
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও থমকে যাওয়া যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন মন্ত্রিসভা নিয়ে বসেছেন, ঠিক তখনই হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন বাহিনীর পাহারায় থাকা দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে ইরান।
ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) শুক্রবার বলেছে, ‘নীতি অমান্যকারী তেলবাহী ট্যাংকারগুলোতে...আঘাত করা হয়েছে এবং সেগুলোকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ সময় আরও চারটি তেলবাহী ট্যাংকার দ্রুত তাদের গতিপথ পরিবর্তন করে আগের জায়গায় ফিরে গেছে।’ জাহাজগুলো মার্কিন বিমানবাহিনীর পাহারায় একটি ‘অঘোষিত রুট’ ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করছিল।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই জানিয়েছে, জাহাজগুলোকে দুটি ভিন্ন রুট ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি পার হতে হবে। এর মধ্যে ওমান উপকূলের কাছে অবস্থিত দক্ষিণাঞ্চলীয় পথটি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোতে বোমাবর্ষণ করছে ইরান। অন্যদিকে ইরানের জাহাজ ও সমুদ্রবন্দরে নিজেদের আরোপিত অবরোধ লঙ্ঘনকারী জাহাজগুলোতে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
দুই সপ্তাহ আগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আবার যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এতে হু-হু করে বাড়ছে জ্বালানির দাম। জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলার জবাবে বৃহস্পতিবার ইরানে বড় ধরনের হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এরপরই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
শুক্রবারও লড়াই অব্যাহত ছিল। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কোনো হতাহত ছাড়াই তারা দেশটির ‘গুরুত্বপূর্ণ ও সামরিক স্থাপনা’ লক্ষ্য করে চালানো ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
লেবাননে প্রাচীন বিউফোর্ট দুর্গের কাছে রাতভর বিশাল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। তারা জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর টানেল ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয়েছে। বিকট এই বিস্ফোরণের শব্দ সমগ্র দক্ষিণ লেবাননজুড়ে শোনা যায় এবং আশপাশের শহরগুলো ছাইয়ে ঢেকে যায়। আর প্রকাশিত বিভিন্ন ছবিতে দেখা গেছে, বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শক্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাটি ধুলায় মিশে গেছে।
এ বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ করেছেন লেবাননের কর্মকর্তারা। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা তাদের উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছিল।
ট্রাম্প শক্তি প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি চালু করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান জোরালো হামলা সামান্যই ফলপ্রসূ হয়েছে। জ্বালানিসংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাস ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম চড়া রয়েছে, যা আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে ব্যালট বাক্সে রিপাবলিকানদের জয়ের সম্ভাবনাকে জটিল করে তুলছে।
যুদ্ধের ভবিষ্যতের রূপরেখা নির্ধারণের লক্ষ্যে শুক্রবার মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিড অবকাশযাপন কেন্দ্রে ট্রাম্প তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের জড়ো করেছিলেন। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট গত সপ্তাহে এক ব্রিফিংয়ে বলেছিলেন যে মন্ত্রিসভার এই বৈঠকটি হবে ‘অনেক মজার এবং মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য একসঙ্গে ভিন্নধর্মী একটি অভিজ্ঞতা।’
আলোচনার প্রধান এজেন্ডা হবে ইরান যুদ্ধ। যদিও ট্রাম্প কথা দিয়েছিলেন এই যুদ্ধ মাত্র কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হবে, কিন্তু দেখতে দেখতে তা পাঁচ মাসে গড়িয়েছে। চলতি সপ্তাহে রয়টার্স-ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি তিনজন আমেরিকানের মাত্র একজন এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন, যা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সর্বনিম্ন সমর্থন।
কংগ্রেসেও যুদ্ধের প্রতি সমর্থন কমছে। যুদ্ধ বন্ধে প্রেসিডেন্টকে বাধ্য করতে আনা প্রস্তাব সিনেটে হেরেছে মাত্র ১ ভোটের ব্যবধানে। প্রস্তাবের পক্ষে ৪৯ আর বিপক্ষে ৫০ ভোট পড়েছে।
যুদ্ধের কারণে হওয়া মূল্যস্ফীতি ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। তারা আশা করছে, এর মাধ্যমে তারা রিপাবলিকানদের কাছ থেকে প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিতে পারবে।
এই সংঘাতের ফলে জ্বালানি কোম্পানিগুলো রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এক্সনমবিলের মুনাফা দ্বিগুণ হয়েছে এবং শেভরন জানিয়েছে, তাদের মুনাফা বেড়েছে পাঁচ গুণের বেশি।