চট্টগ্রামে সরফভাটায় চলে ‘সন্ত্রাসীদের শাসন’

খুন, অপহরণ ও চাঁদাবাজিতে আতঙ্কিত অর্ধলক্ষ মানুষ; মামলা করেও নিরাপত্তা মেলে না, ভয়ে বসতভিটা ছেড়েছে অনেক পরিবার।

মীরেরখীল বাজারের সড়কে ৭০ বছর বয়সী নুরুল ইসলাম তালুকদার রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিলেন প্রায় আধা ঘণ্টা। হামলাকারীরা দিনের আলোয় প্রকাশ্যে কুপিয়ে চলে গেলেও দীর্ঘক্ষণ কেউ তাঁর কাছে যাননি। পরদিন হাসপাতালে মারা যান স্থানীয় বাজারের এই ব্যবসায়ী। পরিবার এ ঘটনায় কোনো মামলা করেনি।

ঘটনাটি ঘটে গত ২৫ মার্চ চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার সরফভাটা ইউনিয়নে। স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, নুরুল ইসলামের কাছে কয়েক দফায় চাঁদা চাওয়া হয়েছিল। হত্যার কয়েক দিন আগেও তাঁর কাছে দুই লাখ টাকা চায় সন্ত্রাসীরা। 

নুরুল ইসলামের ছেলে মো. জামাল উদ্দিন তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আম্মা আগেই মারা গেছেন। বাবাকেও হত্যা করা হলো। মাঝেমধ্যে বাড়িতে গিয়ে আব্বা–আম্মার কবর জিয়ারত করি। মামলা করলে কবর জিয়ারতের জন্য বাড়িতে যাওয়াটাও বন্ধ হয়ে যাবে। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আত্মীয়স্বজনদের পরামর্শে মামলা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পুলিশও আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি।’

আরও পড়ুন

কর্ণফুলী নদী, পাহাড় ও বনঘেরা সরফভাটায় নুরুল ইসলামের হত্যাকাণ্ড বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর খুন বা নিখোঁজ হওয়া আরও চার ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, তাঁরাও মামলা করেননি। এ নিয়ে তাঁরা গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতেও ভয় পান। তাঁদের কথা, ‘এ নিয়ে কথা বলে বিপদ বাড়ানো যাবে না।’

সরফভাটার পরিস্থিতি জানতে তিন দিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে নানা শ্রেণি–পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রথম আলোর দুই প্রতিবেদক। খুন, জখম ও চাঁদাবাজির শিকার অন্তত ২২টি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হয়। ছয়টি পরিবারের সদস্য সরফভাটার বাইরে এসে কথা বলেছেন। তাঁদের প্রত্যেকের ভাষ্য, সরফভাটায় বসে সন্ত্রাসীদের বিষয়ে কথা বলাও নিরাপদ নয়।

সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাড়ি নির্মাণ, ব্যবসা কিংবা প্রবাস থেকে ফেরার খবর পেলেই চাঁদা দাবি করে সন্ত্রাসীরা। কাউকে কাউকে মাসিক ভিত্তিতেও চাঁদা দিতে হয়। চাহিদামতো টাকা না দিলে বা প্রতিবাদ করলে হামলা, অপহরণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সন্ধ্যার পর ফাঁকা হয়ে যায় অধিকাংশ পথ। নিরাপত্তাহীনতায় অনেকে বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষায়, ‘এখন সন্ত্রাসীদের শাসন চলে।’

আরও পড়ুন

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক কুতুব উদ্দিন বাহারও প্রথম আলোকে বলেন, সরফভাটার পশ্চিমাংশ, মীরেরখীল ও পাহাড়ঘেঁষা বিভিন্ন গ্রামের বহু মানুষ সন্ত্রাসীদের ভয়ে এলাকা ছেড়েছেন। পাহাড়ঘেঁষা বিভিন্ন এলাকায় যাঁরা এখনো বসবাস করছেন, তাঁদের অনেককেই টাকা দিয়ে থাকতে হচ্ছে। যাঁদের সামর্থ্য আছে, তাঁরা শহর বা অন্য এলাকায় চলে গেছেন। আর যাঁদের যাওয়ার সামর্থ্য নেই, তাঁরা কষ্ট করে চাঁদা বা মাসোহারা দিয়ে সেখানে থাকছেন। 

বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, বিয়ে, ব্যবসা, প্রবাস থেকে দেশে ফেরা—এমন বিভিন্ন উপলক্ষেও টাকা দাবি করা হয়। বাজারে লেবু বিক্রি করেন—এমন লোকের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা নেওয়া হয়। টাকা না দিলে হামলা ও মারধরের ঘটনাও ঘটছে।

সরফভাটার পরিস্থিতি জানতে তিন দিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে নানা শ্রেণি–পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রথম আলোর দুই প্রতিবেদক। খুন, জখম ও চাঁদাবাজির শিকার অন্তত ২২টি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা হয়। ছয়টি পরিবারের সদস্য সরফভাটার বাইরে এসে কথা বলেছেন। তাঁদের প্রত্যেকের ভাষ্য, সরফভাটায় বসে সন্ত্রাসীদের বিষয়ে কথা বলাও নিরাপদ নয়।

তবে চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম দাবি করেন, সরফভাটার পরিস্থিতি এখন মোটামুটি স্বাভাবিক। তবে পাহাড়ি এলাকায় কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মাঝেমধ্যে পাহাড় থেকে নেমে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ও ঝামেলা করে। ভৌগোলিক অবস্থান এবং পুলিশের জনবল কম থাকায় ওই এলাকায় কাজ করাও কিছুটা কঠিন।

আরও পড়ুন

অলিখিত শাসন তিন গোষ্ঠীর

সরফভাটার মীরেরখীল, জঙ্গল সরফভাটা, হাজারীখীল ও চিড়িংগার দিকে পাহাড়ি পথ। পশ্চিমে কর্ণফুলী নদী; সেতু পেরোলেই মূল সড়ক। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বোয়ালখালী এবং আরও দক্ষিণের পটিয়া–চন্দনাইশের পাহাড়ি ও নদীপথ ধরে সশস্ত্র ব্যক্তিরা যাতায়াত করেন। দুর্গম এই ভূগোলকে চলাচল ও আত্মগোপনের কাজে ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীর বালু, পাহাড়ের মাটি ও জমি দখল এবং গাছ কাটার নিয়ন্ত্রণ ঘিরে সরফভাটায় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় তারা পরে সাধারণ মানুষের ওপরও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বিএনপির বিভিন্ন পক্ষ সক্রিয় হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। দলীয় পদ ব্যবহার করে কেউ অপরাধে জড়িয়েছেন, কেউ অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয় লোকজনের। এতে সরফভাটার ২২টি গ্রামের প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।

সরেজমিন অনুসন্ধান ও স্থানীয় মানুষের বক্তব্যে সরফভাটায় দুটি পুরোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর পাশাপাশি নতুন একটি চক্রের সক্রিয়তার কথা জানা গেছে। পুরোনো একটি গোষ্ঠীর নেতৃত্বে আছেন মো. কামাল ওরফে গলাকাটা কামাল। অন্যটি গিয়াস ও তাঁর ভাই সাইফুলের অনুসারীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে। দুই পক্ষের মধ্যে পুরোনো হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ এবং অবৈধ ব্যবসা ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ রয়েছে।

আরও পড়ুন

দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ হিলাল উদ্দীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, সরফভাটায় দীর্ঘদিন ধরে কামাল এবং গিয়াস-সাইফুল—এই দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। আগে কামালরা আওয়ামী লীগের হাছান মাহমুদের ভাই এরশাদ মাহমুদের ছত্রচ্ছায়ায় ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সবকিছু নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। 

ওসি বলেন, এখন সন্ত্রাসীরা এলাকায় স্থায়ীভাবে না থাকলেও পাহাড়ে অবস্থান করে এবং মাঝেমধ্যে দলবদ্ধভাবে নেমে হামলা ও চাঁদাবাজি করে। এ কারণে স্থানীয় মানুষের মধ্যে এখনো ভয় রয়েছে। সরফভাটার অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে উচ্চপর্যায়ে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে।

সরেজমিন অনুসন্ধান ও স্থানীয় মানুষের বক্তব্যে সরফভাটায় দুটি পুরোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর পাশাপাশি নতুন একটি চক্রের সক্রিয়তার কথা জানা গেছে। পুরোনো একটি গোষ্ঠীর নেতৃত্বে আছেন মো. কামাল ওরফে গলাকাটা কামাল। অন্যটি গিয়াস ও তাঁর ভাই সাইফুলের অনুসারীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে। দুই পক্ষের মধ্যে পুরোনো হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ এবং অবৈধ ব্যবসা ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ রয়েছে।

স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, ২০১১ সালে এক নারী হত্যা মামলায় কামালের নাম আসে। এক সহযোগীকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ নিহত নারীর মাথা উদ্ধার করে। এ ঘটনার পর এলাকায় তিনি ‘গলাকাটা কামাল’ নামে পরিচিত হন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিপক্ষ গ্রুপের গিয়াসকে বাড়িতে না পেয়ে তাঁর মা–বাবাকে হত্যা করেছিলেন কামাল। ওই জোড়া হত্যার পর গিয়াস ও সাইফুলও সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে তোলেন।

এই দুই গোষ্ঠীর বাইরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে ফেরা আবুধাবি বিএনপির সভাপতি ও সরফভাটা ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সভাপতি ইসমাইল হোসেন তালুকদারের অনুসারীদের নতুন একটি চক্র সক্রিয় হয়। স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ, ২০০১ থেকে ২০০৫ সালেও বিভিন্ন ঘটনায় ইসমাইলের নাম এসেছিল। দেশে ফিরে তিনি আবার নিজ অনুসারীদের সংগঠিত করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা–কর্মীদের ব্যবসা দখল এবং অবৈধ বালুর ব্যবসায় ভাগ বসিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে কামাল গ্রুপের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে বলেও এলাকায় প্রচার আছে।

এই তিন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের বক্তব্য জানতে তাঁদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়নি। কেউ পলাতক আছেন। কেউ জামিনে মুক্ত থাকলেও প্রকাশ্যে কম থাকেন। 

তবে আবুধাবি বিএনপির সভাপতি ইসমাইল হোসেন তালুকদারের বিষয়ে জানতে চাইলে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক কুতুব উদ্দিন বাহার প্রথম আলোকে বলেন, কর্ণফুলী নদীর বালুর ব্যবসার সঙ্গে ইসমাইলের সম্পৃক্ততা আছে বলে তিনি জানেন। এলাকার প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। তবে সরফভাটায় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদাবাজি ও হয়রানি করা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ইসমাইল সরাসরি জড়িত—এমন তথ্য তাঁর কাছে নেই।

সন্ধ্যা নামলেই পাল্টে যায় জনপদ

সম্প্রতি সরেজমিন গিয়ে সরফভাটার চিড়িংগাসহ কয়েকটি এলাকার নাম বলতেই কয়েকজন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সেখানে যেতে রাজি হননি। একজন বললেন, ‘ওই এলাকা ভালো না।’ পরে এক চালক যেতে রাজি হলেন। তিনি জানান, খুন–জখমের কারণে অনেক এলাকায় যেতে মানুষ ভয় পান। চিড়িংগা যাওয়ার পথে বাজার ছিল প্রায় জনশূন্য; অনেক ঘরবাড়িও খালি দেখা যায়। সেখানকার বনবিটের কর্মীরা জানান, খুনোখুনির কারণে এলাকায় মানুষ কমে গেছে।

বনবিটের পাশের মসজিদের ইমাম আহমেদ উল্লাহ জানান, সেখানে একসময় শত শত মানুষ জড়ো হতেন এবং পণ্য বেচাকেনা হতো। সন্ত্রাসীদের ভয়ে বাজারটি প্রায় পাঁচ বছর ধরে বন্ধ।

মূল সড়কের দিকে কিছুটা এগোলেই এনাম হোসেনের বাড়ি। ২০২১ সালের ১৬ আগস্ট মুখ থেঁতলানো ও মাথা জখম অবস্থায় সরফভাটার হাজারীখীল আহমদ ছফা মেম্বার সড়কে তাঁর লাশ পাওয়া যায়। তাঁর বাড়িতে গেলে পরিবারের সদস্যরা হত্যাকাণ্ড নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তাঁরা কোনো মামলাও করেননি।

রাতের অন্ধকারে পাহাড় থেকে কখন কে এসে হামলা করে—এই ভয়টা মানুষের মধ্যে আছে। আমরা তাদের ধরতে নিয়মিত কাজ করছি।
দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি হিলাল উদ্দীন আহমেদ

সেখানে এক নারী ও পাশে থাকা ছোট্ট একটি ছেলের চোখে পানি টলমল করছিল। ওই নারী বলেন, ‘কোনো বিচার চাই না। আমাদের কথা কোথাও লিখবেন না। আপনারা চলে যাবেন। পরে আমাদের ঘরে এসে গুলি করে দিলে আমরা কই যাব?’

হাজিরখিলের বটগাছতলায় আট–দশটি দোকানের মধ্যে একটি ছাড়া বাকিগুলো বন্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয় লোকজন জানান, মাগরিবের আজানের আগেই দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। মো. মোনাফ জানান, দুই বছর আগে ঘর নির্মাণের জন্য আনা তাঁর রড নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। প্রতিবাদ করায় তাঁকে মারধর করা হয়। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, কখনো পুলিশ পরিচয়ে রাতে দরজায় কড়া নাড়ে সন্ত্রাসীরা। তাই অপরিচিত কারও ডাকে মানুষ দরজা খোলেন না। কাতারপ্রবাসী মো. সালাহউদ্দিন বলেন, ‘এখন রাত হলে এ এলাকায় কেউ হাঁটাচলাও করেন না। পুরো এলাকা সন্ত্রাসীদের দখলে গেছে।’

দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি হিলাল উদ্দীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাতের অন্ধকারে পাহাড় থেকে কখন কে এসে হামলা করে—এই ভয়টা মানুষের মধ্যে আছে। আমরা তাদের ধরতে নিয়মিত কাজ করছি।’

দুই বছর আগে সন্ত্রাসীরা তুলে নেওয়ার পর থেকে দুই সহোদর মানিক (বামে) ও মোরশেদ (ডানে) এখনো নিখোঁজ। এ ঘটনায় কোনো মামলা বা সাধারণ ডায়েরিও করেননি স্বজনেরা। এখনো কথা বলতে ভয় পান পরিবারের সদস্যরা
ছবি: প্রথম আলো

বসতভিটা ছেড়েছে শতাধিক পরিবার

সরফভাটায় কত পরিবার বসতভিটা ছেড়েছে, তার সরকারি হিসাব নেই। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, বাড়ির মালিক, ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে শতাধিক পরিবারের এলাকাছাড়া হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আর সরফভাটা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ওসমান গনির দাবি, শুধু পশ্চিম সরফভাটার ১ থেকে ৪ নম্বর ওয়ার্ডেই প্রায় ৫০০ পরিবার এখন থাকতে পারছে না।

এলাকা ছেড়ে কেউ শহরে, কেউ বোয়ালখালী, রাউজান বা রাঙ্গুনিয়ার অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকায় ভাড়া বাসায় উঠেছেন। কম সামর্থ্যের পরিবারগুলো আশ্রয় নিয়েছে কাছাকাছি বাজার বা ইউনিয়নে।

দুই লাখ টাকা চাঁদা দিতে না পেরে এলাকা ছেড়েছে এক প্রবাসীর পরিবার। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ওই প্রবাসী জানান, কামালের লোকজন তাঁদের কাছে দুই লাখ টাকা দাবি করেছিলেন। প্রায় এক বছর আগে ৮০ হাজার টাকা দেওয়ার পরও বাকি টাকার জন্য চাপ চলতে থাকে। একপর্যায়ে তাঁরা বাপ–দাদার ভিটা ছেড়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় চলে যান।

এলাকাছাড়া মানুষের একটি বড় অংশ আশ্রয় নিয়েছে তুলনামূলক নিরাপদ ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইত্যাদি চত্বরের আশপাশে। সেখানকার একটি ভবনের ছয়টি ফ্ল্যাটের তিনটিতেই মীরেরখীলের মানুষকে দেখা গেছে। ওই বাড়ির মালিক জানান, ভাড়াটের চাপ বাড়ায় তিন কক্ষের বাসাভাড়া আড়াই–তিন হাজার থেকে বেড়ে ছয়–সাত হাজার টাকা হয়েছে। 

হত্যা, অপহরণ ও চাঁদাবাজির ধারাবাহিকতা

সরফভাটার সহিংসতার ইতিহাস পুরোনো। ২০১৫ সালে প্রবাসী ইদ্রিছ গুলিতে নিহত হন। ২০১৬ সালে উকিল আহমদ নামের এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ইদ্রিছ হত্যা মামলার বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে জানান স্থানীয় লোকজন। এরপর খুন হন মনজু ও কাশেম নামের দুজন, যাঁরা উকিল আহমদ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন।

২০২১ সালে নিজ বাড়ির সামনে গুলিতে নিহত হন মো. মফিজ; একই বছর পাওয়া যায় এনাম হোসেনের লাশ। ২০২২ সালে চাঁদার দাবিতে কৃষক তাজুল ইসলাম, তাঁর দুই ছেলে ও আরেকজনকে গুলি ও কুপিয়ে আহত করা হয়। ২০২৩ সালে আমির হোসেন ও তাঁর স্ত্রী জুলেখা বেগমকে কুপিয়ে হত্যা এবং তাঁদের ছেলেকে আহত করা হয়। ওই মামলায় কামাল–তোফায়েল গোষ্ঠীর সদস্যদের নাম আসে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এক হত্যাকাণ্ড থেকে আরেক হত্যাকাণ্ডের পথ তৈরি হয়েছে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। খুন, জখম ও চাঁদাবাজির সাম্প্রতিক ১০টি ঘটনা খতিয়ে দেখে প্রথম আলো রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর অধিকাংশেই আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি মীরেরখীল এলাকায় ঘর নির্মাণের জন্য চাঁদা না দেওয়ায় এক যুবককে বন্ধুদের সামনে থেকে তুলে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। পরে এক কিলোমিটার দূরের জঙ্গলে তাঁকে আহত অবস্থায় পাওয়া যায়।

গত ২ জুন জঙ্গল সরফভাটা গ্রামের প্রবাসী ওমর ফারুককে (২৫) তুলে নেওয়া হয়। চার দিন পর পাশের একটি পাহাড়ি লিচুবাগান থেকে হাত–পা বাঁধা অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ভাষ্য, এ ঘটনার নেপথ্যেও স্থানীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জড়িত।

গত ১৩ ফেব্রুয়ারি মীরেরখীলের ইটভাটা মালিক মো. জসিম উদ্দিনের কাছে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। তাঁর অভিযোগ, কামাল, তাঁর ভাতিজা মো. আরিফ ও সহযোগী ইসমাইলের নেতৃত্বে হামলায় প্রায় অর্ধশত শ্রমিক আহত হন এবং আগুনে প্রায় দেড় কোটি টাকার ক্ষতি হয়। প্রায় ২০০ শ্রমিক চলে যাওয়ায় ইটভাটা এক মাস বন্ধ ছিল। গত ৯ জুলাই শ্রমিকদের ঘরগুলো পোড়া অবস্থায় দেখেছেন প্রথম আলোর প্রতিবেদকেরা। জসিমের ভাষ্য, থানায় মামলা করতে গেলেও পুলিশ নেয়নি।

মামলা করেও নিরাপত্তা পাননি

কর্ণফুলী নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন ও সরফভাটার সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন সরফভাটা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী ওসমান গনি। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, ২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি একটি ফুটবল টুর্নামেন্টের মঞ্চ থেকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে তাঁকে মারধর করা হয়। এ ঘটনায় মামলা করার পর আসামিরা তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে হত্যার হুমকি দিতে থাকে। প্রায় ১৪ মাস পর গত ২২ মার্চ তাঁর বাড়িতে আবার হামলা হয়।

মামলার এজাহারের ভাষ্য, ইসমাইল হোসেন ও কামাল হোসেনের নেতৃত্বে সশস্ত্র ব্যক্তিরা বাড়িতে হামলা করেন। আহত ওসমান দীর্ঘদিন নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে থাকার পর তাঁর ডান হাতে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এখনো তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। ওই হামলার সময় ওসমানের মায়ের হাঁটুতে গুলি লাগে; বাবাকেও মারধর করা হয়। 

ওসমান বলেন, নির্বাচনের আগে এলাকার পরিবেশ ঠিক করা এবং সন্ত্রাসের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁরা ভোট চেয়েছিলেন। ‘কিন্তু পরিবেশ বদলায়নি। নির্বাচনের পরে এসবের বিরুদ্ধে কথা বলায় আমার পুরো পরিবারকে শেষ করে দিতে চেয়েছে সন্ত্রাসীরা। এর পর থেকে আর এলাকায় যাই না।’

দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানার ওসি বলেন, থানাটির জনবল সীমিত। বর্তমানে থানায় ২২ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন। এর বাইরে একটি ক্যাম্পে আরও ১০ জন পুলিশ সদস্য পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন। দুর্গম ও বিস্তৃত এলাকা হওয়ায় সব জায়গায় নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা কঠিন।

ছেলেদের কথা জিজ্ঞেস করতেই অঝোরে কাঁদতে থাকেন শফিউন নেছা। তাঁরা কোথায় বা কীভাবে আছেন, জানেন না তিনি। বললেন, তিনি আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছেন।

নিখোঁজের পরও মামলা করেনি পরিবার

সরফভাটায় নিখোঁজ হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি—এমন তিন ব্যক্তির পরিবারের সন্ধান পেয়েছে প্রথম আলো। মীরেরখীল দরগাহের ঘোনায় শয্যাশায়ী শফিউন নেছার দুই ছেলে মানিক ও মোরশেদ দুই বছর আগে নিখোঁজ হন। পরিবার থানায় কোনো সাধারণ ডায়েরি বা মামলা করেনি।

ছেলেদের কথা জিজ্ঞেস করতেই অঝোরে কাঁদতে থাকেন শফিউন নেছা। তাঁরা কোথায় বা কীভাবে আছেন, জানেন না তিনি। বললেন, তিনি আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছেন।

শফিউন নেছার মেয়ে রোশনা আক্তার বলেন, দুই ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারটি ভেঙে পড়েছে। মানিকের ছেলে মারুফ (১৫) গাড়ি চালিয়ে যে টাকা পায়, তা দিয়ে দাদিকে নিয়ে থাকে। মারুফ জানায়, তার বাবা ও চাচাকে চাকমা পাহাড়ে নিয়ে হত্যা করে মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে সে শুনেছে। ভয়ে তারা খোঁজ নিতে যায়নি।

চিড়িংগা বন বিটের পাশে কর্ণফুলী নদীর পাড়ের এই স্থানটি একসময় ছিল জমজমাট গ্রাম্য বাজার। সন্ত্রাসীদের ভয়ে মানুষ ঘর–বাড়ি ছেড়ে যাওয়াতে বাজারটি পাঁচ বছর ধরে বন্ধ আছে
ছবি: প্রথম আলো

চার বছরেও বদলায়নি পরিস্থিতি

২০২২ সালে দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া থানা চালুর যৌক্তিকতা তুলে ধরে তৎকালীন সরকার বলেছিল, কর্ণফুলী নদীর কারণে চার ইউনিয়নে পুলিশি সেবা পৌঁছানো কঠিন এবং অপরাধীরা সহজে পাহাড়ে পালিয়ে যায়। চার বছর পরও সরফভাটায় অপরাধীদের তৎপরতার কারণ হিসেবে সেই পাহাড় ও নদীর কথাই বলছে পুলিশ।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা প্রথম আলোকে বলেন, জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় পুরো জেলার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। সংসদ সদস্যরাও নিজ নিজ এলাকার সমস্যা তুলে ধরেন। তবে সরফভাটার পরিস্থিতি সাম্প্রতিক কোনো সভায় উঠেছে বলে তাঁর মনে পড়ছে না। বিষয়টি সভায় তোলা হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে।

একপর্যায়ে আর কিছু মনে ছিল না। তার আগে কালেমা পড়ে নিয়েছিলাম। ধরে নিয়েছিলাম, জীবন এখানেই শেষ। কোপাতে কোপাতে শরীর নিস্তেজ হয়ে গেলে একসময় মৃত ভেবে আমাকে ফেলে রেখে যায়।
কাঠ ব্যবসায়ী মো. সেকান্দার আলী

বিচার চেয়ে ঘরেও ফিরতে পারেননি

২০২২ সালের ২৮ জানুয়ারি মীরেরখীল এলাকার একটি দোকানে বসে চা পান করছিলেন কাঠ ব্যবসায়ী মো. সেকান্দার আলী ওরফে মিন্টু। ব্যবসা শুরুর পর তাঁর কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা চাওয়া হয়েছিল। সেকান্দারের অভিযোগ, টাকা না দেওয়ায় চার–পাঁচজন অস্ত্রধারী তাঁকে দোকান থেকে তুলে পাশের পাহাড়ের পাদদেশে নিয়ে যায়। সেখানে মারধরের পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়।

সেকান্দার বলেন, ‘একপর্যায়ে আর কিছু মনে ছিল না। তার আগে কালেমা পড়ে নিয়েছিলাম। ধরে নিয়েছিলাম, জীবন এখানেই শেষ। কোপাতে কোপাতে শরীর নিস্তেজ হয়ে গেলে একসময় মৃত ভেবে আমাকে ফেলে রেখে যায়।’

স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রায় দুই মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। হামলায় তাঁর ডান হাত গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বাঁ হাতের কবজি ভেঙে যায় এবং বাঁ পা প্রায় অকেজো হয়ে যায়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর প্রাণে বাঁচলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।

হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরও নিজের বাড়িতে ফেরেননি সেকান্দার। আবার হামলার আশঙ্কায় চার বছরের বেশি সময় ধরে তাঁর ঘরে তালা ঝুলছে। বাপ–দাদার ভিটা ফেলে পরিবার নিয়ে থাকছেন ভাড়া বাসায়। হামলার ঘটনায় আদালতে মামলা করলেও প্রাণভয়ে সেখানে কামালের নাম উল্লেখ করেননি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, একের পর এক হামলা ও হত্যাকাণ্ডে মানুষের মধ্যে এমন অসহায়ত্ব তৈরি হয়েছে যে থানা–পুলিশের কাছে গেলেও প্রতিকার মিলবে—এই বিশ্বাস তাঁরা হারিয়েছেন। সেকান্দার মামলা করেও নিজের ঘরে ফিরতে পারেননি। তাঁর মতো অনেকে বিচার চাওয়ার আগেই এলাকা ছেড়েছেন অথবা নীরব হয়ে গেছেন। তাঁদের প্রশ্ন, মামলা করেও যেখানে ঘরে ফেরা যায় না, সেখানে বিচার চাওয়ার সাহস মানুষ কীভাবে পাবে? (শেষ)