
তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শোক ও দাফন অনুষ্ঠানের মধ্যেই এক তীক্ষ্ণ মন্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘ইরানকে এক সপ্তাহের ছুটি দিয়েছে’।
গতকাল শুক্রবার এক বক্তৃতায় ট্রাম্পের দেওয়া এ বক্তব্যকে ইরানের প্রতি একটি বড় ধরনের কটাক্ষ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনা ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে ‘এক সপ্তাহের ছুটি’ দেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তবে ইরানের নেতৃত্ব এবং দেশটির পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে নিজের কঠোর অবস্থানের কথা জানান দিতেই তিনি এ মুহূর্তটিকে বেছে নেন।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস ৪ জুলাইয়ের উদ্যাপন উপলক্ষে সাউথ ডাকোটার মাউন্ট রাশমোরে আয়োজিত এক সমাবেশে ট্রাম্প বক্তব্য দিচ্ছিলেন। সেখানে তিনি ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রসঙ্গ টানেন এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির বিরুদ্ধে তাঁর প্রশাসনের নেওয়া সামরিক পদক্ষেপের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা, পারমাণবিক নীতি এবং সামরিক অবস্থান নিয়ে যখন দুই দেশের মধ্যে প্রতিনিয়ত বাদানুবাদ চলছে, ঠিক তখন ট্রাম্প এ মন্তব্য করলেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে ‘এক সপ্তাহের ছুটি’ দেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তবে ইরানের নেতৃত্ব এবং দেশটির পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে নিজের কঠোর অবস্থানের কথা জানান দিতেই তিনি এ মুহূর্তটিকে বেছে নেন।
সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা ইরানের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি। ওরা এখন একটি সমঝোতায় আসার জন্য ভীষণ মরিয়া হয়ে উঠেছে। আমরা জানাজার জন্য ওদের এক সপ্তাহের ছুটি দিয়েছি।’
আমরা ইরানের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি। ওরা এখন একটি সমঝোতায় আসার জন্য ভীষণ মরিয়া হয়ে উঠেছে। আমরা ওদের জানাজার জন্য এক সপ্তাহের ছুটি দিয়েছিডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপনের অংশ হিসেবে সাউথ ডাকোটার বিখ্যাত গ্রানাইট পাথরের পাহাড় মাউন্ট রাশমোরে বক্তব্য রাখছিলেন ট্রাম্প। পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা যুক্তরাষ্ট্রের চারজন সাবেক প্রেসিডেন্টের ভাস্কর্যের জন্য স্থানটি সুপরিচিত।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে ইরান যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের শুরুর দিকেই নিহত হন খামেনি। তাঁর মৃত্যুর পর ইরানজুড়ে সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোক ও দাফন অনুষ্ঠান শুরুর পরপরই ট্রাম্পের এ মন্তব্য সামনে এল।
ওই হামলায় দীর্ঘদিন ধরে ইরানের দায়িত্বে থাকা এ সর্বোচ্চ নেতার পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যও প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে তাঁর কন্যা, জামাতা, ১৪ মাস বয়সের নাতনি এবং পুত্রবধূ ছিলেন।
ইসলামী রীতি অনুযায়ী সাধারণত মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাফন করার নিয়ম থাকলেও, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং উচ্চ নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণে ইরানি কর্তৃপক্ষ জানাজা পিছিয়ে দেয়। গত মাসে একটি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর এ বিদায় অনুষ্ঠানের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়।
রাজনৈতিক বাগ্যুদ্ধ তুঙ্গে
ট্রাম্পের এ মন্তব্য সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দুই দেশের মধ্যে চলমান বাদানুবাদকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে চলমান রাজনৈতিক মেরুকরণকেই স্পষ্ট করে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী হাওয়া যত গরম হবে, তেহরানের প্রতি দেশটির নীতি কেমন হওয়া উচিত—তা নিয়ে মার্কিন রাজনীতিকদের মধ্যে বাগ্যুদ্ধ ও বিতর্ক তীব্র রূপ নেবে।
আমাদের শহীদ নেতা এবং জাতির সব শহীদের রক্তের মূল্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই চড়া দামে দিতে হবেআমির হাতামি, ইরানের সেনাপ্রধান
তেহরানে লাখো মানুষের ঢল
তেহরানে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজা সর্বস্তরের মানুষের ব্যাপক নজর কেড়েছে। এ শোক অনুষ্ঠানে দেশটির সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি লাখো সাধারণ মানুষ অংশ নিচ্ছেন।
ইরানের জন্য এটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল রাজনৈতিক মুহূর্ত। এই সময়ে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের দেওয়া বার্তাগুলোর ওপর পুরো মধ্যপ্রাচ্য কড়া নজর রাখছে।
উত্তেজনার মধ্যেই প্রতিশোধের ডাক
রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি প্রাথমিক চুক্তি হয়েছে। তা সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনো বেশ উত্তপ্ত। উভয় দেশের কর্মকর্তারাই সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি খারাপ হলে যেকোনো সময় আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে।
ইসলামী রীতি অনুযায়ী সাধারণত মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাফন করার নিয়ম থাকলেও, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং উচ্চ নিরাপত্তার উদ্বেগের কারণে ইরানি কর্তৃপক্ষ জানাজা পিছিয়ে দেয়। গত মাসে একটি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর এ বিদায় অনুষ্ঠানের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়।
আয়াতুল্লাহ খামেনির শোক ও দাফন অনুষ্ঠানে ব্যাপক জনসমাগমের আহ্বান জানিয়ে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘জাতির এ প্রতিশোধের ডাক যেন পুরো বিশ্বের কান পর্যন্ত পৌঁছায়।’
একই সুরে ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি বলেন, ‘আমাদের শহীদ নেতা এবং জাতির সব শহীদের রক্তের মূল্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই চড়া দামে দিতে হবে।’
এদিকে, জনাকীর্ণ এই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা বা বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবং জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে ইরানের প্রশাসন। অতীতে এই ধরনের বিশাল জনসমাবেশে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতা মাথায় রেখেই এবার কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।