‘তাঁর তোলা প্রতিকৃতিগুলো অমূল্য সম্পদ’

নাসির আলী মামুনের ৬৭তম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনের পর ঘুরে দেখেন অতিথিরা। বাংলা একাডেমি, ঢাকা; ১৪ এপ্রিল ২০২৬ছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশে প্রতিকৃতি (পোর্ট্রেট) আলোকচিত্রের ক্ষেত্রে নাসির আলী মামুনকে পথিকৃৎ। তাঁর তোলা প্রতিকৃতিগুলো অমূল্য সম্পদ। বিখ্যাত লেখক-শিল্পীসহ বহু গুণী মানুষের ছবি তাঁর কাছে সংরক্ষিত আছে, যাঁর কোনো আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে ‘ফটোজিয়াম: স্মৃতি–বিস্মৃতির মুখচ্ছবি’ শীর্ষক নাসির আলী মামুনের ৬৭তম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে একুশে পদকপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলাম এ কথা বলেন।

প্রতিকৃতি আলোকচিত্রকে অত্যন্ত সংবেদনশীল শিল্পমাধ্যম উল্লেখ করে মনিরুল ইসলাম বলেন, একটি ভালো প্রতিকৃতি তুলতে হলে শুধু বাহ্যিক অবয়ব নয়, মানুষের ভেতরের ব্যক্তিত্ব ধরতে হয়। অনেক সময় একজন আলোকচিত্রীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় সঠিক মুহূর্তটির জন্য। সেই এক সেকেন্ড বা তারও কম সময়ে ঠিক মুহূর্তটি ধরতে পারলেই তৈরি হয় একটি সফল ছবি। সেদিক থেকে নাসির আলী মামুনের আলোকচিত্রগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা জরুরি বলেও মনে করেন তিনি।

মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘ফটোগ্রাফি ও চিত্রকলার মৌলিক ভাবনা এক হলেও প্রকাশভঙ্গি ভিন্ন। ফটোগ্রাফি হলো আলো দিয়ে ছবি আঁকা আর চিত্রশিল্পীরা আঁকেন তুলি বা পেনসিলে। কিন্তু সৃজনপ্রক্রিয়াটা একই।’

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তিনি বলেন, কোনো লেখক বা শিল্পীর কাজকে তাঁর জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে তাঁর মহত্ত্বের পরিচয় পাওয়া যায় না। সেদিক থেকে নাসির আলী মামুন লেখকদের আলোকচিত্র সংরক্ষণ করার যে কাজ করছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এমন একটি মিউজিয়াম (জাদুঘর) খুঁজছেন, যেখানে এই ছবিগুলো যত্ন করে রাখা হবে।

আরও পড়ুন
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন চিত্রশিল্পী মনিরুল ইসলাম। বাংলা একাডেমি, ঢাকা; ১৪ এপ্রিল ২০২৬
ছবি: প্রথম আলো

প্রদর্শনীর ছবিগুলো সম্পর্কে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, এই ছবিগুলো দেখলে লেখকদের জীবন ও কাজ সম্পর্কে নতুন ধারণা জন্মাবে। তরুণ প্রজন্ম যদি এই ছবিগুলোর মাধ্যমে লেখকদের সম্পর্কে জানতে পারে, তবে তা জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন। তিনি বলেন, ‘বিশ্ব ফটোগ্রাফির দুই শ বছর উদ্‌যাপিত হচ্ছে। ১৮২৬ থেকে ২০২৬—এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে আমি ৫৬ বছর যাবৎ অ্যাকটিভ (সক্রিয়), সে জন্য আমি নিজেকে অত্যন্ত ভাগ্যবান মনে করি।’

বাংলা একাডেমির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে নাসির আলী মামুন বলেন, বাংলা একাডেমি ১৯৭৭ সালে নাসির আলী মামুনকে আবিষ্কার করেছিল। ১৯৭৭ সালের বাংলা একাডেমি বইমেলায় আমার প্রথম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।

এবারের আয়োজনকে ‘ফটোজিয়াম’ বলার কারণও ব্যাখ্যা করেন নাসির আলী মামুন। তিনি বলেন, ‘এটি আমার একটি প্রস্তাবিত জাদুঘর। এখানে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের শ্রেষ্ঠ মানুষদের, খ্যাতিমান মানুষদের…পোর্ট্রেট, চিঠিপত্র, হস্তাক্ষর, পাণ্ডুলিপি, ডায়েরি এবং অডিও–ভিজ্যুয়াল সামগ্রী জাদুঘরের চারদেয়ালের মধ্যে স্থায়ী প্রদর্শনীর জন্য রাখা হবে।’

স্বাগত বক্তব্যে বাংলা একাডেমিক মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম বলেন, নাসির আলী মামুনের আলোকচিত্র মানে তাতে বিচিত্র রকমের নতুনত্ব, বিচিত্র রকমের ব্যঞ্জনা থাকবে। আগে দেখা হয়নি, বলা হয়নি, উপলব্ধি করা হয়নি—এমন বহু কিছুর অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের উদ্ভাস। ফলে এখানে প্রদর্শিত ছবিগুলো যাঁরা দেখবেন, তাঁরা পরিচিতের মধ্যে বহু অপরিচিতের আভাস পেয়ে যাবেন। সৃজনশীল ভাবনার খোরাক পেয়ে যাবেন।

আরও পড়ুন
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন। বাংলা একাডেমি, ঢাকা; ১৪ এপ্রিল ২০২৬
ছবি: প্রথম আলো

অনুষ্ঠান শেষে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসের নিচতলায় ফিতা কেটে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। দুই তলাজুড়ে প্রদর্শিত হচ্ছে দেশের খ্যাতিমান প্রয়াত কবি, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও কথাসাহিত্যিকদের দুর্লভ কিছু আলোকচিত্র। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, পল্লিকবি জসীমউদ্​দীন, কবি শামসুর রাহমান, কবি আল মাহমুদ, সাহিত্যিক আহমদ ছফা, কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের প্রতিকৃতি।

৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এ প্রদর্শনী চলবে। ১৪ থেকে ২০ এপ্রিল প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা এবং ২১ থেকে ৩০ এপ্রিল সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

আরও পড়ুন