বাংলাদেশ–ইইউ সম্পর্ক উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে রাজনৈতিক অংশীদারত্বে উত্তরণ ঘটছে

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট কায়া কাল্লাস (ডানে)ছবি: কোলাজ

বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সম্পর্ক উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে রাজনৈতিক অংশীদারত্বে উত্তরণ ঘটতে যাচ্ছে।

অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি (পিসিএ) প্রাথমিক স্বাক্ষরের (ইনিশিয়াল সাইনিং) মধ্য দিয়ে এই উত্তরণের পথে এক ধাপ এগিয়ে যাবে দুই পক্ষ। আগামীকাল সোমবার ব্রাসেলসে ইইউ সদর দপ্তরে দুই পক্ষ প্রাথমিক স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে।

এদিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে ইইউর পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তানীতি–বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি এবং ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট কায়া কাল্লাসের বৈঠক হবে। বৈঠকের পর চুক্তির প্রাথমিক স্বাক্ষর হবে।

ঢাকা ও ব্রাসেলসের কূটনৈতিক সূত্রগুলো গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে জানায়, এক বছরের বেশি সময় ধরে পাঁচ দফা আলোচনা শেষে দুই পক্ষ ৮৩টি ধারাসংবলিত পিসিএর খসড়া চূড়ান্ত করে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রথম দেশ হিসেবে বাংলাদেশই এ চুক্তিতে সই করবে।

ঢাকা ও ব্রাসেলসের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশের পক্ষে সই করবেন নজরুল ইসলাম। ইইউর পক্ষে জোটের এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পাওলা প্যাম্পালোনি সই করবেন।
আরও পড়ুন

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলি) মো. নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ১৯ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ব্রাসেলস সফরে যাচ্ছে। সফরকালে তিনি কায়া কাল্লাসের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বৈঠকের পর ঢাকা ও ব্রাসেলস পিসিএ প্রাথমিক স্বাক্ষর করবে।

ঢাকা ও ব্রাসেলসের কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাংলাদেশের পক্ষে সই করবেন নজরুল ইসলাম। ইইউর পক্ষে জোটের এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পাওলা প্যাম্পালোনি সই করবেন।

ব্রাসেলসের একটি কূটনৈতিক সূত্র এই প্রতিবেদককে জানিয়েছে, ইংরেজিতে পিসিএ প্রাথমিক স্বাক্ষরের পর তা ইউরোপের ২৪টি ভাষায় অনূদিত হবে। এরপর ইইউর ২৭টি দেশ চুক্তিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে। অনুমোদনের পর চূড়ান্তভাবে সই হবে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চুক্তিটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের মাধ্যমে তা সইয়ের জন্য চূড়ান্ত হবে। ঢাকার কূটনৈতিক সূত্র বলছে, আশা করা হচ্ছে, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে চুক্তিটি চূড়ান্তভাবে সইয়ের পর তার বাস্তবায়ন শুরু হবে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্রাসেলস সফরের সময় ইইউর সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হতে পারে। আলোচনায় থাকতে পারে জ্বালানি সহযোগিতা, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থিতায় সমর্থনের মতো বিষয়।

বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পতাকা
ছবি: বাসস

পিসিএ কী

২০০১ সালে ইইউর সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি সই করে বাংলাদেশ। চুক্তিটি ছিল মূলত উন্নয়ন সহযোগিতাকেন্দ্রিক। চুক্তিটিতে অর্থনীতি, উন্নয়ন, সুশাসন ও মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এখন ইইউর সঙ্গে পিসিএ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ইইউর ওয়েবসাইটে প্রচারিত তথ্য অনুযায়ী, পিসিএ হলো আইনগত বাধ্যতামূলক চুক্তি। এ চুক্তি ইইউ ও অংশীদার দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি রূপরেখা প্রতিষ্ঠা করে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ইইউর প্রস্তাবিত পিসিএর আওতায় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার, সংযুক্তি, প্রতিরক্ষা, ইন্টারনেট নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি, মৎস্য, দক্ষ অভিবাসন, কৃষিসহ প্রায় ৩৫টি খাত রয়েছে।

অর্থাৎ এই সহযোগিতার পরিধিতে রয়েছে গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সমর্থন করা। একটি শক্তিশালী মুক্তবাজার অর্থনীতিসহ ব্যবসা ও বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সহায়ক পরিবেশের বিকাশ নিশ্চিত করা। নানা ক্ষেত্রে বাণিজ্য সম্পর্ক ও সহযোগিতা জোরদার করা।

পিসিএ সই হলে ইইউর সঙ্গে বাংলাদেশের যে সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে, তা আর কার্যকর থাকবে না।

ভবিষ্যতে এই চুক্তির আলোকেই রাজনৈতিক অংশীদারত্ব এগিয়ে যাবে। এই অংশীদারত্বের সুফল নিশ্চিত করতে হলে বাংলাদেশকে প্রতিটি খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করে সমন্বিত প্রক্রিয়ায় চুক্তি বাস্তবায়নে সচেষ্ট হতে হবে।
মো. শহীদুল হক, সাবেক পররাষ্ট্রসচিব
আরও পড়ুন

রাজনৈতিক উত্তরণের অভিপ্রায়

বাংলাদেশ–ইইউর মধ্যে সম্পর্কের পরিসর বাড়ানোর লক্ষ্যে ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবরে দুই পক্ষের মধ্যে পিসিএর বিষয়ে আলোচনা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছিল।

এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির প্রথম দফার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে বাংলাদেশে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় তখন পিসিএ নিয়ে আলোচনা স্থগিত করে ইইউ।

পরবর্তী সময়ে ইইউ অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে পিসিএ সইয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের নভেম্বরে ঢাকায় অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছিল।

এখন বিএনপির নতুন সরকারের সময় পিসিএ হতে যাচ্ছে। ঢাকা ও ব্রাসেলসের কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, চুক্তিটি হলে বাংলাদেশ–ইইউ সম্পর্ক উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে রাজনৈতিক অংশীদারত্বে উত্তরণের পথে এক ধাপ অগ্রগতি হবে।

পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে পিসিএ সই বাংলাদেশ-ইইউ সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হবে বলে মনে করেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ভবিষ্যতে এই চুক্তির আলোকেই রাজনৈতিক অংশীদারত্ব এগিয়ে যাবে। এই অংশীদারত্বের সুফল নিশ্চিত করতে হলে বাংলাদেশকে প্রতিটি খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করে সমন্বিত প্রক্রিয়ায় চুক্তি বাস্তবায়নে সচেষ্ট হতে হবে।

আরও পড়ুন