে তেহরান। সামরিকভাবে দুর্বল অবস্থানে থেকেও ইরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর ক্ষতি করার সক্ষমতা ধরে রেখেছে।’
তিন দেশের নতুন এ নিরাপত্তা চুক্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মিত্রদের আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন, এমন কয়েকজন বিশ্লেষকের একজন আসলি।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, এমন খবরে ট্রাম্প প্রশাসনকে বারবার চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। একই সময়ে মিত্রদের সামরিক ব্যয় বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটন। বিশেষ করে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে বলা হয়েছে।
আসলি বলেন, ‘নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তিন ঘনিষ্ঠ মিত্রের মধ্যে সই হওয়া এমন একটি চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন হবে বলে আমি মনে করি না। বরং এটা ট্রাম্প প্রশাসনের মিত্রদের মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি ও আঞ্চলিকভাবে নিজেদের সমস্যা সমাধানের ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
চুক্তির শর্ত মেনে, সৌদি আরবের ওপর হামলা হলে তুরস্ক বা পাকিস্তান সত্যিই হুতিদের কিংবা ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালাবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আসলি। তিনি বলেন, ‘চুক্তিটির কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারাও সেটা ভালোভাবেই জানেন।’
রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (আরইউএসআই) মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নিরাপত্তা গবেষণার জ্যেষ্ঠ ফেলো বুরচু ওজচেলিক বলেন, এ চুক্তিকে ‘যুক্তরাষ্ট্র-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের’ উদাহরণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, এটি আঞ্চলিকভাবে আরও বেশি দায়িত্ব ভাগাভাগির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর পছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের এ চুক্তি ‘যুক্তরাষ্ট্রের নকশায় গড়ে ওঠা আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা’ থেকে সরে আসার সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত।নওয়াফ ওবাইদ, কিংস কলেজ লন্ডনের যুদ্ধ অধ্যয়নবিষয়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ ফেলো।
আব্রাহাম চুক্তি নিয়ে বার্তা
যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিটি অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না। তবে এর মধ্য দিয়ে আব্রাহাম চুক্তির আওতায় ইসরায়েলের সঙ্গে এ অঞ্চলের দেশগুলোর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে একটি জোরাল (নেতিবাচক) বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের কূটনৈতিক নীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, এ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও মরক্কোকে আব্রাহাম চুক্তিতে যুক্ত করার উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি। গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ এ উদ্যোগের সাম্প্রতিক অগ্রগতি থামিয়ে দিয়েছে।
এর আগেও আব্রাহাম চুক্তির সমালোচনা হয়েছে। সমালোচকেরা বলেন, এতে ফিলিস্তিনিদের শান্তি ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়েছে।
সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম বড় লক্ষ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আব্রাহাম চুক্তির বিস্তৃতির সম্ভাবনা তিন দেশের প্রতিরক্ষা চুক্তিটি কঠিন করে তুলতে পারে।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক অ্যালেক্স আলফিরাজ শিয়ার্স বলেন, সৌদি আরবের কাছে পারমাণবিক চুল্লি বিক্রির আলোচনা করছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরে এতে আব্রাহাম চুক্তিতে রিয়াদের যোগ দেওয়ার শর্তজুড়ে দেন ট্রাম্প। ফলে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আলফিরাজ শিয়ার্স বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন বললেন, সৌদি আরবের সঙ্গে পারমাণবিক সহযোগিতার বিষয়টি রিয়াদের আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ওপর নির্ভর করছে, তখন উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।
আলফিরাজ শিয়ার্স আরও বলেন, এর মাধ্যমে দেখা গেল, আব্রাহাম চুক্তিকে এখন চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ফেলো আসলি বলেন, তিন দেশের যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির ফলে আব্রাহাম চুক্তি নিয়ে রিয়াদের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে যে ফিলিস্তিন সংকটের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সৌদি আরব আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেবে না।
অনুবাদ: অনিন্দ্য সাইমুম ইমন