
গ্রিনল্যান্ড দখলে নিতে শক্তি প্রয়োগের হুমকি থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ সরে আসার ঘোষণা দিলেন। এর মাধ্যমে তাঁর প্রশাসনের গত কয়েক সপ্তাহের নীতিগত বিশৃঙ্খলার অবসান হলো।
দুটি বিশ্বস্ত সূত্রের মতে, ট্রাম্পের উচ্চপদস্থ ও ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে একদিকে প্রেসিডেন্টের দাবিগুলো মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, অন্যদিকে মার্কিন মিত্রদের মধ্যে তৈরি হওয়া আতঙ্ক কমানোর চেষ্টা করছিলেন।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) গতকাল বুধবার দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহারের পথ থেকে সরে এসেছেন।
এর আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগের বিকল্পও রেখেছেন বলে জানিয়ে আসছিলেন।
গতকাল দাভোসে তাঁর বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ইউরোপের কয়েকটি দেশের ওপর যে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন, তা–ও আর কার্যকর করবেন না।
হোয়াইট হাউসের দুটি সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টকে অপেক্ষাকৃত কম উসকানিমূলক পথে হাঁটার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। ডেনমার্কের এই অঞ্চলটি সামরিক শক্তি দিয়ে দখল করার বিষয়ে ট্রাম্পের টিমের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সদস্যই অনাগ্রহী।
ওই দুটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভ্যন্তরীণ আলোচনার বিষয়ে কথা বলতে রাজি হয়েছিলেন।
বুধবার শুল্ক বাতিলের ঘোষণার পর ট্রাম্প বলেন, দাভোসে আলোচনার সময় তিনি এবং ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে গ্রিনল্যান্ড ও পুরো আর্কটিক অঞ্চল নিয়ে ‘ভবিষ্যৎ চুক্তির একটি কাঠামো’ তৈরি করেছেন। সম্ভাব্য এই চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি শীর্ষ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিয়েছেন।
দাভোসে তাঁর বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন, ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ইউরোপের কয়েকটি দেশের ওপর যে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিলেন, তা–ও আর কার্যকর করবেন না।
এ ঘটনা আবার প্রমাণ করল, গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রতি ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের মোহ কীভাবে বারবার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাধার মুখে পড়ছে। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে হঠাৎ নীতির পরিবর্তন এবং দ্রুত অবস্থান পাল্টানোর ঘটনা বারবার ঘটতে দেখা যাচ্ছে, যা এখন একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা বাজার পরিস্থিতির চাপে এই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট বারবার শুল্ক ও অন্যান্য নীতিতে বারবার তাঁর সিদ্ধান্ত বদলেছেন।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সামরিক বিকল্পগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা না করার বিষয়ে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে কোনো বিকল্প বাতিল না করা পর্যন্ত হোয়াইট হাউস তা বাতিল করে না।
কেলি আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট আজ ঘোষণা দিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ড দখলে তিনি শক্তি প্রয়োগ করবেন না। তাঁর পুরো প্রশাসন এই সিদ্ধান্ত মেনে চলবে।’ কেলি যোগ করেন, কোনো চুক্তি হলে দীর্ঘমেয়াদে ন্যূনতম ব্যয়ে গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জিত হবে।
আর্কটিক অঞ্চল নিয়ে ট্রাম্পের উচ্চাকাঙ্ক্ষা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তাঁর গ্রিনল্যান্ড দখলের পুরোনো ইচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ ছিল। তাঁর যুক্তি ছিল—আর্কটিক অঞ্চলে শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এ দ্বীপটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের নেতারা ট্রাম্পের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁরা জোর দিয়ে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে দ্বীপটির জনগণ। তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভীতি প্রদর্শনের কৌশল প্রয়োগের অভিযোগও তুলেছেন।
গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছিলেন, যতক্ষণ না যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রিনল্যান্ড কিনতে দেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ তিনি ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর দফায় দফায় শুল্ক আরোপ করবেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলো একে ‘ব্ল্যাকমেল’ বা জবরদস্তি হিসেবে অভিহিত করেছে।
হোয়াইট হাউস সূত্র জানায়, এই শুল্ক আরোপের বুদ্ধি দিয়েছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকসহ মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য। লুটনিক অবশ্য এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ ঘটনা আবার প্রমাণ করল, গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রতি ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের মোহ কীভাবে বারবার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাধার মুখে পড়ছে। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে হঠাৎ নীতির পরিবর্তন এবং দ্রুত অবস্থান পাল্টানোর ঘটনা বারবার ঘটতে দেখা যাচ্ছে, যা এখন একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্পের এই হুমকির আগে ইউরোপের কয়েকটি দেশ বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডে কিছু সৈন্য পাঠিয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে বোঝানো, তারা গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিয়ে মার্কিন উদ্বেগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
দাভোস সম্মেলন শুরুর আগে ইউরোপীয় নেতারা গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগের বিরুদ্ধে তাঁদের প্রতিবাদ আরও জোরালো করেন।
হোয়াইট হাউসের এক সূত্র ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি কোণঠাসা হয়ে পড়া পছন্দ করেন না।
ট্রাম্পের ওই ঘোষণার পর হোয়াইট হাউসে শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা তৈরি এবং বাস্তবায়নের পর এর ফলাফল কী হবে—তা বোঝার জন্য তাড়াহুড়া শুরু হয়ে যায়। ইইউ সদস্যদের সঙ্গে শুল্ক নিয়ে ‘পাল্টাপাল্টি প্রতিশোধ’ কীভাবে সামলানো যায়, তা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা এখনো কাজ করছে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ডেনমার্ক দূতাবাসের এক মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
২০১৯ সালে ট্রাম্প প্রথম গ্রিনল্যান্ড দখলের ধারণাটি সামনে আনেন। তবে এক বছর আগে ক্ষমতায় ফেরার পর তাঁর বাগাড়ম্বর আরও বেড়ে যায়। গত বছরের বৈঠকগুলোতে মার্কিন কর্মকর্তারা ডেনিশ পক্ষকে আশ্বস্ত করেছিলেন, সম্পর্ক স্বাভাবিক হচ্ছে।
ডেনিশ কর্মকর্তারা তখন ধারণা করেছিলেন, গ্রিনল্যান্ড দখলের সামরিক চিন্তাভাবনা প্রশাসনের মাথায় আর নেই।
তবে গত ডিসেম্বরে পরিস্থিতি বদলে যায়। ট্রাম্প হঠাৎ ঘোষণা দেন, লুইজিয়ানার গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রি গ্রিনল্যান্ড বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে কাজ করবেন। ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার নেতা নিকোলা মাদুরোকে রাজধানী কারাকাস থেকে তুলে আনার পর আত্মবিশ্বাসী হয়ে তিনি গ্রিনল্যান্ড দখলের চেষ্টায় নতুন করে উঠেপড়ে নামেন।
হোয়াইট হাউস সূত্র জানায়, গ্রিনল্যান্ড দখলের ব্যাপারে সহযোগীদের মধ্যে মিল থাকলেও প্রেসিডেন্টের আক্রমণাত্মক কৌশল নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিভক্তি ছিল। অধিকাংশ বৈঠকে কর্মকর্তারা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সামরিক শক্তি ব্যবহারের ব্যাপারে কর্মকর্তাদের মধ্যে খুব গুরুত্ব দিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।
হোয়াইট হাউস সূত্র জানায়, এই শুল্ক আরোপের বুদ্ধি দিয়েছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকসহ মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্য। লুটনিক অবশ্য এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ইউএস আর্কটিক রিসার্চ কমিশনের প্রধান টম ড্যানস, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ‘মধ্যপন্থা’ খুঁজছিলেন। অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার সামরিক শক্তি ব্যবহারের বিকল্প টেবিলে রাখার পক্ষে ছিলেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দল নিয়মিতভাবে তাঁকে জাতীয় উদ্বেগের বিষয়ে বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব করেন।
সূত্রগুলো জানায়, ট্রাম্প নিজেই বিষয়টি দেখভাল করছেন। এক কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপের বিকল্পটি নিজের হাতে রাখতে চেয়েছিলেন। তবে গ্রিনল্যান্ডে সামরিক অভিযান কেমন হতে পারে, সে সম্পর্কে মার্কিন কর্মকর্তারা বিস্তারিত কিছু বলেননি।
ডেনমার্কের অংশ হিসেবে গ্রিনল্যান্ড ইতিমধ্যেই ন্যাটোর সদস্য এবং সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ১৯৫১ সালের এক চুক্তি অনুযায়ী গ্রিনল্যান্ড বা ন্যাটোর অন্য অঞ্চল রক্ষার স্বার্থে মার্কিন সামরিক বাহিনী সেখানে অবাধে প্রবেশ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়াশিংটন চাইলে এখনই সেখানে অতিরিক্ত সেনা পাঠাতে পারে।
গত সপ্তাহে জেডি ভ্যান্স ও মার্কো রুবিও হোয়াইট হাউসে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লারস লোকে রাসমুসেন একে ‘খোলামেলা ও গঠনমূলক’ আলোচনা হিসেবে বর্ণনা করেন।
সূত্রমতে, ওই বৈঠকে সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। বরং পারষ্পরিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও কীভাবে একটি সমাধান বের করা যায়, তা নিয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনা করেন।