
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় দুর্বল দিকটি কী? এর উত্তর এক কথায় এভাবে দেওয়া যায়—ইউরোপের ওয়াশিংটনকে যতটা প্রয়োজন, এই মহাদেশকে ওয়াশিংটনের তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী পক্ষ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশ ঘটে ইউরোপে। তারা মহাদেশটির পশ্চিম অংশে সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে, ওই অঞ্চলের নিরাপত্তাকাঠামোর সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে এবং কয়েক দশক ধরে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতায় ইউরোপকে অগ্রবর্তী ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার শুরু করে।
এভাবে ১৯৪০-এর দশকের শেষভাগে তারা পশ্চিম ইউরোপের অভিজাতদের কমিউনিস্ট আন্দোলনের হুমকি থেকে রক্ষা করে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের এই সুরক্ষাকে একদিকে যেমন উপকার হিসেবে দেখা হয়, একই সঙ্গে বার্লিন, প্যারিস বা লন্ডনে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড কখনোই পুরোপুরি ক্ষমার চোখে দেখা হয়নি।
এর অর্থ এই নয় যে সেই দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ থেকে পশ্চিম ইউরোপ এখন নিজের ট্রান্স–আটলান্টিক অভিভাবকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে যাচ্ছে; বরং পশ্চিম ইউরোপের অভিজাত শ্রেণি এখন আরও বেশি সতর্ক এবং আরও বেশি আপসকামী হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র যখনই কোনো দুর্বলতা দেখাবে, ইউরোপীয়রা সুযোগসন্ধানী হয়ে উঠবে এবং কোনো আবেগ দেখানো ছাড়াই ওই পরিস্থিতির সুযোগ নেবে।
বলা যায়, সে সময় এখন এসে গেছে।
ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো এমন সুযোগ তৈরি করেছে এবং পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো সে সুযোগ এরই মধ্যে কাজে লাগাতে শুরু করেছে। এর সবচেয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের আচরণে, যখন তিনি হঠাৎ ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গী না হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
যারা এখনো ট্রান্স–আটলান্টিক জোটের অটুট ঐক্যে বিশ্বাস করেন, তাদের কাছে এটি আশ্চর্যজনক মনে হতে পারে; কিন্তু বাস্তবে গত ৮০ বছরের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের সম্পর্ক যে যুক্তিতে টিকে আছে, এটি তার মোটেও সামঞ্জস্যহীন নয়।
এখন এই অঞ্চলের অন্য বড় শক্তিগুলোও সম্ভবত একই ধরনের সতর্ক অবস্থান নেবে। এমনকি ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বা সামরিক জোটটিকে দুর্বল করে দেওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির পরও তাদের ওয়াশিংটনের সমর্থনে হরমুজ প্রণালিতে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর আশঙ্কা আসলেই কম।
পশ্চিম ইউরোপ একটি মৌলিক বিষয় খুব ভালো করেই বোঝে। সেটি হলো এই মহাদেশে তাদের ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ভূরাজনৈতিকভাবে এখান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।
তাই ন্যাটো মূলত বাইরের হুমকি থেকে স্থানীয় জনগণকে (ইউরোপীয়দের) রক্ষা করার জন্য রয়েছে—এমন প্রচলিত ধারণা অনেকাংশেই একটি সুবিধাবাদী কল্পিত ব্যাখ্যা। এটি অন্য একটি মৌলিক বাস্তবতাকে আড়াল করে; আর তা হলো এই ‘বিশেষ সম্পর্ক’ বজায় রাখার মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি কৌশলগত সুবিধা নেয় ওয়াশিংটন।
ওয়াশিংটন যেসব ঝুঁকিতে পড়তে পারে
প্রথমত, একটি ভৌগোলিক ঘাঁটি হিসেবে ইউরোপকে হারালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্য মৌলিকভাবে বদলে দেবে। তাদের মাঝখানে তখন আর এই ‘গ্রে জোন’ থাকবে না। ফলে যেকোনো সংঘাত মুহূর্তেই আরও অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
দ্বিতীয়ত, রাশিয়ার সীমান্তের কাছে পারমাণবিক সক্ষমতাসহ সামরিক সম্পদ মোতায়েন করে চাপ প্রয়োগের যে সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে, ইউরোপকে হারালে তাদের সেই সক্ষমতা আর থাকবে না। এখানে উল্লেখ্য, ইউরোপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এ সুযোগ থাকলেও পশ্চিম গোলার্ধে রাশিয়ার হাতে এমন সুযোগ নেই।
তৃতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউরোপ থেকে সরে যায়, তাহলে মস্কোর দৃষ্টিতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো অর্থবহ কৌশলগত সংলাপ দেশটির কাছে ক্রমে অর্থহীন হয়ে পড়বে। এর ফলে রাশিয়া আরও দ্রুত চীনের দিকে ঝুঁকে যেতে পারে।
অন্যভাবে বলতে গেলে, ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি কোনো দান বা উদারতা নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। অন্যান্য বড় শক্তির সঙ্গে বৃহত্তর প্রতিযোগিতায় কূটনৈতিক ও কৌশলগত চাপ প্রয়োগ করতে এই সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাতিয়ার হয়ে আছে।
পশ্চিম ইউরোপের নেতারা এ বিষয়টি খুব ভালোভাবেই বোঝেন। সঙ্গে তাঁরা আরেকটি বিষয়ও খুব ভালোভাবে বোঝেন; তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তাকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, বাস্তবে তা ঠিক ততটা নিশ্চিত নয়।
এমনকি স্নায়ুযুদ্ধের সময়ও ইউরোপের খুব কম মানুষ সত্যি সত্যি এটা বিশ্বাস করতেন যে প্যারিসে সোভিয়েত হামলা হলে তার জবাব দিতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের শহর নিউইয়র্ক বা বোস্টনকে ঝুঁকিতে ফেলবে।
এই সংশয় থেকেই ইউরোপ একটি স্বতন্ত্র কৌশলগত অবস্থান গড়ে তুলেছে, বিশেষ করে ফ্রান্সের পারমাণবিক নীতিমালা। ওই নীতিমালায় যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষার ওপর নির্ভর না করে জবাব দিতে সরাসরি সোভিয়েত শহরগুলোতে পাল্টা হামলাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
ট্রান্স–আটলান্টিক সম্পর্ক ভারসাম্য হারাচ্ছে
স্বতন্ত্র কৌশলগত অবস্থান গড়ে তোলা ইউরোপের এই যুক্তির গুরুত্ব এখনো শেষ হয়ে যায়নি; বরং এটি এখন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ন্যাটোর সম্প্রসারণ এমন সব দেশকেও নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় এনেছে, যেগুলো কৌশলগতভাবে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স বা জার্মানির তুলনায় অনেক কম গুরুত্ব রাখে।
একই সময়ে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরেছে। তারা এমনকি ছোট ছোট উপসাগরীয় দেশকেও প্রতিশোধমূলক হামলা (ইরানের দিক থেকে) থেকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের এই অক্ষমতা তার নিরাপত্তা-ছাতার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে।
দশকের পর দশক ধরে ট্রান্স–আটলান্টিক সম্পর্ক একটি অলিখিত বোঝাপড়ার ওপর ভিত্তি করে চলছিল। পশ্চিম ইউরোপ ভান করত যে তার সুরক্ষার প্রয়োজন আছে; আর যুক্তরাষ্ট্র ভান করত যে তারা সেই সুরক্ষা দিচ্ছে। এই ব্যবস্থা উভয় পক্ষের জন্যই সুবিধাজনক ছিল।
কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রশাসন সেই ভারসাম্য বিঘ্নিত করেছে। তাদের অস্থিরভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দূরদৃষ্টির অভাব এই অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। এর ফলে পশ্চিম ইউরোপের অভিজাত শ্রেণি নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পেয়েছে। এই সুযোগকে কাজেও লাগাচ্ছে তারা।
তবে এর মানে এই নয় যে ইউরোপীয়রা যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। দুটি সীমাবদ্ধতা এখনো নির্ধারক হিসেবে রয়ে গেছে।
প্রথমত, ইউরোপের অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত থাকায় আলাদা হওয়ার সুযোগ এখনো সীমিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একক বাজার গড়ে তোলার মাধ্যমে এই নির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে ইউরোপ; তবে তারা এ লক্ষ্যে কেবল আংশিক সফলতা পেয়েছে।
দ্বিতীয়ত, পশ্চিম ইউরোপের সরকারগুলো এখনো রাশিয়ার সঙ্গে তাদের জটিল সম্পর্ক সামলাতে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির ওপর নির্ভরশীল।
তবে বর্তমান সংঘাতের পরও মস্কোর সঙ্গে শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর একটি দীর্ঘ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ইউরোপের রয়েছে; কিন্তু আপাতত দ্রুত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য যথেষ্ট কারণ দেখা যাচ্ছে না।
পশ্চিম ইউরোপের সুযোগের সদ্ব্যবহারের চেষ্টা
এ পর্যন্ত পরিস্থিতিতে যতটুকু পরিবর্তন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, তা ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের মধ্যে অংশীদারত্বের ভারসাম্যে।
ইউরোপীয় অভিজাত শ্রেণি এখন কৌশলগতভাবে নিজেদের আরও বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে মনে করছে। তারা এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ছাড় আদায়, প্রতিশ্রুতি পুনর্গঠন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে নিজেদের ঝুঁকি কমাতে চাইছে।
অন্যদিকে ওয়াশিংটন নিজেকে একটি কঠিন অবস্থানে নিয়ে ফেলেছে। তারা একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে, পশ্চিম ইউরোপের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চাইছে এবং চীনের সঙ্গে একটি কৌশলগত সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই লক্ষ্যগুলোকে একটিকে অন্যটির সঙ্গে করা একেবারেই সহজ কাজ নয়।
এর ফলে সম্পর্কের ভেতর দুর্বলতা তৈরি হয়েছে; এবং সেটা প্রাথমিকভাবে মস্কো বা বেইজিংয়ে নয়; বরং ট্রান্স–আটলান্টিক সম্পর্কের ভেতরে।
নিজেদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই যুক্তরাষ্ট্র তার ইউরোপীয় মিত্রদের একাধিক সুবিধা দিয়ে ফেলেছে। ইউরোপ সেগুলো কাজে লাগাবে সতর্কতার সঙ্গে; কিন্তু দৃঢ়ভাবে।
এদিকে ওয়াশিংটন কীভাবে আবার ট্রান্স–আটলান্টিক সম্পর্কের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে চায়, তা এখনো স্পষ্ট নয়। অথবা এমনও হতে পারে, তারা কী হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে; সেটা তারা আদৌ পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছে না।