যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যকে দ্রুত সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন সিনেটর। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধের ওপর ‘নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন’।
ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ধারাবাহিক কয়েকটি পোস্টে এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, এই যুদ্ধ ইতিমধ্যে পুরো অঞ্চলকে সহিংসতার এক ভয়াবহ চক্রে নিক্ষেপ করেছে।
মারফি লিখেছেন, ‘এটি এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, ট্রাম্প এই যুদ্ধের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। ইরানের পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা সম্পর্কে তিনি মারাত্মক ভুল ধারণা পোষণ করেছিলেন। পুরো অঞ্চল এখন জ্বলছে।’
মারফি বলেন, প্রথম সংকটটি হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে। এটি একটি সরু নৌপথ যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের ২০ শতাংশেরও বেশি পরিবাহিত হয়।
মারফি সতর্ক করে বলেছেন যে, এই নৌপথটি অচল করে দেওয়ার বিষয়ে তেহরানের সক্ষমতাকে ওয়াশিংটন অবমূল্যায়ন করেছে। তিনি লিখেছেন, ‘ট্রাম্প বিশ্বাস করেছিলেন যে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করবে না। তিনি ভুল ছিলেন। আর এখন তেলের দাম আকাশচুম্বী হচ্ছে।’
সিনেটর বলেন, ইরানের ড্রোন, স্পিডবোট এবং সামুদ্রিক মাইনের ব্যবহার এই জলপথটিকে সুরক্ষিত রাখা অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে। তিনি আরও যোগ করেন যে, এসব অস্ত্র ‘নির্মূল করা সম্ভব নয়। এগুলো সংখ্যায় অনেক বেশি, সবখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে এবং লুকানো।’
মারফি বলেন যে, এই প্রণালির মধ্য দিয়ে তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাওয়া মার্কিন নৌবাহিনীকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
মারফি বলেন, দ্বিতীয় সংকটটি তৈরি হয়েছে আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহে ড্রোনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা থেকে। ইরান এই অঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলোতে অনির্দিষ্টকাল ধরে হামলা চালিয়ে যেতে পারে, কারণ তাদের কাছে প্রচুর পরিমাণে সস্তা ও অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ড্রোন রয়েছে।
মারফি পারস্য উপসাগরে সাম্প্রতিক হামলাগুলোর কথা উল্লেখ করেন যা জাহাজ চলাচল এবং জ্বালানি উৎপাদন ব্যাহত করেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, ইউক্রেন যুদ্ধ ইতিমধ্যে দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে ড্রোন আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহের ধরন বদলে দিয়েছে।
মারফি বলেন, ‘ট্রাম্প যদি ইউক্রেন যুদ্ধের দিকে সামান্যতম মনোযোগ দিতেন, তবে তিনি লক্ষ্য করতেন যে যুদ্ধকৌশল কতটা বদলে গেছে। কিন্তু তিনি তা করেননি। আর এভাবেই তিনি চরম ভুল করেছেন।’
এদিকে পুরো অঞ্চলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো এখন প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে। যুদ্ধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়ানোর সাথে সাথে ইসরায়েল ইতিমধ্যে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছে যে, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ব্যবস্থা মজুত ফুরিয়ে আসছে।
মারফি বলেন যে, এই সংঘাত ভৌগোলিকভাবেও বিস্তৃতি লাভ করছে।
এই মার্কিন সিনেটর লিখেছেন, ‘একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে কারণ লেবাননে অবস্থিত ইরানের মিত্ররা (প্রক্সি) ইসরায়েলে এবং ইরাকের গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে। ইসরায়েল এখন লেবাননে বড় ধরনের স্থল অভিযানের হুমকি দিচ্ছে, যা নিজেই একটি নতুন সংকটে পরিণত হতে পারে।’
তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, অন্যান্য রণাঙ্গনগুলোও শিগগিরই জ্বলে উঠতে পারে।
মারফি আরও লিখেছেন, ‘এখন পর্যন্ত ইয়েমেনের হুতিরা তুলনামূলক শান্ত আছে। তবে সম্ভবত এটি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তারা লোহিত সাগরে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে সক্ষম।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা গণহত্যা শুরু হওয়ার পর থেকে, এর প্রতিবাদে হুতিরা সেই রুটের বেশিরভাগ অংশই বন্ধ করে দিয়েছিল।
মারফি বলেছেন যে, সিরিয়াও পুনরায় সহিংসতার কবলে পড়তে পারে। সিরিয়ার জন্য, ইরানের ওপর ট্রাম্পের আঘাত হানার এটিই সবচেয়ে খারাপ সময়। সিরিয়া আবারও বিস্ফোরিত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, শেষ সংকটটি হলো এই যুদ্ধ শেষ করার কোনো পরিকল্পনার অনুপস্থিতি। তিনি উল্লেখ করেন যে, ‘ট্রাম্পের কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। ইরান এবং দেশটি সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অনির্দিষ্টকাল ধরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে যেতে পারে।’
মারফি বলেন, বিজয় ঘোষণা করে সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়াও সমস্যার সমাধান করবে না।
মার্কিন এই সিনেটর লিখেছেন, ‘মিথ্যা বিজয় ঘোষণা করবেন? এরপর ক্ষমতায় থাকা ইরানের নতুন কট্টরপন্থীরা স্রেফ আমাদের ধ্বংস করা সবকিছু আবার নতুন করে গড়ে তুলবে।’
তিনি পরিশেষে এই যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।
মারফি আরও লিখেছেন, এসবের প্রতিটি বিষয়ই সম্পূর্ণভাবে অনুমানযোগ্য ছিল। সত্যি বলতে, ঠিক এই কারণেই পূর্ববর্তী কোনো প্রেসিডেন্ট এমন যুদ্ধ শুরু করার মতো বোকামি করেননি।"
মারফি বলেন, ‘ট্রাম্প যুদ্ধের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন। এখন তার জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমান কাজ হবে নিজের ক্ষতি স্বীকার করে নিয়েই এটি বন্ধ করা। একটি আরও বড় ধরনের বিপর্যয় ঠেকানোর এটাই একমাত্র পথ।’