যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। ইরানে বিক্ষোভের সময়ের চিত্র
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। ইরানে বিক্ষোভের সময়ের চিত্র

আল–জাজিরা এক্সপ্লেইনার

যুক্তরাষ্ট্রের ডলার ‘কারসাজিতেই’ কি ইরানে রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভ, কী বলছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, ওয়াশিংটনই কৌশল করে ইরানে ডলারের ঘাটতি সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে রাতারাতি ইরানের মুদ্রা রিয়ালের ব্যাপক দরপতন হয়। হঠাৎ করে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের রেকর্ড দরপতনের জেরে সৃষ্ট আর্থিক সংকট গত বছর ডিসেম্বরের শেষ দিকে তেহরানে বিক্ষোভ উসকে দিয়েছিল।

রাজধানী থেকে সেই বিক্ষোভ পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। জানুয়ারি মাসজুড়ে চলা ওই বিক্ষোভ এতটাই তীব্র রূপ নিয়েছিল যে ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর দেশটিতে সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী বিক্ষোভে পরিণত হয়েছিল।

বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল ২৮ ডিসেম্বর। ইরানে অনেক দিন ধরেই মূল্যস্ফীতি অসহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। ডিসেম্বরে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের রেকর্ড দরপতন সাধারণ ইরানিদের ওপর বিশাল বড় আঘাত হয়ে আসে।

প্রতিবাদ জানাতে তেহরানে ব্যবসায়ী ও দোকানদারেরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। দ্রুত ওই বিক্ষোভ ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

বিক্ষোভের সময় ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেন-এজেই বলেছিলেন, ‘বিক্ষোভকারীরা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের শত্রুদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছেন। বিক্ষোভকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হয়ে কাজ করছেন।’

বিক্ষোভ দমনে ইরান সরকার কঠোর বলপ্রয়োগ করেছিল। পশ্চিমা বিশ্বভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, বিক্ষোভে ছয় হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ১৫০ শিশুও রয়েছে।

‘ডলার–ঘাটতি’ কী

ডলারের ঘাটতি বলতে বোঝায় সেই পরিস্থিতি, যখন কোনো দেশের কাছে বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্য পর্যাপ্ত মার্কিন ডলার থাকে না।

বৈশ্বিক বাণিজ্যে অন্যতম প্রধান মুদ্রা মার্কিন ডলার। বিশেষ করে তেল, যন্ত্রপাতি ও ঋণ পরিশোধের জন্য ডলার ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ, যেকোনো দেশের জন্য নিয়মিত ডলারের জোগান থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রপ্তানি কমে গেলে এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ অবরুদ্ধ হলে ডলারের মারাত্মক সংকট দেখা দিতে পারে। এর ফলে স্থানীয় মুদ্রার মান দুর্বল হয়ে যায়, আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে পায়, সঙ্গে মূল্যস্ফীতি লাগামছাড়া হয়ে পড়ে।

জার্মানির মারবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ রেজা ফারজানেগান বলেন, ‘ইরানে ডলারের ঘাটতি তৈরি করা হয়েছিল একসঙ্গে দুটি প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের চ্যানেল বন্ধ করে দিয়ে। সেগুলো হলো তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বন্ধ করা।’

ইরানের অর্থনীতি তেলের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই নিষেধাজ্ঞার কারণে তেল বিক্রি থেকে রাজস্ব আয় কমে গেলে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে মারাত্মক সংকট সৃষ্টি হতে পারে।

রেজা ফারজানেগান আল–জাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানকে ইরানের সঙ্গে ডলারে লেনদেন করার ক্ষেত্রে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে দ্বিতীয় ধাপের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এর ফলে ইরানের বিদেশে থাকা বিদ্যমান রিজার্ভ আটকে গেছে এবং নতুন ডলার দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এটি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের ওই নিষেধাজ্ঞায় বলেছে, কেউ ইরানের তেল কিনলে বা বিক্রি করলে তাকে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট কী বললেন

ইরানকে কীভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে—গত সপ্তাহে মার্কিন কংগ্রেসে একটি শুনানিতে এ প্রশ্নের জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মুদ্রার মান দ্রুত নিম্নমুখী করার কৌশল নিয়েছিল।

বেসেন্ট বলেন, ‘আমরা (অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে) যা করেছি, তা হলো দেশে ডলারের তীব্র ঘাটতি সৃষ্টি করা।’

মার্কিন অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, ‘ডিসেম্বরে আমাদের এই কৌশল চূড়ান্ত রূপ নেয়, যখন ইরানের একটি অন্যতম বৃহৎ ব্যাংক ধসে পড়ে...ইরানি মুদ্রা দ্রুত নিম্নমুখী হয়, মূল্যস্ফীতি ত্বরান্বিত হয়। এর ফলে আমরা ইরানের মানুষকে সড়কে নেমে বিক্ষোভ–প্রতিবাদ করতে দেখেছি।’

ইরানের নেতারা পাগলের মতো দেশের বাইরে অর্থ পাঠাচ্ছিলেন বলেও দাবি করেন বেসেন্ট। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি, ইরানি নেতৃত্ব উন্মত্তভাবে দেশের বাইরে অর্থ পাঠাচ্ছে। তারা আসলে বিপদ বুঝে পালিয়ে যাওয়ার ধান্দা করছে। এটা ভালো লক্ষণ, হয়তো তারা বুঝতে পেরেছে তাদের শেষ সময় খুবই কাছে।’

এর আগে, গত মাসে দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ফক্স নিউজের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বেসেন্ট ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, কীভাবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ইরানে সে সময় চলমান বিক্ষোভে ভূমিকা রাখছে।

বেসেন্ট বলেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অর্থ মন্ত্রণালয়কে ইরানের ওপর সর্বাধিক চাপ প্রয়োগ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তা কার্যকর হয়েছে। এ কারণে ডিসেম্বর মাসে তাদের অর্থনীতি ধসে পড়েছে। তারা আমদানি করতে পারেনি এবং প্রতিবাদে মানুষ সড়কে বিক্ষোভে নেমেছে।’

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ওই ডলার কারসাজির কারণে জানুয়ারিতে ডলারের বিপরীতে ইরানের মুদ্রার মান এতটাই পড়ে যায় যে ১ ডলার বিপরীতে ইরানি মুদ্রার বিনিময় মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৫ লাখ রিয়াল।

এক বছর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যা ছিল, ১ ডলার সমান ৭ লাখ রিয়াল। গত বছরের তুলনায় ইরানে মূল্যস্ফীতি গড়ে ৭২ শতাংশ বেড়ে গেছে।