সভায় প্রস্তাব দেওয়া হয়, নদীতে কারা কঠিন বর্জ্য ফেলছে, তাদের চিহ্নিত করতে সিসি ক্যামেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সিসি ক্যামেরা কেনার জন্য একটি প্রকল্প গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে কমিশনের সদস্য ও পরিবেশ–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঢাকার নদীদূষণের উৎস অনেকটাই চিহ্নিত। তাই সিসি ক্যামেরার চেয়ে দূষণ বন্ধে প্রয়োজন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সদিচ্ছা।

সিসি ক্যামেরা বসানো নিয়ে দ্বিমত

সভায় নদীর পাড়ে সিসি ক্যামেরা বসানোর প্রস্তাব দেওয়া ব্যক্তিদের একজন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক (ডিসি) এনামুল হক। তিনি বলেন, নদীর তীরে সিসি ক্যামেরা বসালে খুব সহজেই দূষণকারীদের চিহ্নিত করা যাবে। সিসি ক্যামেরা বসানো এবং এর রক্ষণাবেক্ষণ জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কিংবা শিল্প মন্ত্রণালয়কে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয় সভায়।

তবে কমিশনের সদস্য ও পরিবেশ–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সিসি ক্যামেরা বসিয়ে দূষণ রোধ করার চিন্তাটি বাস্তবসম্মত নয়। ঢাকায় নদীদূষণের বড় উৎসগুলো চিহ্নিত হয়ে আছে। যেমন ঢাকার পয়োবর্জ্য ও সাভারের চামড়া শিল্পনগর নদী দূষণ করছে। বেসরকারি শিল্পকারখানা নদী দূষণ করছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) আওতাধীন অনেক শিল্পকারখানারই বর্জ্য পরিশোধনাগার নেই। তাঁদের মতে, নদীদূষণের এসব উৎস বন্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। দূষণ ঠেকাতে দরকার কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থাও।

মতবিনিময় সভায় নদী রক্ষা কমিশনের উপপরিচালক মো. আখতারুজ্জামান তালুকদার একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দখল ও দূষণে নদী ও খালগুলো আজ ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। বুড়িগঙ্গার পানি শুকনো মৌসুমে আলকাতরার মতো মনে হয়। কমিশনের পরিদর্শন, পরিবীক্ষণ ও পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং বিভিন্ন গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি জানান, ঢাকার চারপাশের নদীগুলোর ৬০ শতাংশই দূষণ হয় শিল্পবর্জ্যের কারণে। বাকি দূষণ হয় ঢাকা সিটি করপোরেশনের (উত্তর ও দক্ষিণ) দুটি নিষ্কাশন নালা এবং নদীতে ভাসমান নৌযান থেকে নিষ্কাশিত পয়োবর্জ্য ও জ্বালানির মাধ্যমে।

default-image

সিসি ক্যামেরার বদলে নজরদারি ও পানি পরীক্ষার পরামর্শ

সিসি ক্যামেরা বসানোর বদলে এই চার নদীর দূষণ কমাতে কঠোর নজরদারি করার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, কোথাও অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সময় সেখানে সিসি ক্যামেরা বন্ধ থাকে। এতে বোঝা যায়, দুটি পক্ষের মধ্যে একধরনে আঁতাত থাকে।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, নদীর ঠিক কোন জায়গায় সিসি ক্যামেরা বসানো হবে কিংবা কে নজরদারি করবে, এটা নিয়ে জটিলতা দেখা দেবে। তাঁর মতে, পরিবেশ অধিদপ্তর দুই সপ্তাহ পরপর নদীর পানি পরীক্ষা করতে পারে। সিসি ক্যামেরা বসানোর চেয়ে এটি বেশি কার্যকর হবে।

এসটিপি ও শোধনাগার স্থাপনে জোর

মতবিনিময় সভায় কী কী প্রস্তাব এসেছে এবং সিদ্ধান্ত হয়েছে, তা কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করেছে নদী রক্ষা কমিশন। এতে দেখা যায়, সভায় বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকার চারপাশের চারটি নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ১১টি খালের দূষিত পানি যাতে নদীতে না পড়তে পারে, সে জন্য প্রতিটি খালের প্রান্তে পরিশোধনাগার স্থাপন করা। ঢাকা ওয়াসার যেসব আউটলেট নদীতে উন্মুক্ত, সেখানে পয়োনিষ্কাশন ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) বসানো এবং শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন ও তা অব্যাহত রাখা।

ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান মনজুর আহমেদ চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সভায় বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি নদীর পাড়ে সিসি ক্যামেরা বসানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তবে তিনি মনে করেন, সিসি ক্যামেরা বসিয়ে নদীর দূষণ বন্ধ করা যাবে না।

default-image

কারণ হিসেবে মনজুর আহমেদ বলেন, ‘আমি মনে করি, সিসি ক্যামেরা থেকে ফুটেজ সংগ্রহ করা অথবা সিসি ক্যামেরার রক্ষণাবেক্ষণ খুবই কঠিন কাজ। সিসি ক্যামেরা পরিচালনার মতো জনবল নদী রক্ষা কমিশনে নেই। দূষণ কমাতে নদীতে সিসি ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা এখন নেই।’

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন