
মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। গতকাল ২৮ অক্টোবর ছিল তাঁর জন্মদিন। এ উপলক্ষে গেটসের জীবন ও কর্ম নিয়ে প্রকাশিত হলো আজকের ফিরে দেখা।
১৯৭৫ সালের এপ্রিল। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের আলবুকার্কি শহরে দুজন তরুণ একটি অফিস ভাড়া নিয়েছেন। একজনের বয়স ২২, অন্যজনের ১৯। শহরের এমআইটিএস নামের ছোট এক ইলেকট্রনিকস কোম্পানি তখন বাজারে এনেছে ‘আলতাইর ৮৮০০’ নামের একটি কিট-কম্পিউটার, যা শখের প্রযুক্তিবিদেরা নিজেরাই জোড়া লাগিয়ে নিতেন। ওই যন্ত্রের জন্য বেসিক নামের প্রোগ্রামিং ভাষা লিখে দিয়েছেন এই দুজন। নিজেদের নতুন কোম্পানির নাম রেখেছেন ‘মাইক্রো-সফট’। মাইক্রোকম্পিউটারের সফটওয়্যার, এই অর্থে।
বয়সে ছোটজনের নাম উইলিয়াম হেনরি গেটস, সবাই ডাকে বিল। বড়জন পল অ্যালেন। তখন তাঁদের কোম্পানিতে লোকজন হাতে গোনা, আয়ও সামান্য। অথচ পরের কয়েক দশকে সেই কোম্পানির তৈরি সফটওয়্যার বিশ্বের কোটি কোটি ডেস্কে বসে যাবে, আর বিল গেটস বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় বছরের পর বছর জায়গা করে নেবেন।
গেটসের গল্প বলতে গেলে প্রথমেই ‘ড্রপআউট’ শব্দটা চলে আসে। হার্ভার্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া ছেড়ে দিয়ে একজন বিশ্ব জয় করেছেন, এই কাহিনি তরুণদের কাছে আকর্ষণীয়। তবে পুরো ছবিটা আরেকটু জটিল। গেটস পড়া ছেড়েছিলেন বটে, কিন্তু তা নিতান্ত অনিশ্চয়তায় ঝাঁপ দেওয়া ছিল না। শৈশব থেকেই তিনি এমন পরিবেশে বড় হয়েছেন, যেখানে কম্পিউটারের সামনে বসার সুযোগ ছিল বিরল, আর পেছনে ছিল সচ্ছল একটি পরিবার।
যে স্কুলের টার্মিনাল বদলে দিল জীবন
বিল গেটসের জন্ম ১৯৫৫ সালের ২৮ অক্টোবর, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের সিয়াটল শহরে। বাবা উইলিয়াম গেটস সিনিয়র ছিলেন আইনজীবী, মা মেরি গেটস শিক্ষক এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। ব্রিটানিকার জীবনীতে বলা হয়েছে, ছোটবেলা থেকেই গেটস ছিলেন অসম্ভব মেধাবী আর প্রতিযোগিতাপ্রিয়, পড়াশোনায় এগিয়ে থাকলেও নিজের পছন্দের বিষয় ছাড়া অন্য কিছুতে মন বসত না।
মোড় ঘুরল ১৩ বছর বয়সে, যখন তাঁকে সিয়াটলের বেসরকারি লেকসাইড স্কুলে ভর্তি করানো হয়। ষাটের দশকের শেষ দিকে সেখানে স্কুলের অভিভাবকদের একটি সংগঠন বিক্রির টাকা দিয়ে একটি টেলিটাইপ টার্মিনাল কিনেছিল, যার মাধ্যমে টেলিফোন লাইনের মাধ্যমে দূরের একটি মেইনফ্রেম কম্পিউটারের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেত। তখনকার দিনে কম্পিউটার ছিল দামি জিনিস, আর স্কুলপড়ুয়া কারও পক্ষে তা পাওয়া প্রায় অকল্পনীয়। গেটস আর তাঁর কয়েকজন সহপাঠী সেই টার্মিনালে এমনভাবে আটকে গেলেন যে ক্লাসের বাইরের প্রায় পুরো সময়টাই কাটত তার সামনে।
এই বন্ধুদের একজন ছিলেন দুই বছরের বড় পল অ্যালেন। দুজনের বন্ধুত্ব, প্রোগ্রামিংয়ে একসঙ্গে ডুবে থাকা আর পরে একসঙ্গে ব্যবসা শুরু করার সূত্রটা এখান থেকেই। স্কুলের পাট চুকতে না চুকতেই তাঁরা ‘ট্রাফ-ও-ডেটা’ নামের একটি ছোট উদ্যোগ দাঁড় করান, যেটি সড়কের যানবাহনের তথ্য বিশ্লেষণের যন্ত্র বানাত। ব্যবসা তেমন চলেনি, কিন্তু মাইক্রোপ্রসেসর নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা জমা হয়েছিল।
স্টাডি ডটকমে গেটসের বায়োগ্রাফিতে এ সময়ের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তাতে স্পষ্ট, তাঁর কম্পিউটারপ্রীতি কোনো আকস্মিক খেয়াল ছিল না। সুযোগ পাওয়ার পর তিনি তা আঁকড়ে ধরেছিলেন, আর সেই আঁকড়ে ধরার ক্ষমতাই তাঁকে বাকিদের থেকে আলাদা করেছিল।
একটি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ, একটি দুঃসাহসী ফোন
১৯৭৩ সালে গেটস ভর্তি হন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাবার ইচ্ছা ছিল ছেলে আইনে পড়ুক। কিন্তু গেটসের মন পড়ে থাকত বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাবে। হার্ভার্ডে তাঁর হলের সঙ্গী ছিলেন স্টিভ বালমার, যিনি পরে মাইক্রোসফটের দীর্ঘদিনের প্রধান নির্বাহী হন।
১৯৭৪ সালের শেষ দিকের একটি ঘটনা এ গল্পে প্রায় কিংবদন্তির মর্যাদা পেয়েছে। বহুল প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, পল অ্যালেন তখন বোস্টনে চাকরি করছেন। হার্ভার্ড স্কয়ারের একটি পত্রিকার দোকানে তিনি দেখেন ‘পপুলার ইলেকট্রনিকস’ ম্যাগাজিনের জানুয়ারি সংখ্যার প্রচ্ছদে ছাপা হয়েছে আলতাইর ৮৮০০। তিনি ম্যাগাজিন হাতে ছুটে গেলেন গেটসের কাছে। দুজনই বুঝলেন, ব্যক্তিগত কম্পিউটারের যুগ এসে গেছে, আর এসব যন্ত্র চালানোর জন্য সফটওয়্যার লাগবে। সেই সফটওয়্যার তাঁরাই লিখবেন।
এরপর যা ঘটল, তা দুঃসাহসিক যাত্রার এক অভাবনীয় উদাহরণ। এমআইটিএসের কর্ণধারকে ফোন করে তাঁরা জানালেন, আলতাইরের জন্য বেসিক ভাষা তাঁদের কাছে তৈরি আছে। বাস্তবে তখন এক লাইন কোডও লেখা হয়নি। হার্ভার্ডের একটি বড় কম্পিউটারে আলতাইরের প্রসেসরের নকল চালিয়ে কয়েক সপ্তাহ প্রায় না ঘুমিয়ে তাঁরা প্রোগ্রাম লিখলেন। অ্যালেন সেটি নিয়ে আলবুকার্কি গেলেন। সামনে বসে প্রথমবার চালাতেই প্রোগ্রাম কাজ করল।
এই সাফল্যের পরই গেটস হার্ভার্ড থেকে ছুটি নিলেন, ছুটি আর ফুরোয়নি। ২০০৭ সালে হার্ভার্ড তাঁকে সম্মানসূচক ডিগ্রি দিয়েছে, যার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও তাঁর অসমাপ্ত সম্পর্কের একটা সুন্দর সমাপ্তি ঘটেছে।
তবে ঝুঁকি যে ছিল না, তা নয়। বাজারটাই তখন অস্তিত্বে আসেনি। পিসি কেনার মতো মানুষ ছিল হাতে গোনা, আর সফটওয়্যারের জন্য আলাদা দাম দিতে হবে, এই ধারণাটাই অনেকের কাছে অদ্ভুত লাগত। কারণ, তখন শখের প্রোগ্রামাররা সফটওয়্যার বিনা পয়সায় একে অপরকে কপি করে দিতেন।
১৯৭৬ সালে গেটস ‘হবিস্টদের উদ্দেশে খোলাচিঠি’ লিখে এই চর্চার প্রকাশ্য সমালোচনা করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, মানুষ যদি সফটওয়্যারের জন্য টাকা না দেয়, তাহলে ভালো সফটওয়্যার তৈরির কেউ থাকবে না। অনেকে সেদিন তাঁকে লোভী বলেছিলেন। কিন্তু সফটওয়্যারকে স্বতন্ত্র পণ্য হিসেবে দাঁড় করানোর যে ভিত্তি তিনি তখন তৈরি করেন, পুরো শিল্পটাই পরে তার ওপর গড়ে ওঠে।
এমএস-ডস: বিক্রি নয়, লাইসেন্সেই বাজিমাত
মাইক্রোসফট ১৯৭৯ সালে আলবুকার্কি ছেড়ে চলে আসে সিয়াটলের শহরতলি বেলভিউতে। কিন্তু কোম্পানির ভাগ্য পাল্টে দেওয়া সিদ্ধান্তটি এল ১৯৮০ সালে।
সেই বছর কম্পিউটার–জগতের সবচেয়ে বড় নাম আইবিএম নিজেদের প্রথম ব্যক্তিগত কম্পিউটার বানানোর পরিকল্পনা করছিল। তাদের একটি অপারেটিং সিস্টেম দরকার ছিল।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইবিএমের প্রতিনিধিরা প্রথমে মাইক্রোসফটের সঙ্গে কথা বলেন, গেটস তাঁদের অন্য একটি প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল রিসার্চের কাছে পাঠান, কিন্তু সেখানে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি।
এরপর আইবিএম আবার ফিরে আসে মাইক্রোসফটের কাছে। তখন গেটস ও অ্যালেন সিয়াটলের আরেকটি ছোট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে একটি অপারেটিং সিস্টেম কিনে নেন, যার দাম ধরা হয় ১০ হাজার ডলার। সেটিকে বদলে-সাজিয়ে আইবিএমের জন্য তৈরি হয় এমএস-ডস।
এই চুক্তির আসল চমকটা ছিল শর্তে। ওই সফটওয়্যার আইবিএমের কাছে পুরোপুরি বিক্রি করা হয়নি। মাইক্রোসফট আইবিএমকে ব্যবহারের লাইসেন্স দিয়েছিল, কিন্তু নিজেদের হাতে রেখে দিয়েছিল অন্য কম্পিউটার নির্মাতাদের কাছেও একই সফটওয়্যার লাইসেন্স দেওয়ার অধিকার। ১৯৮১ সালে আইবিএমের পিসি বাজারে এল।
কিছুদিনের মধ্যেই অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো আইবিএম-সদৃশ কম্পিউটার বানাতে শুরু করল, আর প্রায় সবগুলোতেই চলতে লাগল এমএস-ডস। কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ ক্রমে সস্তা ও সহজলভ্য হয়ে গেল, কিন্তু সফটওয়্যারের চাবি রয়ে গেল মাইক্রোসফটের হাতে।
ব্লিপ ফিন্যান্সের বিশ্লেষণে মাইক্রোসফটের এই ব্যবসায়িক মডেলকে তাঁর সাফল্যের কেন্দ্রীয় কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। হার্ডওয়্যারের দাম যত কমে, সফটওয়্যারের চাহিদা তত বাড়ে, আর প্রতিটি নতুন কম্পিউটারের সঙ্গে মাইক্রোসফটের আয়ের একটি অংশ আপনা–আপনি চলে আসে। গেটস প্রযুক্তি জগতে নতুন এক সূত্র প্রতিষ্ঠিত করলেন—সবচেয়ে বড় অর্থ যন্ত্রে নয়, যন্ত্র চালানোর নির্দেশনায়।
উইন্ডোজ, ইন্টারনেট আর শীর্ষ ধনীর আসন
১৯৮৫ সালে মাইক্রোসফট বাজারে আনে উইন্ডোজের প্রথম সংস্করণ। এমএস-ডসের কালো পর্দায় কমান্ড টাইপ করার বদলে ব্যবহারকারী এবার মাউস দিয়ে ছবি আর তালিকা বেছে নিতে পারবেন, এই ছিল ধারণা। শুরুর দিকের সংস্করণ তেমন জমেনি। বদলটা এল নব্বইয়ের দশকে, উইন্ডোজ ৩.০ আর তারপর ১৯৯৫ সালের উইন্ডোজ ৯৫-এর হাত ধরে।
ওই বছরই গেটস কোম্পানির ভেতরে এক স্মারকে ইন্টারনেটকে বর্ণনা করেন বিশাল এক জোয়ার হিসেবে। এই ইন্টারনেট পুরো শিল্পকে ভাসিয়ে নিতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেছিলেন। মাইক্রোসফটকে নতুন এই জোয়ারের মুখে ঘুরিয়ে দিতে তিনি জোর দিতে থাকেন ইন্টারনেট ব্রাউজারের ওপর।
সম্পদের হিসাবটাও এ সময়েই চোখে পড়ার মতো হয়ে ওঠে। ১৯৮৬ সালে মাইক্রোসফট শেয়ারবাজারে নাম লেখায়। ১৯৮৭ সালে মাত্র ৩১ বছর বয়সে গেটস ফোর্বসের শত কোটিপতি ব্যক্তিদের তালিকায় ঢুকে পড়েন। এরপর বহু বছর তিনি বিশ্বের শীর্ষ ধনীর আসন ধরে রাখেন।
২০০০ সালে প্রধান নির্বাহীর পদ ছেড়ে দিয়ে দায়িত্ব দেন বন্ধু স্টিভ বালমারকে, নিজে থাকেন চেয়ারম্যান ও প্রধান সফটওয়্যার স্থপতির ভূমিকায়। ২০০৮ সালে মাইক্রোসফটের পূর্ণকালীন কাজ থেকে সরে আসেন। ২০১৪ সালে চেয়ারম্যানের পদও ছাড়েন। ২০২০ সালের মার্চে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ থেকেও বিদায় নেন।
একচেটিয়া ব্যবসার মামলা: কাঠগড়ায় গেটস
মাইক্রোসফটের বিস্ময়কর বাড়বাড়ন্তের একটা অন্ধকার দিকও ছিল। ১৯৯৮ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্য মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে একচেটিয়া ব্যবসার অভিযোগে মামলা করে। অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল উইন্ডোজের সঙ্গে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার জুড়ে দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাউজার নেটস্কেপকে বাজার থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
মামলার ইতিহাস নিয়ে করপোরেট ফিন্যান্স ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ এবং বার্কলে ল স্কুলের আর্কাইভে রাখা একটি আইনি আলোচনায় এই লড়াইয়ের খুঁটিনাটি পাওয়া যায়।
২০০০ সালে বিচারক টমাস পেনফিল্ড জ্যাকসন রায়ে বলেন, মাইক্রোসফট আইন ভেঙে একচেটিয়া ক্ষমতা কাজে লাগিয়েছে। তিনি কোম্পানিকে ভেঙে দুটি ভাগ করার আদেশও দেন।
অবশ্য ২০০১ সালে আপিল আদালত সেই ভাঙার আদেশ বাতিল করেন। একই বছর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে মাইক্রোসফট একটি সমঝোতায় পৌঁছায়। কোম্পানি টিকে যায় অক্ষত অবস্থায়, কিন্তু গেটসের ভাবমূর্তি আর আগের জায়গায় ফেরেনি। এই মামলায় তাঁর ভিডিওতে ধারণ করা জবানবন্দির আচরণ গণমাধ্যমে ও আদালতে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল। ইউরোপেও প্রতিযোগিতা আইনে মাইক্রোসফটকে বড় অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়তে হয়।
মাইক্রোসফটের প্রথম দিনগুলো নিয়ে লেখা বিভিন্ন বইয়ে গেটসকে এমন একজন নেতা হিসেবে আঁকা হয়েছে, যিনি নিজের ও অন্যের কাছে অসম্ভব বেশি চান, ভুল দেখলে রূঢ় ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান। বিজয়ী উদ্যোক্তা আর কড়া হাতে প্রতিযোগী দমন করা একচেটিয়া ব্যবসায়ী, গেটসের এই দুটি পরিচয় আসলে একই মুদ্রার দুই পিঠ।
ধনকুবের থেকে দানবীর
গেটসের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয় ব্যবসার আসন থেকে সরে আসার আগেই। ১৯৯৪ সালে তিনি নিজের নামে একটি ছোট ফাউন্ডেশন গড়েন। ২০০০ সালে সেটি স্ত্রী মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চের সঙ্গে মিলে হয়ে ওঠে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন।
২০০৬ সালে বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেট নিজের সম্পদের বড় একটি অংশ এই ফাউন্ডেশনে দান করার ঘোষণা দিলে এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিমালিকানাধীন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ২০১০ সালে গেটস ও বাফেট মিলে চালু করেন ‘গিভিং প্লেজ’, যার মাধ্যমে বিশ্বের ধনীরা জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর সম্পদের সিংহভাগ দান করার প্রতিশ্রুতি দেন।
ফাউন্ডেশনের কাজের মূল জায়গা বৈশ্বিক স্বাস্থ্য। পোলিও নির্মূলের বৈশ্বিক উদ্যোগের অন্যতম বড় দাতা এটি। ১৯৮৮ সালের তুলনায় বিশ্বে পোলিওর সংক্রমণ এখন ৯৯ শতাংশের বেশি কমেছে।
ম্যালেরিয়া প্রতিরোধ, শিশুদের টিকাদান ও টিকা জোটের সহায়তা এবং কৃষি ও পুষ্টির মতো খাতেও ফাউন্ডেশনের অর্থ গেছে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলকে পোলিওমুক্ত ঘোষণা করা হয়; এই বৈশ্বিক উদ্যোগে গেটস ফাউন্ডেশনও অংশীদার।
গত বছরের মে মাসে ফাউন্ডেশন ঘোষণা দেয়, তারা ২০৪৫ সাল নাগাদ প্রায় ২০ হাজার কোটি ডলার খরচ করে কার্যক্রম গুটিয়ে ফেলবে। অর্থাৎ গেটস নিজের সম্পদের সিংহভাগই জীবদ্দশায় বিলিয়ে দিতে চান।
তবে সমালোচনাও আছে। নির্বাচিত না হয়েও একজন ব্যক্তির অর্থ কীভাবে বিশ্বের স্বাস্থ্য ও কৃষিনীতির ধরন ঠিক করে দেয়, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন গবেষক ও অধিকারকর্মীরা। করোনার সময় টিকার বৌদ্ধিক সম্পত্তি-অধিকার শিথিল করার বিপক্ষে গেটসের অবস্থানও সমালোচনার মুখে পড়েছিল। শিক্ষা খাতে তাঁর কিছু উদ্যোগ আশানুরূপ ফল দেয়নি, সে কথা তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন।
জলবায়ুর পেছনে বড় বাজি, পাল্টা প্রশ্নও
সম্পদ আর প্রভাব কাজে লাগিয়ে গেটস এরপর হাত দেন জলবায়ু–সংকটে। ২০০৮ সালে তাঁর সমর্থনে যাত্রা শুরু করে পারমাণবিক বিদ্যুতের নতুন প্রজন্মের নকশা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান টেরাপাওয়ার। ২০১৫ সালে গড়ে তোলেন ব্রেকথ্রু এনার্জি নামের বিনিয়োগ উদ্যোগ। ২০২১ সালে লেখেন জলবায়ু নিয়ে বই। তাঁর মূল যুক্তি, কেবল জীবনযাপন বদলে নয়, নতুন প্রযুক্তি দিয়েই কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে।
এর সঙ্গে আছে পাল্টা প্রশ্নও। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, গেটস যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় ব্যক্তিমালিকানাধীন কৃষিজমির মালিক, যা আড়াই লাখ একরের বেশি। ব্যক্তিগত জেটে চড়ে জলবায়ু সম্মেলনে যাওয়ার দ্বৈততা নিয়েও তিনি আলোচনায় এসেছেন।
বিচ্ছেদ, এপস্টিন-বিতর্ক আর ভাবমূর্তির ধাক্কা
২০২১ সালে গেটস ও মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটস ২৭ বছরের বিবাহিত জীবনের ইতি টানেন। এরপর ধীরে ধীরে গেটসের ব্যক্তিজীবনের আরও কিছু প্রসঙ্গ আলোচনায় আসে।
সিবিএস নিউজের এ বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ কুখ্যাত যৌন নিপীড়ক জেফরি এপস্টিন-সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করার পর গেটস ফাউন্ডেশনের কর্মীদের এক সভায় ক্ষমা চেয়েছেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের বরাতে সিবিএস জানায়, গেটস সভায় বলেছেন, এপস্টিনের সঙ্গে সময় কাটানো ছিল বিরাট ভুল।
একই সঙ্গে গেটস বলেছেন, ‘অবৈধ কিছু করিনি, অবৈধ কিছু দেখিওনি।’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সালে এপস্টিনের সাজার পর ২০১১ সালে তাঁদের পরিচয় এবং ২০১৪ সাল পর্যন্ত তাঁদের দেখাসাক্ষাৎ হয়েছে। বৈশ্বিক স্বাস্থ্যের জন্য অর্থ জোগাড় করার আশায় তিনি এই সম্পর্ক রেখেছিলেন বলে সভায় জানান। একই সভায় গেটস স্বীকার করেন, বিয়ের সময় তাঁর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল।
গেটস ফাউন্ডেশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এপস্টিনের সঙ্গে কয়েকজন কর্মীর যোগাযোগ হয়েছিল, কিন্তু কোনো সহযোগিতা হয়নি, কোনো তহবিল গড়া হয়নি এবং এপস্টিনকে কোনো অর্থ দেওয়া হয়নি। গেটস বরাবর বলে এসেছেন, এপস্টিনের অপরাধের বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না। প্রসঙ্গটি তাঁর দানবীর পরিচয়ের ওপর যে ছায়া ফেলেছে, তা নিয়ে প্রকাশ্যে মেলিন্ডা ফ্রেঞ্চ গেটসও কষ্টের কথা বলেছেন।
আশাবাদী গেটস কেন এখন শঙ্কিত
ব্যবসা আর দাতব্যের পর গেটসের এখন বিশেষ মনোযোগ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) ঘিরে। ২০২৩ সালের মার্চে নিজের ব্লগ গেটস নোটসে তিনি লেখেন, ‘দ্য এজ অব এআই হ্যাজ বিগান।’
সেখানে গেটস জানান, জীবনে দুবার তিনি এমন প্রযুক্তি দেখেছেন, যা তাঁর বৈপ্লবিক প্রযুক্তি বলে মনে হয়েছে। প্রথমবার ১৯৮০ সালে, গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেস। দ্বিতীয়বার ২০২২ সালে, ওপেনএআইয়ের তৈরি এআই মডেল। সেই লেখায় তিনি এআইকে মাইক্রোপ্রসেসর, পার্সোনাল কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও মুঠোফোনের মতোই মৌলিক অগ্রগতি বলেন।
সেই গেটস এখন অন্য সুরে কথা বলছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত নতুন এক প্রবন্ধ এবং এ নিয়ে একটি সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই নিয়ে আগে তিনি আশাবাদী ছিলেন। এখন তিনি ভয় পাচ্ছেন। গত এক বছরে এআই কর্মক্ষেত্রের কাজ সামলানোর সক্ষমতায় ও সাইবার হামলা চালানোর ক্ষমতায় তাঁর প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গেছে।
গেটসের ভাষায়, এসব ঘটনা তাঁকে হতবাক করেছে। জীবনে প্রথমবার তিনি কোনো নতুন প্রযুক্তির গতি কমে আসার কামনা করছেন। তিনি বলেন, এমন কোনো সমস্যা তাঁর চোখে পড়েনি, যার সমাধান উদ্ভাবন দিতে পারে না।
গেটসের উদ্বেগ মূলত তিন দিকে। প্রথমত, নিরাপত্তার ঝুঁকি, যার মধ্যে আছে এআই-নির্ভর হ্যাকিং, জৈব অস্ত্র আর প্রতারণা। দ্বিতীয়ত, এআই ও এআই-চালিত রোবটের কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কা। তৃতীয়ত, শিশুদের শেখা ও মানবিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব।
গেটস মনে করেন, এআই শিল্প নিজে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। এ কারণেই তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে নেতৃত্ব দিতে বলেছেন এবং চান এই উদ্যোগ দুই দলের সমর্থনে হোক। প্রস্তাবের মধ্যে আছে এআইয়ের ওপর নতুন কর এবং কিছু পেশায় কাজ মানুষের জন্য সংরক্ষিত রাখা, যাকে তিনি বলছেন ‘হিউম্যান রিজার্ভড’।
গেটস আরও জানিয়েছেন, এখন থেকে নিজের সময়ের সিংহভাগ এই কাজে দেবেন। এতে ফাউন্ডেশনের কাজে তাঁর সময় কমে যেতে পারে।
এ ধরনের সরকারি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ও সিলিকন ভ্যালির এআই-সমর্থকেরা, যাঁদের যুক্তি, কম নিয়ন্ত্রণ থাকলেই এআইয়ের সুফল দ্রুত আসে।
গেটস নিজেও বলেন, এপস্টিন-সংশ্লিষ্ট বিতর্কের কারণে অনেকে তাঁর কথা এড়িয়ে যেতে পারেন। সাক্ষাৎকারে তিনি সেই ঘটনাকে ‘খুব বড় ভুল’ বলে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
[তথ্যসূত্র: ব্রিটানিকা, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট, সিবিএস নিউজ, বায়োগ্রাফি ডটকম, স্টাডি ডটকম, ইনক ডটকম, ব্লিপ ফিন্যান্স, গেটস ফাউন্ডেশন, গেটস নোটস, করপোরেট ফিন্যান্স ইনস্টিটিউট, বার্কলে ল স্কুল]