উপরে বাঁ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প, ধনকুবের রিচার্ড ব্র্যানসন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প; মাঝের সারিতে বাঁয়ে যুক্তরাজ্যের প্রিন্স অ্যান্ড্রু, নিচে বাঁ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক, চলচ্চিত্র পরিচালক ব্রেট র‍্যাটনার ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন
উপরে বাঁ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প, ধনকুবের রিচার্ড ব্র্যানসন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প; মাঝের সারিতে বাঁয়ে যুক্তরাজ্যের প্রিন্স অ্যান্ড্রু, নিচে বাঁ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক, চলচ্চিত্র পরিচালক ব্রেট র‍্যাটনার ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন

এপস্টেইন–সংক্রান্ত নতুন নথিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে কী আছে

কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইন-সংক্রান্ত নতুন লাখ লাখ নথি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ (ডিওজে) সম্প্রতি প্রকাশ করেছে। গত বছর এক আইনে এসব নথি প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়। এরপর এবারই বিচার বিভাগ এত বিপুলসংখ্যক নথি প্রকাশ করল।

গত শুক্রবার প্রকাশ করা ৩০ লাখ পৃষ্ঠার বেশি নথির পাশাপাশি ১ লাখ ৮০ হাজার ছবি ও ২ হাজার ভিডিও জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এসব নথি প্রকাশের সময়সীমা নির্ধারণ করে আইনে স্বাক্ষর করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিচার বিভাগ সেই সময়সীমার ছয় সপ্তাহ পর নথিগুলো প্রকাশ করেছে।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ বলেন, ‘মার্কিন জনগণের কাছে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থেকে এ বিপুলসংখ্যক নথি প্রকাশ করা হলো।’

এসব নথির সঙ্গে কারাগারে এপস্টেইনের সময়কাল–সম্পর্কিত তথ্য, একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবেদন, বন্দী অবস্থায় তাঁর মৃত্যুর বিবরণ এবং তাঁর সহযোগী গিলেন ম্যাক্সওয়েল-সংক্রান্ত তদন্তের রেকর্ড রয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচারে সহায়তা করার দায়ে ম্যাক্সওয়েল বর্তমানে কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

মার্কিন জনগণের কাছে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থেকে এ বিপুলসংখ্যক নথি প্রকাশ করা হয়েছে।
টড ব্ল্যাঞ্চ, যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল

বিচার বিভাগের প্রকাশিত এসব নথিতে এপস্টেইন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে ই-মেইল আদান-প্রদানের তথ্যও রয়েছে।

অনেক ই-মেইল ও নথি এক দশকেরও বেশি পুরোনো। ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় ১৪ বছরের এক কিশোরীকে ধর্ষণের দায়ে এপস্টেইন দোষী সাব্যস্ত হন। নারী পাচার–সংক্রান্ত মামলায় আটক অবস্থায় এপস্টেইন ২০১৯ সালের ১০ আগস্ট কারাগারে মারা যান। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিয়ে যৌনবৃত্তির বিশাল এক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ ছিল এপস্টেইনের বিরুদ্ধে।

‘দ্য ডিউক’-কে রুশ নারীর সঙ্গে পরিচয়ের আমন্ত্রণ

নথি থেকে যৌন নিপীড়ক এপস্টেইনের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের অভিজাত ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এতে এপস্টেইন ও ‘দ্য ডিউক’ নামের এক ব্যক্তির মধ্যে ই-মেইল চালাচালির তথ্য রয়েছে। দ্য ডিউককে অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর বলে মনে করা হচ্ছে। ওই ই-মেইলে বাকিংহাম প্যালেসে রাতের খাবারের কথা বলা হয়েছে, যেখানে ‘অনেক গোপনীয়তা’ ছিল।

এপস্টেইনের আরেকটি বার্তায় দ্য ডিউককে ২৬ বছর বয়সী এক রুশ নারীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

ই-মেইলগুলো ইংরেজি অক্ষর ‘এ’ স্বাক্ষর দিয়ে শেষ হয়েছে। একটি স্বাক্ষরে ‘এইচআরডি ডিউক অব ইয়র্ক কেজি’ লেখা হয়েছে বলে মনে হয়। ২০১০ সালের আগস্টে এসব ই-মেইল আদান-প্রদান হয়েছিল। এর দুই বছর আগে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীর সঙ্গে যৌন সংসর্গ করার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এপস্টেইন।

প্রকাশিত ফাইলে (এপস্টেইন ফাইলস) একটি ছবি আছে, যেখানে সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রুকে দুই হাত ও দুই পায়ে ভর দিয়ে মাটিতে শোয়া এক নারীর ওপর ঝুঁকে থাকতে দেখা যায়।

এক নারীর সঙ্গে প্রিন্স অ্যান্ড্রু

এপস্টেইন ও প্রিন্স অ্যান্ড্রু তথা অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসরের আরও ই-মেইল আছে, যেগুলো ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের। এসব ই-মেইল এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বন্ধের আগের বছরের প্রতিশ্রুতিগুলো প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবে ই–মেইলগুলোয় কোনো অন্যায় করার ইঙ্গিত নেই।

সাম্প্রতিক নথি ও ছবি সম্পর্কে জানতে বিবিসি সাবেক ডিউক অব ইয়র্ক অ্যান্ড্রুর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। কিন্তু তিনি তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেননি। এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর একসময়ের বন্ধুত্ব নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে তদন্ত ও সমালোচনা হয়। তিনি বারবার সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সম্প্রতি প্রকাশিত কিছু ই-মেইল এপস্টেইন ও অ্যান্ড্রুর সাবেক স্ত্রী সারাহ ফার্গুসনের মধ্যে চালাচালি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২০০৯ সালের ৪ এপ্রিলের একটি ই-মেইলে ‘লাভ সারাহ, দ্য রেড হেড’ লেখা। এটিতে লেখা হয়েছে, তিনি পাম বিচে থাকবেন এবং চা খেতে চান। ই-মেইলে ফার্গুসনের কোম্পানি ‘মাদার’স আর্মি’-র ধারণা নিয়েও আলোচনা আছে।

এপস্টেইনকে সাবেক ডাচেস অব ইয়র্ক সারাহ বলেন, আমার প্রিয়, অসাধারণ ও বিশেষ বন্ধু জেফরি। তিনি তাঁকে ‘লেজেন্ড’ (কিংবদন্তি) উল্লেখ করে লেখেন, ‘তোমাকে নিয়ে আমি খুব গর্বিত।’

এ ই-মেইল আদান-প্রদানের সময় ২০০৮ সালের দণ্ডের কারণে গৃহবন্দী ছিলেন এপস্টেইন। এই যৌন নিপীড়ক অর্থ বিনিয়োগকারী হিসেবেও বিখ্যাত।

জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে রিচার্ড ব্র্যানসন

ব্রিটিশ ভার্জিন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্র্যানসন

প্রকাশিত নথিতে ব্রিটিশ ভার্জিন গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্র্যানসনের নাম কয়েক শ বার এসেছে। ২০১৩ সালের এক ই-মেইলে ব্র্যানসন এপস্টেইনকে বলেন, আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে ‘খুব ভালো লেগেছে’। তিনি আরও লেখেন, ‘যখনই এলাকায় আসবেন, দেখা করতে চাই—তবে দয়া করে আপনার হারেমদের সঙ্গে নিয়ে আসবেন।’

ভার্জিন গ্রুপ এসব ই-মেইলের ব্যাখ্যায় বলেছে, ‘হারেম’ বলতে এপস্টেইনের প্রতিনিধিদলের তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকে বোঝানো হয়েছে। ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়, ‘এপস্টেইনের সঙ্গে রিচার্ড ও জোয়ান ব্র্যানসনের যোগাযোগ ছিল ১২ বছরের বেশি আগে। দলগত বা ব্যবসায়িক পরিবেশে তাঁদের মধ্যে মাত্র কয়েকবার যোগাযোগ হয়েছে।’

এসব দাবি একজন প্রমাণিত, ক্ষুব্ধ মিথ্যাবাদীর কাছ থেকে আসা। এসব সম্পূর্ণ হাস্যকর ও পুরোপুরি মিথ্যা।

স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা

স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিরোস্লাভ লাইচাকের নাম এপস্টেইনের নথি আছে। তাঁর ও এপস্টেইনের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর তিনি পদত্যাগ করেছেন। তাঁদের মধ্যে ২০১৮ সালে ই-মেইল চালাচালি হয়েছে। এতে তাঁরা নারী বিষয়ে ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে এক বৈঠক নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।

এপস্টেইন একটি ছবি পাঠানোর পর লাইচাক জবাব দেন, ‘এসব খেলায় আমাকে ডাকেন না কেন? আমি “এমআই” মেয়েটিকে নিতাম।’ অবশ্য নথিতে কোনো ছবি দেখা যায়নি। ফাইলে নাম থাকার অর্থ কোনো অন্যায়ের প্রমাণ নয়।

স্লোভাকিয়ার সংবাদমাধ্যম অনুযায়ী, গত শুক্রবার ফাইল প্রকাশের পর লাইচাক প্রথমে নারীদের নিয়ে আলোচনার বিষয় অস্বীকার করেন। পরে বলেন, (স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী) রবার্ট ফিকোর রাজনৈতিক ক্ষতি এড়াতে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে যুক্ত অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠান এপস্টেইন

প্রকাশিত ব্যাংক বিবরণীতে দেখা যায়, এপস্টেইন যুক্তরাজ্যের লর্ড ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি অ্যাকাউন্টে ৭৫ হাজার ডলার (৫৫ হাজার পাউন্ড) পাঠিয়েছিলেন।

২০০৩ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে তিন দফায় ২৫ হাজার ডলার করে এ অর্থ পাঠানো হয়েছিল। এতে লর্ড ম্যান্ডেলসনের নাম উল্লেখ ছিল।

লর্ড ম্যান্ডেলসন বলেন, তিনি এ অর্থ পাওয়ার কোনো রেকর্ড বা স্মৃতি মনে করতে পারছেন না। নথিগুলো আসল কি না, তা–ও তিনি জানেন না।

লর্ড ম্যান্ডেলসন কিছু ই-মেইলে এপস্টেইনের একটি বাড়িতে অবস্থানের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। ই-মেইলগুলো ২০০৯ সালের ১৬ জুনের। এর আগে এপস্টেইন অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীকে যৌন নির্যাতনের দায়ে দণ্ডিত হয়েছিলেন। সাজা ভোগের সময়কালের একটি বড় অংশে তিনি দিনে অফিসে কাজ করার এবং প্রতি রাতে কারাগারে ফেরার অনুমতি পেয়েছিলেন।

ম্যান্ডেলসন যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন। কিন্তু যখন জানা যায়, দণ্ডিত হওয়ার পরও এপস্টেইনকে তিনি সমর্থনমূলক বার্তা পাঠিয়েছিলেন; তখন এক বছরের কম সময়ের মধ্যে তাঁকে অপসারণ করা হয়।

লর্ড ম্যান্ডেলসন একাধিকবার বলেছেন, এপস্টেইনের সঙ্গে তাঁর আগের বন্ধুত্বের জন্য তিনি অনুতপ্ত। তিনি বলেন, এপস্টেইনের সঙ্গে থাকাকালে তিনি অন্যায় কিছু দেখেননি। তবে তিনি তাঁর মিথ্য কথায় বিশ্বাস রেখেছিলেন।

এপস্টেইন–সংক্রান্ত নথিতে অজ্ঞাতনামা নারীদের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

ট্রাম্পের নাম শত শতবার এসেছে

নথিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম শত শতবার এসেছে। ট্রাম্পের সঙ্গে এপস্টেইনের বন্ধুত্ব ছিল। তবে তাঁর দাবি, তাঁদের মধ্যে অনেক আগে সম্পর্ক খারাপ হয়ে গেছে। তা ছাড়া তিনি এপস্টেইনের যৌন অপরাধ সম্পর্কে কিছু জানতেন না।

নথিতে ট্রাম্প, এপস্টেইন এবং অন্যান্য সুপরিচিত কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অনেক অভিযোগ আছে।

এখন পর্যন্ত ট্রাম্প তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা এপস্টেইন-সংক্রান্ত সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। অন্যদিকে এপস্টেইনের কোনো ভুক্তভোগী এখনো তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তোলেননি।

সাম্প্রতিক নথি সম্পর্কে জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস ও বিচার বিভাগ নতুন ফাইলের সঙ্গে দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তির একটি লাইনের দিকে ইঙ্গিত করে। এতে মার্কিন বিচার বিভাগ বলেছে, ‘কিছু নথিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অসত্য ও চাঞ্চল্যকর দাবি আছে, যা ২০২০ নির্বাচনের ঠিক আগে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থায় (এফবিআই) জমা দেওয়া হয়েছিল।’

বিচার বিভাগ বলছে, ‘(ট্রাম্পকে নিয়ে) দাবি ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। এতে যদি সামান্য বিশ্বাসযোগ্যতাও থাকত, তবে তা আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো।’

এপস্টেইন–সংক্রান্ত নথিতে ব্রেট টনার (সাদা পোশাকে)

মেলানিয়া প্রামাণ্যচিত্রের পরিচালক

মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পকে নিয়ে নতুন প্রামাণ্যচিত্রের পরিচালককেও নথির একটি ছবিতে দেখা গেছে। সেখানে তিনি এক তরুণীকে আলিঙ্গন করছেন।

‘রাশ আওয়ার’ চলচ্চিত্র সিরিজ ও ‘এক্স-মেন: দ্য লেটেস্ট স্ট্যান্ড’ চলচ্চিত্রের পরিচালক ব্রেট র‍্যাটনারকে একটি সোফায় এপস্টেইন ও দুই নারীর পাশে বসে থাকতে দেখা যায়, যাঁদের পরিচয় আড়াল করা হয়েছে।

এসব নথি থেকে কোনো অন্যায়ের ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। বিবিসি র‍্যাটনারের প্রতিনিধির কাছে মন্তব্য জানতে চেয়েছে।

ইলন মাস্ক

ইলন মাস্ক

নথিতে এপস্টেইন ও ধনকুবের ইলন মাস্কের মধ্যে ই-মেইল আদান-প্রদানের কথাও আছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধের কোনো অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়নি।

মাস্ক আগেই বলেছিলেন, এপস্টেইন তাঁকে তাঁর দ্বীপে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

নতুন ই-মেইলে দেখায়, মাস্ক একাধিকবার ওই দ্বীপে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। এর মধ্যে ২০১২ সালের একটি প্রস্তাবিত সফরের কথাও আছে, যেখানে তিনি এপস্টেইনকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনার দ্বীপে কোন দিন বা রাতে সবচেয়ে বড় বন্য পার্টি হবে?’

২০১২ সালের নভেম্বরের এসব ই-মেইলে দেখা যায়, এপস্টেইন ধনকুবের মাস্ককে জিজ্ঞাসা করেন, দ্বীপে হেলিকপ্টারে কতজনকে আনা-নেওয়া করতে হবে। মাস্ক জবাব দেন, শুধু তিনি এবং তাঁর তখনকার স্ত্রী তালুলাহ রাইলি থাকবেন।

২০১২ সালের বড়দিনে এপস্টেইনকে পাঠানো মাস্কের একটি ই-মেইলে দেখা যায়, তিনি জানতে চান—কোনো পার্টি পরিকল্পনা আছে কি না। কারণ, তাঁর উদ্দাম আনন্দ দরকার।

* অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিয়ে যৌনবৃত্তির বিশাল এক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার অভিযোগ ছিল এপস্টেইনের বিরুদ্ধে।* এসব নথি থেকে কুখ্যাত এ যৌন নিপীড়কের সঙ্গে অভিজাত ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

মাস্ক লেখেন, ‘এ বছর আমি মানসিক স্থিতির প্রায় শেষ সীমা পর্যন্ত কাজ করেছি। তাই বড়দিনে আমার বাচ্চারা যখন বাড়ি ফিরে যাবে, তখন আমি সত্যি সেন্ট বার্তস বা অন্য কোথাও পার্টির পরিবেশে যেতে চাই এবং উদ্দাম আনন্দ করতে চাই।’

মাস্ক আরও লেখেন, ‘শান্ত একটি দ্বীপে থাকার অভিজ্ঞতা ঠিক সেটার উল্টো, যা তিনি চান।’

২০১৩ সালের শেষ দিকের আরেক দফা ই-মেইলে মাস্ক ও এপস্টেইন ওই দ্বীপে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন এবং যাতায়াতের ব্যবস্থা ও তারিখ ঠিক করার কাজ করেন।

মাস্ক সত্যি কখনো এপস্টেইনের দ্বীপে গিয়েছিলেন কি না, তার প্রমাণ নেই। অবশ্য গত শনিবার এক্সে এক পোস্টে মাস্ক লেখেন, তিনি ‘ভালোভাবেই জানেন, এপস্টেইনের সঙ্গে কিছু ই-মেইল যোগাযোগ ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হতে পারে। বিরোধীরা তা ব্যবহার করে আমার নাম কলঙ্কিত করতে পারে।’

মাস্ক আরও বলেন, ‘আমি তা নিয়ে ভাবি না। কিন্তু আমি যেটা নিয়ে ভাবি তা হলো, আমরা যেন অন্তত চেষ্টা করি, এপস্টেইন যাঁদের সঙ্গে গুরুতর অপরাধ করেছেন, তাঁরা বিচার পান।’

এপস্টেইন–সংক্রান্ত নতুন নথিতে প্রকাশিত এক নারীর সঙ্গে বিল গেটস

বিল গেটস

এপস্টেইন নথিতে থাকা ‘অশ্লীল’ কিছু অভিযোগের জবাব দিয়েছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের এক মুখপাত্র। এর মধ্যে একটি অভিযোগ ছিল, গেটস নাকি যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এগুলো ‘সম্পূর্ণ হাস্যকর এবং পুরোপুরি মিথ্যা’ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

২০১৩ সালের ১৮ জুলাইয়ের দুটি ই-মেইল দেখে মনে হয়, এপস্টেইন এসব গেটসকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন। কিন্তু এগুলো কখনো গেটসকে পাঠানো হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয়। বার্তা দুটি এপস্টেইনের ই-মেইল অ্যাকাউন্ট থেকে পাঠিয়ে আবার একই অ্যাকাউন্টে ফেরত পাঠানো হয়েছে। গেটসের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো ই-মেইল অ্যাকাউন্ট দেখা যায় না। ই-মেইল দুটিতে স্বাক্ষর নেই।

একটি ই-মেইল বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন থেকে পদত্যাগপত্রের মতো করে লেখা হয়েছে। সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, রুশ মেয়েদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কের ‘পরিণতি সামলাতে’ গেটসের জন্য ওষুধ জোগাড় করতে হয়েছিল।

অন্য ই-মেইলটি প্রিয় বিল (ডিয়ার বিল) সম্বোধন দিয়ে শুরু। সেখানে গেটস বন্ধুত্ব শেষ করায় অভিযোগ তোলা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, গেটস নাকি যৌনবাহিত সংক্রমণ লুকোনোর চেষ্টা করেছিলেন। এ রোগ তাঁর তখনকার স্ত্রী মেলিন্ডার কাছ থেকেও গোপন করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে ই-মেইলে।

গেটসের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, ‘এসব দাবি একজন প্রমাণিত, ক্ষুব্ধ মিথ্যাবাদীর কাছ থেকে আসা। এসব সম্পূর্ণ হাস্যকর ও পুরোপুরি মিথ্যা।’

মুখপাত্র আরও বলেন, ‘নথিগুলো থেকে একটি বিষয় বোঝা যায়, গেটসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অব্যাহত না থাকায় এপস্টেইন হতাশা হয়েছিলেন। কাউকে ফাঁদে ফেলতে ও মানহানি করতে তিনি কতদূর যেতে পারেন, তা-ও এসব নথি থেকে বোঝা যায়।’

ডিওজে বলেছে, তারা ৬০ লাখ পৃষ্ঠার বেশি সম্ভাব্য প্রাসঙ্গিক নথি শনাক্ত করেছে। পর্যালোচনার পর তারা এর মধ্য থেকে প্রায় ৩৫ লাখ প্রকাশ করছে।
রো খান্না, ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান

ভুক্তভোগীদের নাম ফাঁস হওয়ার অভিযোগ

এপস্টেইনের অনেক ভুক্তভোগীর পক্ষে লড়েছেন—এমন নারী অধিকার আইনজীবী গ্লোরিয়া অলরেড। তিনি বিবিসিকে বলেন, সর্বশেষ প্রকাশিত নথিগুলোয় ভুক্তভোগীর নাম প্রকাশিত হয়ে গেছে। এর মধ্যে এমন ব্যক্তিও রয়েছেন, যাঁদের নাম আগে কখনো প্রকাশ্যে আসেনি।

অলরেড বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে...নামের ওপর একটি দাগ টানা আছে। কিন্তু তবু নাম পড়া যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘অন্য কিছু ক্ষেত্রে, ভুক্তভোগীদের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। এসব ভুক্তভোগী কখনো প্রকাশ্যে সাক্ষাৎকার দেননি, কখনো প্রকাশ্যে নিজের নাম বলেননি।’

এবারের নথিগুলো ব্যাপক কাটছাঁট করে প্রকাশ করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, এমন কাটছাঁট শুধু ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা বা বর্তমানে তদন্তাধীন তথ্য রক্ষার জন্যই করা যায়। আইনমতে, যেসব অংশ কাটছাঁট করা হবে, সেটার একটি সারসংক্ষেপ এবং আইনি ব্যাখ্যা দিতে হবে।

মার্কিন বিচার বিভাগ বলেছে, তারা ‘ভুক্তভোগীদের উদ্বেগ, ব্যক্তিগতভাবে শনাক্তযোগ্য তথ্যের অতিরিক্ত কাটছাঁট ও ছবিসহ আরও যেসব নথিতে কাটছাঁট দরকার, সেসব ঠিক করতে দিনরাত কাজ করছে।’

অলরেড বলেন, কোথায় কোথায় আরও কাটছাঁট দরকার, তা বিচার বিভাগকে জানাতে তাঁর আইনি দল কাজ করছে, যাতে ভুক্তভোগীদের পরিচয়ের সুরক্ষা দেওয়া যায়। কিন্তু অনেক মানুষ ইতিমধ্যে এসব নথি ডাউনলোড করে ফেলেছেন।

জেফরি এপস্টেইন

এপস্টেইনের আরও নথি বাকি

এপস্টেইন-সংক্রান্ত সব নথি প্রকাশ করা হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ বলেন, শুক্রবারের ফাইল প্রকাশ ‘একটি ব্যাপক বিস্তৃত নথি শনাক্তকরণ ও পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার সমাপ্তি নির্দেশ করে’। তাঁর এ বক্তব্যে এপস্টেইন ফাইল প্রকাশ নিয়ে মার্কিন বিচার বিভাগের কাজ প্রায় শেষ হওয়ার একটি পরোক্ষ ইঙ্গিত আছে।

তবে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা এখনো দাবি করছেন, বিচার বিভাগ যথাযথ যুক্তি ছাড়া অনেক বেশি নথি আটকে রেখেছে। এসব নথির পৃষ্ঠাসংখ্যা সম্ভবত প্রায় ২৫ লাখ।

এপস্টেইন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট নামের মার্কিন আইনটি জেফরি এপস্টেইন–সম্পর্কিত নথি, ই-মেইল, ছবি ও ভিডিও জনসাধারণের জন্য প্রকাশ করতে বাধ্য করছে।

নথি প্রকাশের প্রক্রিয়ায় রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস ম্যাসির সঙ্গে ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান রো খান্নাও যুক্ত ছিলেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘ডিওজে বলেছে, তারা ৬০ লাখ পৃষ্ঠার বেশি সম্ভাব্য প্রাসঙ্গিক নথি শনাক্ত করেছে। কিন্তু পর্যালোচনা ও কাটছাঁটের পর তারা মাত্র প্রায় ৩৫ লাখ প্রকাশ করেছে।’

* প্রকাশিত নথিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম শত শতবার এসেছে। ট্রাম্পের সঙ্গে এপস্টেইনের বন্ধুত্ব ছিল।* ২০১২ সালের বড়দিনে এপস্টেইনকে পাঠানো মাস্কের একটি ই-মেইলে দেখা যায়, তিনি জানতে চান, কোনো পার্টি পরিকল্পনা আছে কি না। কারণ, তাঁর উদ্দম আনন্দ দরকার।

খান্না বলেন, ‘এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে, বাকি নথিগুলো কেন আটকে রাখা হচ্ছে?’

ওই অ্যাক্ট অনুযায়ী সব নথি ১৯ ডিসেম্বর প্রকাশের কথা ছিল। আইনটি কংগ্রেসে পাস হয় গত নভেম্বরে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নথিগুলো প্রকাশ না করায় ডিওজে ব্যাপক নজরদারির মুখে পড়ে।

এ অবস্থায় সব নথি প্রকাশ করা হয়েছে কি না, তা এখনো অস্পষ্ট। ট্রাম্পের সমর্থকসহ অনেক মার্কিন নাগরিক মনে করেন, এপস্টেইনের সঙ্গে যুক্ত ধনী ও ক্ষমতাবানদের রক্ষা করতে কোনো ষড়যন্ত্র চলছিল।

গত রোববার এবিসি নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্ল্যাঞ্চ বলেন, কোনো বিচারক অনুমোদন দিলে প্রকাশতি হতে পারে—এমন ‘অল্প কিছু নথি’ বাকি আছে। এ ছাড়া এপস্টেইন-সংক্রান্ত ফাইলের বিষয়ে ডিওজের পর্যালোচনা ‘শেষ’।