ন্যাটোর সামরিক মহড়ায় স্পেনের সেনারা
ন্যাটোর সামরিক মহড়ায় স্পেনের সেনারা

পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ নথি

ন্যাটো থেকে স্পেনকে বাদ দেওয়ার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সহায়তা ও সমর্থন করতে ব্যর্থ হওয়া ন্যাটো মিত্রদের শাস্তির আওতায় আনতে বিভিন্ন বিকল্প পথ খুঁজছে ওয়াশিংটন। পেন্টাগনের একটি অভ্যন্তরীণ ই-মেইলে স্পেনকে জোট থেকে বহিষ্কার এবং ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর যুক্তরাজ্যের দাবির বিষয়ে মার্কিন অবস্থান পর্যালোচনার মতো পদক্ষেপের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক দেশ সরাসরি সহায়তা করেনি। অনেক দেশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। এ ছাড়া আকাশসীমাও বন্ধ করে দিয়েছিল কয়েকটি দেশ। এই ‘অ্যাকসেস, বেসিং অ্যান্ড ওভারফ্লাইট’ (এবিও) অধিকার দিতে মিত্রদের অনীহা বা অস্বীকৃতিতে ওয়াশিংটন চরম হতাশ।

ই-মেইলে বলা হয়েছে, এই সুবিধা পাওয়া ন্যাটোর ক্ষেত্রে একটি ‘ন্যূনতম ভিত্তি’। বর্তমানে পেন্টাগনের উচ্চপর্যায়ে প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে একটি বিকল্প হলো ‘অবাধ্য’ দেশগুলোকে ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া। তবে কোনো মিত্রকে বহিষ্কার করা সম্ভব কি না—জানতে চাইলে ন্যাটোর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তিতে সদস্যপদ স্থগিত বা বাতিলের কোনো বিধান নেই।’

‘তারা আমাদের পাশে ছিল না’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসন শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই মিত্রদের সমালোচনা করে বলে আসছেন, তারা এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ খুলে দিতে তাদের নৌবাহিনী পাঠায়নি। এমনকি তিনি ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকিও দিয়ে রেখেছেন।

১ এপ্রিল এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, ‘আপনি আমার জায়গায় হলে কি ন্যাটো ছাড়তেন না?’ তবে পেন্টাগনের ওই ই-মেইলে যুক্তরাষ্ট্রকে ন্যাটো ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়নি, কিংবা ইউরোপ থেকে সব ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়নি। যদিও ইউরোপ থেকে মার্কিন সেনা কমানো হবে কি না, সে বিষয়ে ওই কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে

পেন্টাগনের প্রেস সেক্রেটারি কিংসলে উইলসন এই ই-মেইলের বিষয়ে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেমনটা বলেছেন—ন্যাটো মিত্রদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এত কিছু করার পরও তারা আমাদের পাশে ছিল না। মিত্ররা যাতে আর কাগজের বাঘ হয়ে না থাকে এবং নিজেদের দায়িত্ব পালন করে, সে জন্য ওয়ার ডিপার্টমেন্ট প্রধানের কাছে বিশ্বাসযোগ্য বিকল্পগুলো নিশ্চিত করবে।’

ন্যাটোর ভবিষ্যৎ

ইরান যুদ্ধের ফলে ৭৬ বছরের পুরোনো এই জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, মিত্ররা আক্রান্ত হলেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসবে কি না, তা নিয়ে নজিরবিহীন সংশয় তৈরি হয়েছে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স বলছে, মার্কিন নৌ অবরোধে যোগ দেওয়া মানে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। তবে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি হলে তারা প্রণালি খুলে দিতে সহায়তা করবে।

ন্যাটোর পতাকা

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাফ কথা—ন্যাটো কোনো ‘একতরফা রাস্তা’ হতে পারে না। বিশেষ করে স্পেনের ওপর তারা চরম ক্ষুব্ধ। কারণ, দেশটি জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয় করতে অস্বীকার করেছে। স্পেনে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

নীতিনির্ধারণী বিকল্প

পেন্টাগনের কর্মকর্তা জানান, এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হলো ইউরোপীয় দেশগুলোকে একটি কড়া বার্তা দেওয়া, যাতে তাদের ‘অযৌক্তিক প্রত্যাশা’ কমে। ই-মেইলে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, স্পেনকে বহিষ্কার করলে মার্কিন সামরিক অভিযানে খুব একটা প্রভাব পড়বে না, তবে এর একটি বড় প্রতীকী গুরুত্ব থাকবে।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘আমরা ই-মেইলের ওপর ভিত্তি করে কাজ করি না। স্পেন ন্যাটোর একজন অনুগত অংশীদার।’ তবে বেলজিয়ামের এগমন্ট ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সভেন বিস্কপ মনে করেন, স্পেনকে দেওয়া প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহারের হুমকিও জোটের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিশ্বাসে ফাটল ধরাবে।

ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ

ই–মেইলে আরও একটি চাঞ্চল্যকর প্রস্তাব রয়েছে। সেখানে ইউরোপের দীর্ঘদিনের ‘সাম্রাজ্যবাদী অধিকার’ যেমন আর্জেন্টিনার নিকটবর্তী ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের প্রতি মার্কিন কূটনৈতিক সমর্থন পুনর্বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে দ্বীপপুঞ্জটি যুক্তরাজ্যের শাসনাধীন হলেও আর্জেন্টিনা এটি নিজেদের দাবি করে। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র।

ইরান যুদ্ধে যোগ না দেওয়ায় ট্রাম্প এর আগে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে ‘কাপুরুষ’ বলে অপমান করেছিলেন এবং যুক্তরাজ্যের বিমানবাহী রণতরিগুলোকে ‘খেলনা’ বলে উপহাস করেছিলেন। চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছিলেন, ইরান যুদ্ধ অনেক কিছু সামনে এনে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আপনি বিপদে পড়লে যদি আপনার মিত্ররা পাশে না থাকে, তবে সেই জোটের কোনো মানে হয় না।’